সারা দেশে যখন সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে উৎসবের আমেজ, তখন এই আলোচনা থেকে অনেকটা দূরেই রয়ে গেছে দেশের উপকূলীয় নদ-নদীতে নৌকায় ভাসমান বেদে সম্প্রদায়। ভোটের এই ডামাডোলে প্রার্থীরা নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে তাদের কাছে এলেও, বেদে পরিবারগুলোর অভিযোগ—নির্বাচন শেষ হলে তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। মৌলিক শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত এই যাযাবর জনগোষ্ঠীর জীবনে আজও লাগেনি আধুনিকতার ছোঁয়া।
পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার কচা ও বলেশ্বর নদে অস্থায়ীভাবে বসবাসকারী বেদে পরিবারগুলো জানায়, প্রতিবার ভোটের সময় প্রার্থীরা তাদের নৌবহরে এসে নানান উন্নয়নের আশ্বাস দেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলেই তাদের আর কোনো খোঁজ থাকে না। সরকার বদলায়, জনপ্রতিনিধি বদলায়, অথচ বেদেদের জীবনযাত্রার চিত্র থেকে যায় একই। তাদের অভিযোগ, যারা সত্যিকার অর্থে তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন এবং দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াবেন, কেবল তাদেরই ভোট দিতে চান তারা।
নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীর প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যরা ভোটার হলেও, জীবিকার তাগিদে বছরের বেশিরভাগ সময় তাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতে হয়। নৌবহর নিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচলের কারণে ভোটের দিন অনেকেই নিজ ভোটার এলাকা থেকে দূরে অবস্থান করেন। ফলে চাইলেও অনেকে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না।
এবারও নির্বাচনকে সামনে রেখে বেদে বহরে ভোট চাইতে এসেছেন প্রার্থীরা। তবে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এবার তারা কেবল প্রতিশ্রুতিতে আর আস্থা রাখতে নারাজ। সুনামগঞ্জ থেকে ইন্দুরকানীতে আসা এক বেদে সদস্য মিরাজুল আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের কোনো ঘরবাড়ি নেই। নৌকাতেই আমাদের জীবন। ভোটের সময় সবাই আসে, কিন্তু পরে আর কেউ আসে না।’
বিক্রমপুর থেকে আসা বেদে সর্দার ছাত্তার মোল্লা জানান, ‘আমরা ভোট দিতে পারি, কিন্তু নাগরিক সুবিধা পাই না। নৌকায় বসবাস করে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করানো খুব কঠিন।’ একই সুরে বেদে নারী আচিয়া বেগম বলেন, ‘শেষ বয়সে এসে একটু চিকিৎসা আর নিরাপত্তা চাই। কিন্তু আমাদের কথা কেউ শোনে না।’
বর্তমানে ইন্দুরকানীর শহীদ ফজলুল হক মনি সেতুর উভয় প্রান্তে বিক্রমপুর ও সুনামগঞ্জ থেকে আসা দুটি বেদে বহর অবস্থান করছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে যাযাবর জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৬৩ লাখ, যার মধ্যে বেদেদের সংখ্যা আট লাখেরও বেশি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
রিপোর্টারের নাম 




















