ঢাকা ০২:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

মদিনা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও জাকাত ব্যবস্থাপনা: একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

একটি আদর্শ ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার সুসংহত অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর। ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মদিনা রাষ্ট্র এবং পরবর্তী খিলাফত ব্যবস্থার অর্থনৈতিক সাফল্যের মূলে ছিল একটি সুশৃঙ্খল ও ন্যায়সংগত আর্থিক নীতি। এই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘বাইতুল মাল’ বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অর্থ মন্ত্রণালয় যে ভূমিকা পালন করে, তৎকালীন সময়ে বাইতুল মাল ঠিক সেই দায়িত্বই পালন করত। রাষ্ট্রীয় সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য।

মদিনা রাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক বিপ্লবের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল জাকাত ব্যবস্থা। হিজরি দ্বিতীয় সনে জাকাত ফরজ হওয়ার পর থেকে এটি কেবল ধর্মীয় ইবাদত হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং রাষ্ট্রের দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়। মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনায় একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টন করা হতো।

জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের মূলনীতি
নববি যুগে জাকাত সংগ্রহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করা হতো। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিধি বা সংগ্রাহক পাঠানো হতো। তাদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা ছিল যেন জাকাত আদায়ের সময় সম্পদের মালিকের ওপর কোনো প্রকার জুলুম না হয়। বিশেষ করে, দাতার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের সম্পদটি গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছিল, যাতে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত বোধ না করেন। আবার অন্যদিকে, দরিদ্রদের অধিকার আদায়েও কোনো শিথিলতা প্রদর্শন করা হতো না।

বণ্টনের ক্ষেত্রে স্থানীয় অভাবগ্রস্তদের অগ্রাধিকার দেওয়া ছিল এই ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যে অঞ্চল থেকে জাকাত সংগ্রহ করা হতো, সর্বাগ্রে সেই অঞ্চলের দরিদ্রদের মধ্যে তা বণ্টন করা হতো। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত সম্পদ মদিনার কেন্দ্রীয় বাইতুল মালে পাঠানো হতো, যা মহানবী (সা.) কৌশলগত প্রয়োজনে ও জনকল্যাণে ব্যয় করতেন।

জাকাতযোগ্য সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান
স্বর্ণ-রূপা, গবাদি পশু (উট, গরু, ছাগল), কৃষিপণ্য, ব্যবসায়িক পণ্য এবং খনিজ সম্পদের ওপর নির্দিষ্ট হারে জাকাত নির্ধারিত ছিল। এই বিধান বাস্তবায়নে রাষ্ট্র ছিল আপসহীন। ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সময় যখন কিছু গোত্র জাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল, তখন তিনি রাষ্ট্রীয় সংহতি ও দরিদ্রদের অধিকার রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, জাকাত ব্যবস্থার ওপরই রাষ্ট্রের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দাঁড়িয়ে ছিল।

ব্যয়ের খাতসমূহ
কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জাকাতের অর্থ ব্যয়ের জন্য আটটি খাত সুনির্দিষ্ট ছিল। এর মধ্যে রয়েছে—অভাবী ও নিঃস্বদের সাহায্য, জাকাত ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মচারীদের বেতন, ইসলামের প্রতি অনুরাগী ব্যক্তিদের সহায়তা, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঋণমুক্ত করা, আল্লাহর পথে দাওয়াতি ও প্রতিরক্ষা কাজ এবং বিপদগ্রস্ত মুসাফিরদের সহায়তা। এই সুনির্দিষ্ট খাতের বাইরে জাকাতের অর্থ ব্যয়ের কোনো সুযোগ ছিল না, যা আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করত।

প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রতিনিধি নিয়োগ
মদিনা রাষ্ট্রের পরিধি বাড়ার সাথে সাথে জাকাত সংগ্রহে প্রশাসনিক কাঠামোও বিস্তৃত হয়। অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর এবং দশম হিজরিতে বিদায় হজের সময় মহানবী (সা.) বিভিন্ন অঞ্চল ও গোত্রে যোগ্য সাহাবিদের জাকাত সংগ্রাহক হিসেবে নিয়োগ দেন।

অঞ্চলভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইয়েমেনে মুআজ ইবনে জাবাল (রা.), সানআয় মুহাজির ইবনে আবু উমাইয়া (রা.), বাহরাইনে আলা আল হাজরামি (রা.) এবং নাজরানে আলী ইবনে আবু তালেব (রা.)-এর মতো প্রাজ্ঞ সাহাবিরা দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া আসলাম, গিফার, জুহাইনা ও বনু কিলাবের মতো বিভিন্ন গোত্র থেকেও আলাদা প্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়েছিল।

মদিনা রাষ্ট্রের এই জাকাত ব্যবস্থাপনা কেবল একটি কর ব্যবস্থা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। এই পদ্ধতির মাধ্যমেই আরবের তৎকালীন সমাজ থেকে অতি দ্রুত দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব হয়েছিল এবং একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে আনসারদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রাখার আহ্বান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার

মদিনা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও জাকাত ব্যবস্থাপনা: একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

আপডেট সময় : ১১:০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

একটি আদর্শ ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার সুসংহত অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর। ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মদিনা রাষ্ট্র এবং পরবর্তী খিলাফত ব্যবস্থার অর্থনৈতিক সাফল্যের মূলে ছিল একটি সুশৃঙ্খল ও ন্যায়সংগত আর্থিক নীতি। এই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘বাইতুল মাল’ বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অর্থ মন্ত্রণালয় যে ভূমিকা পালন করে, তৎকালীন সময়ে বাইতুল মাল ঠিক সেই দায়িত্বই পালন করত। রাষ্ট্রীয় সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য।

মদিনা রাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক বিপ্লবের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল জাকাত ব্যবস্থা। হিজরি দ্বিতীয় সনে জাকাত ফরজ হওয়ার পর থেকে এটি কেবল ধর্মীয় ইবাদত হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং রাষ্ট্রের দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়। মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনায় একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টন করা হতো।

জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের মূলনীতি
নববি যুগে জাকাত সংগ্রহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করা হতো। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিধি বা সংগ্রাহক পাঠানো হতো। তাদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা ছিল যেন জাকাত আদায়ের সময় সম্পদের মালিকের ওপর কোনো প্রকার জুলুম না হয়। বিশেষ করে, দাতার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের সম্পদটি গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছিল, যাতে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত বোধ না করেন। আবার অন্যদিকে, দরিদ্রদের অধিকার আদায়েও কোনো শিথিলতা প্রদর্শন করা হতো না।

বণ্টনের ক্ষেত্রে স্থানীয় অভাবগ্রস্তদের অগ্রাধিকার দেওয়া ছিল এই ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যে অঞ্চল থেকে জাকাত সংগ্রহ করা হতো, সর্বাগ্রে সেই অঞ্চলের দরিদ্রদের মধ্যে তা বণ্টন করা হতো। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত সম্পদ মদিনার কেন্দ্রীয় বাইতুল মালে পাঠানো হতো, যা মহানবী (সা.) কৌশলগত প্রয়োজনে ও জনকল্যাণে ব্যয় করতেন।

জাকাতযোগ্য সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান
স্বর্ণ-রূপা, গবাদি পশু (উট, গরু, ছাগল), কৃষিপণ্য, ব্যবসায়িক পণ্য এবং খনিজ সম্পদের ওপর নির্দিষ্ট হারে জাকাত নির্ধারিত ছিল। এই বিধান বাস্তবায়নে রাষ্ট্র ছিল আপসহীন। ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সময় যখন কিছু গোত্র জাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল, তখন তিনি রাষ্ট্রীয় সংহতি ও দরিদ্রদের অধিকার রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, জাকাত ব্যবস্থার ওপরই রাষ্ট্রের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দাঁড়িয়ে ছিল।

ব্যয়ের খাতসমূহ
কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জাকাতের অর্থ ব্যয়ের জন্য আটটি খাত সুনির্দিষ্ট ছিল। এর মধ্যে রয়েছে—অভাবী ও নিঃস্বদের সাহায্য, জাকাত ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মচারীদের বেতন, ইসলামের প্রতি অনুরাগী ব্যক্তিদের সহায়তা, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঋণমুক্ত করা, আল্লাহর পথে দাওয়াতি ও প্রতিরক্ষা কাজ এবং বিপদগ্রস্ত মুসাফিরদের সহায়তা। এই সুনির্দিষ্ট খাতের বাইরে জাকাতের অর্থ ব্যয়ের কোনো সুযোগ ছিল না, যা আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করত।

প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রতিনিধি নিয়োগ
মদিনা রাষ্ট্রের পরিধি বাড়ার সাথে সাথে জাকাত সংগ্রহে প্রশাসনিক কাঠামোও বিস্তৃত হয়। অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর এবং দশম হিজরিতে বিদায় হজের সময় মহানবী (সা.) বিভিন্ন অঞ্চল ও গোত্রে যোগ্য সাহাবিদের জাকাত সংগ্রাহক হিসেবে নিয়োগ দেন।

অঞ্চলভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইয়েমেনে মুআজ ইবনে জাবাল (রা.), সানআয় মুহাজির ইবনে আবু উমাইয়া (রা.), বাহরাইনে আলা আল হাজরামি (রা.) এবং নাজরানে আলী ইবনে আবু তালেব (রা.)-এর মতো প্রাজ্ঞ সাহাবিরা দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া আসলাম, গিফার, জুহাইনা ও বনু কিলাবের মতো বিভিন্ন গোত্র থেকেও আলাদা প্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়েছিল।

মদিনা রাষ্ট্রের এই জাকাত ব্যবস্থাপনা কেবল একটি কর ব্যবস্থা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। এই পদ্ধতির মাধ্যমেই আরবের তৎকালীন সমাজ থেকে অতি দ্রুত দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব হয়েছিল এবং একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।