ঢাকা ১০:০৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

কয়লার অভাবে পটুয়াখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন অনিশ্চিত, বিকল্প পথে সরকার

পটুয়াখালীতে অবস্থিত এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারছে না কয়লার অভাবে। দীর্ঘসূত্রিতা এড়াতে এবং দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে সরকার সরাসরি ক্রয় (ডিপিএম) পদ্ধতিতে কয়লা কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন (সিওডি) শুরু করা সম্ভব হবে।

তবে, এই সরকারি উদ্যোগকে উচ্চ আদালতের রায়ের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। তাদের মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্ত এখতিয়ার বহির্ভূত এবং এটি কেন্দ্রটির পুরোদমে চালু হওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। বারবার দরপত্র আহ্বান করেও কার্যাদেশ দিতে না পারাকে সরকারের বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবেও উল্লেখ করেছেন তারা।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, গত বছর এপ্রিলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছিল। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন কয়লার সরবরাহের অভাবে কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারছে না। উল্লেখ্য, এই কেন্দ্রটি নির্মাণে মোট ২.৫৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১.৭৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ রয়েছে চীনের। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কিস্তি পরিশোধের চাপও রয়েছে বলে জানা গেছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে কয়লা সরবরাহের জন্য তিনবার দরপত্র আহ্বান করেও তা বাতিল হয়েছে। চতুর্থ দফায় সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান যোগ্য বিবেচিত হওয়ার পরও সেই দরপত্র বাতিল করা হয়। বারবার দরপত্র বাতিল হওয়ায় কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি, যার ফলে এই বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ক্ষতির মুখে পড়েছে। চতুর্থ দফায় ডাকা দরপত্র বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করেছিল ইয়াংথাই এনার্জি প্রাইভেট লিমিটেড।

আইনজীবীদের মতে, হাইকোর্ট সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বাতিল করে সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে কয়লা সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সরকার এ রায় চ্যালেঞ্জ করে আপিল করলেও আপিল বিভাগও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। রিটকারীদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহমদ আজম খান জানিয়েছেন, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে নানা ধাপে মূল্যায়নের পর আর্থিক ও কারিগরিভাবে যোগ্য কোম্পানিকে কাজ না দিয়ে দরপত্র বাতিল ও পুনঃদরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যা আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছেন। উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকেই সরকারকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আরএনপিএল, বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিপিডিবি সূত্র জানিয়েছে, কয়লা সংগ্রহের জন্য তিনটি পদ্ধতির প্রস্তাবনা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রথমত, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ করে খনি নির্বাচনের মাধ্যমে কয়লা সংগ্রহ করা। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে মাতারবাড়িতে মজুদকৃত কয়লা ধার করে এনে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা। তৃতীয় পরিকল্পনা হিসেবে, অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য সীমিত টেন্ডারিং পদ্ধতি (এলটিএম) অনুসরণ করে কয়লা কেনা।

তবে, প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বিকল্প পন্থায় সরাসরি কিনে বা ধার করে কয়লা এনে এই বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করার উদ্যোগকে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা রহস্যজনক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, আরএনপিএলের বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কয়লা কেনার ক্ষেত্রে যে তিনটি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, তা মূলত একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের চাহিদা অনুযায়ী কয়লা সংগ্রহের একটি দ্রুত বিকল্প। এই ধরনের উদ্যোগ টেকসই ও বাস্তবভিত্তিক নয় এবং এতে পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র আরও জানিয়েছে, আরএনপিএল কর্তৃপক্ষ গত ১০ ডিসেম্বর কোম্পানির ৬৮তম বোর্ড সভায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করতে কয়লা কেনার একাধিক সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদনে না আসা পর্যন্ত ইপিসি ঠিকাদার কনসোর্টিয়াম (টেপকো-সিএইচইসি-সিডব্লিউইসি) থেকে ভ্যারিয়েশন অর্ডারের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে কয়লা সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০২৫) অনুযায়ী সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) অনুসরণ করে ইপিসি এবং ইন্দোনেশিয়ার কয়লাখনি থেকে সরাসরি কয়লা সংগ্রহের সম্ভাবনা যাচাই করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ, বিপিডিবি, বিআরইবি, আরপিসিএল, নরিনকো ইন্টারন্যাশনালের একজন করে প্রতিনিধিকে নিয়ে ছয় সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা কয়লা সংগ্রহের জন্য যোগ্য খনি চিহ্নিত করতে ইন্দোনেশিয়া সফর করবেন।

এছাড়াও, ইপিসি ঠিকাদার থেকে কয়লা সংগ্রহের ক্ষেত্রে মূল্য ও শর্ত মূল্যায়নের জন্য বিপিডিবি, এমআইএসটি মন্ত্রণালয় ও আরএনপিএল-এর তিন সদস্যের একটি ভ্যারিয়েশন অ্যাসেসমেন্ট কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে, কেন্দ্রটি চালু করতে যে ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। এছাড়া, কয়লা কেনাকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের বিধিনিষেধের পরিপন্থী বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইপিসি কন্ট্রাক্টর থেকে কয়লা সংগ্রহ করা এই প্রথম এবং তাদের আশঙ্কা, এভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বিপর্যস্ত ও ব্যয়বহুল হবে। কারণ, ইপিসি কন্ট্রাক্টর আন্তর্জাতিক কয়লা ট্রেডার কোম্পানি থেকে কয়লা সংগ্রহ করবে। মূলত, ইপিসি কন্ট্রাক্টের আড়ালে সিন্ডিকেট মনোনীত কোম্পানিই সরবরাহ করবে। ইপিসি কন্ট্রাক্টর এবং প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী তাদের মূল কাজ হলো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। ইপিসি থেকে কয়লা নিলে প্রকল্পের ঋণ আরও বেড়ে যাবে।

পিপিআর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নানা ধাপে মূল্যায়নের পর আর্থিক ও কারিগরিভাবে যোগ্য কোম্পানিকে নির্বাচিত করা হয়। এমন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তড়িঘড়ি করে স্পট পারচেজ/ডিপিএম পদ্ধতিতে সরাসরি একটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কয়লা সরবরাহ করতে দেওয়া, অথবা ইপিসি কন্ট্রাক্টরকে ব্যবহার করে কয়লা সংগ্রহ—সবকিছুই সিন্ডিকেটের কারসাজি বলে মনে করছেন তারা। তাদের মতে, এর মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস এবং আমদানি-নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন সমাপ্ত: ২৫ কার্যদিবসে রেকর্ড ৯৪ বিল পাস

কয়লার অভাবে পটুয়াখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন অনিশ্চিত, বিকল্প পথে সরকার

আপডেট সময় : ০৮:০১:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬

পটুয়াখালীতে অবস্থিত এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারছে না কয়লার অভাবে। দীর্ঘসূত্রিতা এড়াতে এবং দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে সরকার সরাসরি ক্রয় (ডিপিএম) পদ্ধতিতে কয়লা কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন (সিওডি) শুরু করা সম্ভব হবে।

তবে, এই সরকারি উদ্যোগকে উচ্চ আদালতের রায়ের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। তাদের মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্ত এখতিয়ার বহির্ভূত এবং এটি কেন্দ্রটির পুরোদমে চালু হওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। বারবার দরপত্র আহ্বান করেও কার্যাদেশ দিতে না পারাকে সরকারের বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবেও উল্লেখ করেছেন তারা।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, গত বছর এপ্রিলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছিল। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন কয়লার সরবরাহের অভাবে কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারছে না। উল্লেখ্য, এই কেন্দ্রটি নির্মাণে মোট ২.৫৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১.৭৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ রয়েছে চীনের। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কিস্তি পরিশোধের চাপও রয়েছে বলে জানা গেছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে কয়লা সরবরাহের জন্য তিনবার দরপত্র আহ্বান করেও তা বাতিল হয়েছে। চতুর্থ দফায় সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান যোগ্য বিবেচিত হওয়ার পরও সেই দরপত্র বাতিল করা হয়। বারবার দরপত্র বাতিল হওয়ায় কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি, যার ফলে এই বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ক্ষতির মুখে পড়েছে। চতুর্থ দফায় ডাকা দরপত্র বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করেছিল ইয়াংথাই এনার্জি প্রাইভেট লিমিটেড।

আইনজীবীদের মতে, হাইকোর্ট সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বাতিল করে সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে কয়লা সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সরকার এ রায় চ্যালেঞ্জ করে আপিল করলেও আপিল বিভাগও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। রিটকারীদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহমদ আজম খান জানিয়েছেন, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে নানা ধাপে মূল্যায়নের পর আর্থিক ও কারিগরিভাবে যোগ্য কোম্পানিকে কাজ না দিয়ে দরপত্র বাতিল ও পুনঃদরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যা আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছেন। উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকেই সরকারকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আরএনপিএল, বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিপিডিবি সূত্র জানিয়েছে, কয়লা সংগ্রহের জন্য তিনটি পদ্ধতির প্রস্তাবনা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রথমত, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ করে খনি নির্বাচনের মাধ্যমে কয়লা সংগ্রহ করা। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে মাতারবাড়িতে মজুদকৃত কয়লা ধার করে এনে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা। তৃতীয় পরিকল্পনা হিসেবে, অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য সীমিত টেন্ডারিং পদ্ধতি (এলটিএম) অনুসরণ করে কয়লা কেনা।

তবে, প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বিকল্প পন্থায় সরাসরি কিনে বা ধার করে কয়লা এনে এই বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করার উদ্যোগকে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা রহস্যজনক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, আরএনপিএলের বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কয়লা কেনার ক্ষেত্রে যে তিনটি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, তা মূলত একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের চাহিদা অনুযায়ী কয়লা সংগ্রহের একটি দ্রুত বিকল্প। এই ধরনের উদ্যোগ টেকসই ও বাস্তবভিত্তিক নয় এবং এতে পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র আরও জানিয়েছে, আরএনপিএল কর্তৃপক্ষ গত ১০ ডিসেম্বর কোম্পানির ৬৮তম বোর্ড সভায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করতে কয়লা কেনার একাধিক সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদনে না আসা পর্যন্ত ইপিসি ঠিকাদার কনসোর্টিয়াম (টেপকো-সিএইচইসি-সিডব্লিউইসি) থেকে ভ্যারিয়েশন অর্ডারের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে কয়লা সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০২৫) অনুযায়ী সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) অনুসরণ করে ইপিসি এবং ইন্দোনেশিয়ার কয়লাখনি থেকে সরাসরি কয়লা সংগ্রহের সম্ভাবনা যাচাই করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ, বিপিডিবি, বিআরইবি, আরপিসিএল, নরিনকো ইন্টারন্যাশনালের একজন করে প্রতিনিধিকে নিয়ে ছয় সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা কয়লা সংগ্রহের জন্য যোগ্য খনি চিহ্নিত করতে ইন্দোনেশিয়া সফর করবেন।

এছাড়াও, ইপিসি ঠিকাদার থেকে কয়লা সংগ্রহের ক্ষেত্রে মূল্য ও শর্ত মূল্যায়নের জন্য বিপিডিবি, এমআইএসটি মন্ত্রণালয় ও আরএনপিএল-এর তিন সদস্যের একটি ভ্যারিয়েশন অ্যাসেসমেন্ট কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে, কেন্দ্রটি চালু করতে যে ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। এছাড়া, কয়লা কেনাকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের বিধিনিষেধের পরিপন্থী বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইপিসি কন্ট্রাক্টর থেকে কয়লা সংগ্রহ করা এই প্রথম এবং তাদের আশঙ্কা, এভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বিপর্যস্ত ও ব্যয়বহুল হবে। কারণ, ইপিসি কন্ট্রাক্টর আন্তর্জাতিক কয়লা ট্রেডার কোম্পানি থেকে কয়লা সংগ্রহ করবে। মূলত, ইপিসি কন্ট্রাক্টের আড়ালে সিন্ডিকেট মনোনীত কোম্পানিই সরবরাহ করবে। ইপিসি কন্ট্রাক্টর এবং প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী তাদের মূল কাজ হলো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। ইপিসি থেকে কয়লা নিলে প্রকল্পের ঋণ আরও বেড়ে যাবে।

পিপিআর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নানা ধাপে মূল্যায়নের পর আর্থিক ও কারিগরিভাবে যোগ্য কোম্পানিকে নির্বাচিত করা হয়। এমন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তড়িঘড়ি করে স্পট পারচেজ/ডিপিএম পদ্ধতিতে সরাসরি একটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কয়লা সরবরাহ করতে দেওয়া, অথবা ইপিসি কন্ট্রাক্টরকে ব্যবহার করে কয়লা সংগ্রহ—সবকিছুই সিন্ডিকেটের কারসাজি বলে মনে করছেন তারা। তাদের মতে, এর মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস এবং আমদানি-নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।