আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বইছে আগাম ভোটের হাওয়া। গ্রাম থেকে শহর— সর্বত্রই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নির্বাচনী রাজনীতি। চায়ের দোকান, হাট-বাজার কিংবা নৌকাঘাটগুলোতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। দীর্ঘ ১৭ বছর পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে জেলার পাঁচটি আসনেই পাল্টে গেছে চিরচেনা সমীকরণ। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বর্তমানে দৃশ্যপটের বাইরে থাকায় নির্বাচনী মাঠ এখন মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দখলে। দুই দলের এই দ্বিমুখী লড়াইয়ে ভোটের লড়াই যেমন জমজমাট হয়ে উঠেছে, তেমনি সাধারণ ভোটারদের মাঝেও তৈরি হয়েছে গভীর কৌতূহল।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে সুনামগঞ্জের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপি নতুন মুখ নিয়ে মাঠে নামলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীর আশঙ্কা দলটিকে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী অপেক্ষাকৃত তরুণ ও সুসংগঠিত প্রার্থীদের নিয়ে আগেভাগেই প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছে। দলটির সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং নিয়মিত গণসংযোগ সাধারণ ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
সুনামগঞ্জ-১ (তাহিরপুর-জামালগঞ্জ-মধ্যনগর-ধর্মপাশা):
হাওরবেষ্টিত এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে বিভক্তি প্রকট হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় কৃষক দলের নেতা আনিসুল হক এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল— দুজনেই নিজ নিজ বলয় নিয়ে মাঠে সক্রিয় থাকায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ কর্মীরা। বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে জামায়াতে ইসলামী। জেলা জামায়াতের আমির তোফায়েল আহমেদ খান একক প্রার্থী হিসেবে নিয়মিত পথসভা ও গণসংযোগের মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠ গুছিয়ে নিয়েছেন। স্থানীয়দের মতে, বিএনপির কোন্দল নিরসন না হলে এই আসনে জামায়াতের শক্ত অবস্থানের মুখে পড়তে হতে পারে ধানের শীষের প্রার্থীকে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম মাঝেমধ্যে প্রচারে নামলেও মূল লড়াইয়ে তিনি কতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা):
প্রয়াত জাতীয় নেতাদের এই আসনে এবার লড়াইয়ের চিত্র ভিন্ন। বিএনপির প্রবীণ নেতা নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে দলটির রাজনীতি। যদিও শুরুতে তরুণ নেতা তাহির রায়হান চৌধুরী পাভেলের নাম আলোচনায় ছিল, তবে শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞ নাছির উদ্দিন চৌধুরীর ওপরই আস্থা রাখছে দল। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট শিশির মনির ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। তার আধুনিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও উন্নয়নমুখী প্রচার দিরাই-শাল্লার সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। স্থানীয় ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে সংখ্যালঘু এবং নিরপেক্ষ ভোটারদের পছন্দের ওপর। নাছির উদ্দিন চৌধুরীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও আবেগ বনাম শিশির মনিরের সাংগঠনিক দক্ষতা ও জাতীয় পরিচিতি— এই দুইয়ের মধ্যে একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের অপেক্ষায় রয়েছেন হাওরপাড়ের মানুষ।
সব মিলিয়ে, সুনামগঞ্জের নির্বাচনী ময়দানে এখন সাজ সাজ রব। বড় দুই দলের এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখতে মুখিয়ে আছে পুরো জেলাবাসী।
রিপোর্টারের নাম 























