আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে এক নতুন ধরনের আদর্শিক ও কৌশলগত লড়াই শুরু হয়েছে। দুই দলের নির্বাচনী প্রচারণায় উঠে আসছে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক বয়ান। বিএনপি যেখানে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাকে তাদের প্রধান নির্বাচনী ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেখানে জামায়াতে ইসলামী গুরুত্ব দিচ্ছে সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও স্বৈরাচার পতনের পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের রূপরেখাকে।
দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনী জনসভাগুলোতে সরব উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। গত ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন জেলায় দেওয়া তার বক্তব্যগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গটি সামনে নিয়ে আসছেন। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা ও রাজনৈতিক চাপে রাখার কৌশল হিসেবে তিনি ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘যুদ্ধাপরাধ’ ইস্যুকে প্রধান হাতিয়ার করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ রাজনীতির ইতিহাস থাকলেও বর্তমান বাস্তবতায় দলটিকে কোণঠাসা করতে ‘মুক্তিযুদ্ধ কার্ড’ ব্যবহার করছেন তারেক রহমান।
সিলেটের সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ময়দান থেকে শুরু করে মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রামের জনসভাগুলোতে তারেক রহমানের কণ্ঠে বারবার একাত্তরের ত্যাগের কথা উঠে এসেছে। সিলেটের জনসভায় তিনি সরাসরি কোনো দলের নাম না নিলেও ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলেন, ১৯৭১ সালে যাদের ভূমিকার কারণে লাখ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং মা-বোনেরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের পরিচয় দেশবাসীর অজানা নয়। একইভাবে চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ডে তিনি চট্টগ্রামকে স্বাধীনতার ঘোষণার পবিত্র ভূমি হিসেবে অভিহিত করে স্থানীয় আবেগ ও ইতিহাসকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেন।
তারেক রহমানের বক্তব্যে সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ থাকলেও তা মূলত মুক্তিযুদ্ধের পরিপূরক হিসেবেই উপস্থাপিত হচ্ছে। গত ১৮ জানুয়ারি ঢাকার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম, আর ২০২৪ সাল হলো সেই অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জের সভায় তিনি ২০২৪-এর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষকে একাত্তরের আদর্শের উত্তরসূরি হিসেবে চিত্রিত করেন।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতারা তাদের বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং এর পরবর্তী গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে তারা তাদের রাজনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছেন। বিএনপি যেখানে একাত্তরের প্রেক্ষাপটে জামায়াতকে বিদ্ধ করতে চাইছে, সেখানে জামায়াত চব্বিশের বিপ্লবের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলে জনমত গড়ার চেষ্টা করছে।
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, দুই দলের এই বয়ানভিত্তিক লড়াই ততটাই তীব্র হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বনাম চব্বিশের জুলাই বিপ্লব—এই দুই মেরুর রাজনীতি শেষ পর্যন্ত ভোটের বাক্সে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
রিপোর্টারের নাম 

























