## কক্সবাজারের নির্বাচনী সমীকরণ: জামায়াত-বিএনপিThe split battle
কক্সবাজার, [আজকের তারিখ]: দীর্ঘ বছর ধরে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার জেলার চারটি আসনে এবার ভিন্ন এক নির্বাচনী লড়াই দেখা যাচ্ছে। অতীতের জোটবদ্ধ নির্বাচনের চিত্র বদলে এবার দল দুটি আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যা আসনগুলোর সমীকরণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
নির্বাচনের শুরুতে জেলার চারটি আসনেই বিএনপির আধিপত্য দেখা গেলেও, বর্তমানে পরিস্থিতি বদলে গেছে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, দুটি আসনে বিএনপি এবং দুটি আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা বিজয়ী হতে পারেন। যদিও উভয় দলের নেতাকর্মীরা নিজ নিজ প্রার্থীদের বিজয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। বিএনপি নেতাকর্মীরা আশা করছেন, তারা কক্সবাজারের চারটি আসনই তাদের দলপ্রধানকে উপহার দিতে পারবেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীও এবার চারটি আসনেই বিজয়ের ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয়ী। দলের শীর্ষ নেতৃত্বও কক্সবাজারের আসনগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইতোমধ্যে দুবার জেলা সফর করেছেন।
কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া): বিএনপির ‘অপরাজেয়’ সালাহউদ্দিনের মুখোমুখি জামায়াতের তরুণ ফারুক
জেলার অন্যতম বৃহৎ উপজেলা চকরিয়া এবং উপকূলীয় পেকুয়া নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপি দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় রেখেছে। বিএনপির প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদকে এই আসনে ‘অপরাজেয়’ হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি এই আসনে দলের শক্ত প্রার্থী।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামী অনেক আগেই তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। কক্সবাজার শহর জামায়াতের আমির এবং সাবেক ছাত্রনেতা আবদুল্লাহ আল ফারুককে প্রার্থী করার পর থেকে তিনি এবং তার দল সাংগঠনিকভাবে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন। তাদের প্রচারণার ফলে জামায়াত নেতাকর্মীরা ফারুকের বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।
সালাহউদ্দিন আহমদও নিয়মিত প্রচার চালিয়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তবে সাধারণ ভোটারদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত এই আসনে বিজয় সালাহউদ্দিন আহমদের পক্ষেই যাবে। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ছরওয়ার আলম কুতুবীও এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তবে তার জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া): জামায়াতের শক্তি বনাম বিএনপির বিভক্তি
জেলার দুটি দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী ও কুতুবদিয়া নিয়ে গঠিত এই আসনটি জোটবদ্ধ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীকে ছেড়ে দেওয়া হতো। অতীতে এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন দলটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ। এবারও তিনি জামায়াতের প্রার্থী।
এই আসনে জামায়াতের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার রয়েছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির ভোট এখানে বেশি। জোটবদ্ধ নির্বাচনে হামিদুর রহমান আযাদ সহজেই নির্বাচিত হয়েছিলেন। সাধারণ ভোটারদের মতে, এই আসনে তার জেতার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে, বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ। তিনি একজন জনপ্রিয় প্রার্থী হলেও, বিএনপির একাধিক গ্রুপে বিভক্ত থাকাটা তার নির্বাচনী প্রচারণায় কিছুটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যদিও দলের বিভিন্ন গ্রুপিংয়ের নেতাকর্মীরা তার সাথে প্রচারে অংশ নিচ্ছেন, তবুও সাধারণ মানুষের ধারণা, এই বিভক্তি তার ভোটের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। কুতুবদিয়ায় বিএনপির অনেক ভোট জামায়াত প্রার্থীর দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী থাকলেও তাদের জয়ের সম্ভাবনা খুবই কম।
কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও): কাজলের সঙ্গে ভিপি বাহাদুরের লড়াই
ঐতিহ্যগতভাবে এই আসনটি বিএনপির দখলে থাকে। অতীতে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী যেই হোন না কেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তবে এবার বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল।
এই আসনে বিএনপির ভোট বেশি হলেও, জামায়াতের সাংগঠনিক কার্যক্রম বেশ শক্তিশালী। তারা অনেক আগেই তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। কক্সবাজার সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি এবং সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শহিদুল আলম বাহাদুর, যিনি ভিপি বাহাদুর নামে পরিচিত, এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী। তিনি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার চেয়ে সাংগঠনিক ভিত্তির উপর নির্ভর করে প্রচারণা চালিয়েছেন। জামায়াত নেতাকর্মীরা মনে করছেন, তারা ইতোমধ্যে সবদিক সামলে নিয়েছেন এবং সাধারণ ভোটাররা ভিপি বাহাদুরকেই নির্বাচিত করবেন।
তবে সাধারণ ভোটারদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত এই আসনে এমপি হতে পারেন কাজলই, কারণ এবার বিএনপি মাঠে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে।
এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা সভাপতি মাওলানা আমিরুল ইসলাম মীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, আমজনতার পার্টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছেন, তবে তাদের নির্বাচনী প্রভাব নগণ্য।
কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ): শাহজাহান চৌধুরীর চ্যালেঞ্জ জামায়াতের নূর আহমেদ আনোয়ারী
দেশের রাজনীতিতে একটি কথা প্রচলিত আছে যে, কক্সবাজার-৪ আসনে যে দল জয়ী হয়, সেই দলই সরকার গঠন করে। সীমান্তের এই আসনে বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক হুইপ শাহজাহান চৌধুরী। তিনি বহুবার এই আসনে জয়ী হয়েছেন এবং নির্বাচনী খেলায় পারদর্শী হিসেবে পরিচিত।
তবে, তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগ তার নির্বাচনী প্রচারণায় ‘পথের কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ড তাকে বেকায়দায় ফেলেছে এবং ভোটের মাঠেও এর প্রভাব পড়ছে। সাধারণ ভোটারদের ধারণা, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে শাহজাহান চৌধুরী এই আসনে পরাজিত হতে পারেন।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামী কখনো জয়ী হয়নি। তবে এবার দলটির প্রার্থী জেলা আমির মাওলানা নূর আহমেদ আনোয়ারী। তিনি টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান এবং প্রতিবারই নির্বাচিত হয়ে আসছেন। তিনি একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এবং এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ইউনিয়ন পরিষদের এই জনপ্রিয়তা এবং জামায়াতের শক্তিশালী সাংগঠনিক তৎপরতা তাকে নির্বাচনী লড়াইয়ে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। উখিয়া-টেকনাফে জামায়াতের দলীয় ভিত্তি মজবুত হওয়ায় নেতাকর্মীরা আশা করছেন, এই আসনটি তারা এবার ছিনিয়ে নিতে পারবে।
এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং এনডিএমের প্রার্থী থাকলেও তাদের নির্বাচনী কার্যক্রম তেমন চোখে পড়ছে না।
রিপোর্টারের নাম 




















