জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রংপুর। ভোটগ্রহণ শুরুর আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি থাকলেও, নির্বাচনী প্রচার শেষ হলেও মাঠের পরিবেশ এখনো সুষ্ঠু হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে, ভোটারদের বাড়িতে বাড়িতে শাড়ি, লুঙ্গি ও নগদ অর্থ বিতরণের মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন প্রার্থীর বিরুদ্ধে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ১১ দলীয় জোটের নেতারা।
নির্বাচনী প্রচারণার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও, অভিযোগ উঠেছে যে অনেক প্রার্থী ভোটারদের প্রভাবিত করার জন্য অর্থ ও উপহার সামগ্রী বিতরণ করছেন। ১১ দলীয় জোটের নেতাদের দাবি, বিশেষ করে জাতীয় পার্টির কিছু প্রার্থীর বিরুদ্ধে কালো টাকা ছড়ানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তাদের মতে, প্রশাসন এসব জেনেও নীরব ভূমিকা পালন করছে, যা নির্বাচনী মাঠে সকলের জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) তৈরির ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। রংপুর জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ৪৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, এবং এই অভিযোগগুলো সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে।
১১ দলীয় জোটের নেতারা আরও অভিযোগ করেছেন যে, বিএনপি প্রার্থীরাও আচরণবিধি ভঙ্গের রেকর্ড গড়েছেন। এখনো তাদের রঙিন ব্যানার ও ফেস্টুন শহরের অলিগলি ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে শোভা পাচ্ছে। প্রশাসনকে জানানো সত্ত্বেও সেগুলো অপসারণ করা হয়নি। উল্টো, জোটের নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে বলেও তারা দাবি করেছেন। অন্যদিকে, জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা প্রকাশ্যে ভোটারদের বাড়িতে ভূরিভোজের আয়োজন করছেন এবং নগদ অর্থ বিতরণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে প্রশাসনকে অবগত করা হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জোট নেতাদের অভিযোগ।
নির্বাচনী আসনের চিত্র:
রংপুর-১ (গংগাচড়া ও সিটি কর্পোরেশনের আংশিক): এই আসনে ৫ জন প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির মোকাররম হোসেন সুজনের বিরুদ্ধে ভোটারদের বাড়িতে নগদ অর্থ বিতরণের অভিযোগ করেছেন ১১ দলীয় জোটের সমর্থকরা।
রংপুর-২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ): পাঁচজন প্রার্থীর এই আসনে জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি আনিছুল ইসলাম মণ্ডলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ভোটারদের টাকা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা। এই নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডাও হয়েছে। এছাড়া, বিএনপি কর্মীরা জামায়াতের সমর্থক ও ভোটারদের হুমকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছে ১১ দলীয় জোট।
রংপুর-৩ (সিটি সদর): সাতজন প্রার্থীর এই আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বাসভবনে প্রকাশ্যে ভূরিভোজ আয়োজন এবং ভোটারদের ডেকে নগদ অর্থ বিতরণের অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নির্বাচন নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা): আটজন প্রার্থীর এই আসনে বিএনপির ইমদাদুল হক ভরসা এবং জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে শাড়ি-লুঙ্গি ও নগদ অর্থ বিতরণের অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন। প্রশাসন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেছেন।
রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর): দশজন প্রার্থীর এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ফখরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ভোটারদের বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো এবং উপঢৌকন ও নগদ অর্থ বিতরণের অভিযোগ করেছেন জামায়াতের প্রার্থী ও সমর্থকরা।
রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ): আটজন প্রার্থীর এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা নুরুল আমীন অভিযোগ করেছেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা ১১ দলীয় জোটের কর্মী-সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। একই সঙ্গে, জাতীয় পার্টির প্রার্থীর বিরুদ্ধে কালো টাকা বিতরণের অভিযোগও উঠেছে।
প্রতিক্রিয়া ও আশ্বাস:
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশন এখনো তাদের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে পারেনি। প্রকাশ্যে ভোটারদের নগদ অর্থ ও উপঢৌকন বিতরণের অভিযোগ জানালেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এতে বোঝা যায়, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে কমিশন ব্যর্থ।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও রংপুর-২ আসনের প্রার্থী এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তারা এখনো পুরোপুরি লেভেলিং ফিল্ড তৈরি করতে পারেননি। তবে, তিনি আশা প্রকাশ করেন যে সাধারণ ভোটাররা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং রংপুর জেলা প্রশাসক এনামুল আহসান জানিয়েছেন, প্রশাসন কোনো পক্ষপাতিত্ব করছে না। আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনায় ইতিমধ্যেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, যৌথ বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে কাজ করছে। কোনো অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
রিপোর্টারের নাম 























