ঢাকা ০১:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

রাজনৈতিক আবর্তে গণমাধ্যম: পরিবর্তিত বয়ান ও বস্তুনিষ্ঠতার প্রশ্ন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৮:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সংবাদ উপস্থাপনার ধরন নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পালাবদলের সময়গুলোতে দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলোর সম্পাদকীয় নীতি এবং সংবাদ পরিবেশনায় ভিন্ন সুর পরিলক্ষিত হয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি কেবল বিচ্ছিন্ন সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নয়, বরং ক্ষমতা, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার এক গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি।

এক-এগারোর সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বাংলাদেশের কিছু প্রধান সংবাদমাধ্যম বিএনপি এবং দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিতভাবে সংবাদ পরিবেশন শুরু করে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই বিএনপিবিরোধী প্রচার আরও তীব্র হয়। সে সময় খালেদা জিয়াকে অবৈধ কর্মকাণ্ডের মদতদাতা এবং তারেক রহমানকে ‘পলাতক অপরাধী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো, যেখানে তথ্যের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই প্রাধান্য পেত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই সুর বদলাতে শুরু করেছে, যারা একসময় বিএনপির সমালোচনা করতেন, তাদের লেখায় এখন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সংবাদের সমাজতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণারত তাইয়িব আহমেদ বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোর এমন ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, “এর প্রধান কারণ হলো তাদের রাজনৈতিক মেরুকরণ; অধিকাংশ সংবাদপত্রই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কমবেশি সম্পৃক্ত। দ্বিতীয়ত, মিডিয়া হাউসগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো ও প্রয়োজনীয়তাও একটি বড় কারণ। মূলত এ দুই কারণে তাদের সংবাদ উপস্থাপন প্রায়ই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের অনুকূলে ঝুঁকে পড়ে। ফলে অনেক সময় তারা সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতার নীতি লঙ্ঘন করে এবং ‘জার্নালিস্টিক পাওয়ার’-এর অপব্যবহার করে।”

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এই অন্তর্নিহিত দ্বিচারিতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রভাবের কিছু উদাহরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রথম আলো:
২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রথম আলোর পাতায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বিতর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকে। ২০০৭ সালের ৩ জুন ‘খালেদার সম্মতিতে বসুন্ধরার কাছে ১০০ কোটি (টাকা) চেয়েছিলেন তারেক’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাঠক মনে গভীর সংশয় সৃষ্টি করে। এরপর ‘দ্বিতীয় মেয়াদে খালেদা জিয়া বেপরোয়া হয়ে পড়েন’ শিরোনামে সাবেক একান্ত সচিব নুরুল ইসলামের সাক্ষাৎকারকে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

২০০৭ সালের ৪ জুন প্রথম আলোতে ‘বিএনপির দুর্নীতি দুর্বৃত্তপনা’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়, যেখানে বলা হয়, “একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তার সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এর প্রধান দায় দলের শীর্ষ নেত্রী খালেদা জিয়ার। কারণ তিনি ছিলেন নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। তার অবগতির বাইরে কোনো কিছুই ঘটেনি, ঘটা সম্ভব ছিল না। তিনি তার দুই ছেলে, এক ভাই, বোন, দুই ভাগনে ও ভয়ঙ্কর নীতিহীন কিছু চাটুকার নেতাকে নিয়ে এমন এক চক্র গড়ে তুলেছিলেন, যেটাকে রাজনৈতিক দল বলে স্বীকার করা যায় না, দুর্বৃত্তচক্র বললেই সঠিক হয়। তাদের সবার যথাযথ বিচার হতে হবে।”

২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রথম আলোর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও কলামে বিএনপিকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি ও ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে যুক্ত দেখানোর চেষ্টা করা হয়। ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর ‘তারেক হামলাকারীদের আশ্বাস দিয়েছিলেন’ এবং ২০১৪ সালের ২২ আগস্ট ‘গ্রেনেড হামলায় খালেদা-তারেক জড়িত’ শিরোনামে তাদের সরাসরি অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কলামে ‘নৈতিকভাবে তারেকও দণ্ডিত’ (২০১৩) ও ‘তারেক রহমানের অভিনব রাষ্ট্রপতিতত্ত্ব’ (২০১৪) শিরোনামে তাদের চরিত্র হনন ও জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করা হয়।

২০২১ সালের ২৪ জুন ‘তারেকের নেতৃত্বে বিএনপি দাঁড়াতে পারছে না’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দলটিকে দিশাহীন ও অকার্যকর হিসেবে দেখানো হয়। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট একটি কলামে বিএনপিকে জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বিএনপির বিরুদ্ধে প্রথম আলোর কভারেজে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে সংযোগ, নৈতিক দোষারোপ ও চরিত্রহনন, ইতিহাস বিকৃতি, নেতৃত্বের দুর্বলতা প্রচার এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনার মতো কৌশলগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিএনপিকে একটি অগ্রহণযোগ্য ও অনৈতিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়।

ডেইলি স্টার:
২০০৯ সালের ২৬ অক্টোবর ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত ‘ইট ওয়াজ এ হাওয়া ভবন প্লট’ (এটি ছিল হাওয়া ভবনের ষড়যন্ত্র) শিরোনামের প্রতিবেদনে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় বিএনপিকে জড়িয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। প্রতিবেদনটির মূল সারাংশ ছিল, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনা ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার ভেতর থেকে পরিকল্পিত, অনুমোদিত ও বাস্তবায়িত এক সুদীর্ঘ রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞের ষড়যন্ত্র।

প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরা হয়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ‘হাওয়া ভবন’ একটি বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত, যেখানে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতা ও পলাতক খুনিরা একত্র হয়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে ‘দেশ ও ইসলামের শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। এই ষড়যন্ত্র ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হয়—হত্যার স্থান নির্ধারণ, অস্ত্র নির্বাচন, জঙ্গিদের ভাড়াটে হিসেবে ব্যবহার, অর্থ জোগান, গ্রেনেড সরবরাহ—সবকিছুতেই বিএনপি সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল বলে দাবি করা হয়। হামলা ব্যর্থ হওয়ার পর শুরু হয় রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের আরেকটি অধ্যায়—সত্য আড়াল করার ষড়যন্ত্র। প্রমাণ ধ্বংস, অবিস্ফোরিত গ্রেনেড উড়িয়ে দেওয়া, লাশ গোপনে দাফন, নিরপরাধ মানুষকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন, ভুয়া তদন্ত কমিশন গঠন এবং ‘বিদেশি শত্রু’ ও ‘জজ মিয়া’ নাটক—সবই ছিল মূল অপরাধীদের রক্ষা করার সুপরিকল্পিত কৌশল। প্রশাসন, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশ ওই প্রহসনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২০১৩ সালে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে যখন আন্দোলন তুঙ্গে, তখন সরকারের বিভিন্ন বাহিনী কর্তৃক যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিয়ে এর দোষ বিরোধী দলগুলোর ওপর চাপানোর অভিযোগ ওঠে। সে সময় সরকারের অনুগত গণমাধ্যমগুলো ‘এমবেডেড জার্নালিজম’-এর মাধ্যমে সরকারের ‘আগুন-সন্ত্রাস’ বয়ান প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তথাকথিত মূলধারার প্রায় নব্বই ভাগ গণমাধ্যম তখন সরাসরি সরকারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বিরোধী দলগুলোকে ‘আগুন-সন্ত্রাসী’ বলে অভিযুক্ত করতে থাকে।

এরকম একটি সময়ে ডেইলি স্টার ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে একটি কার্টুন ছাপে। তাতে দেখানো হয়, শেখ হাসিনার চেয়ারের নিচে একটি বাস দাউ দাউ করে জ্বলছে। শেখ হাসিনা চেয়ারে বসে একটি পাখা দিয়ে সেই আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন এবং বলছেন, ‘হেল্প-হেল্প’। আর তার সামনে একটি পেট্রলবোমা নিয়ে খালেদা জিয়া বসে আছেন! তার মাথা থেকে বিচ্ছুরণ হচ্ছে ‘মাই চেয়ার’ ভাবনাটি। সেই কার্টুনের ওপরে পাঠকদের লক্ষ্য করে প্রশ্ন করা হয়, ‘হোয়াট ডু ইউ থিংক ক্যান মেক দ্য ব্লিকারিং টপ টু রিচ আ ট্রুস?’ অর্থাৎ আপনার মতে ঝগড়ায় লিপ্ত শীর্ষ দুই নেতাকে কোন বিষয় একটি সমঝোতায় নিয়ে যেতে পারে?

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এর এমন অসংখ্য সংবাদ, শিরোনাম ও কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে, যা জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে অবস্থান প্রকাশ করে। ২০১১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তারিখে ডেইলি স্টার শিরোনাম করেছিল, ‘প্রোটেক্টিং করাপ্ট সন খালেদা’স বিগেস্ট পলিটিক্যাল মিস্টেক’ (দুর্নীতিগ্রস্ত ছেলেকে বাঁচানো খালেদার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল)। পরের দিন শিরোনাম করে, ‘খালেদা ফেইলড বাই সেভিং করাপ্ট সান’ (খালেদার পতন হয়েছে নিজের ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে)। ২০১৪ সালের ১৭ জুন তারিখে শিরোনাম করেছিল, ‘তারিক বিলিভস ইন রং হিস্ট্রি’ (তারেক ভুল ইতিহাসে বিশ্বাস করে)। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে যেদিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেদিন প্রথম আলো কোকোর মানি লন্ডারিংয়ের খবর ছাপে। অর্থাৎ এই গুরুত্বপূর্ণ খবরটি দেখতে দেখতেই দেশবাসী সকালবেলা ভোট দিতে কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর প্রথম আলো শিরোনাম করল, ‘তারেক-কোকো সৎ হলে অসৎ কে?’

বাংলাদেশ প্রতিদিন:
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি বদলের অন্যতম উদাহরণ হলো বাংলাদেশ প্রতিদিন। শেখ হাসিনার শাসনামলে পত্রিকাটির পাতায় বিএনপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রচার দেখা গেলেও বর্তমানে সেই অবস্থান থেকে তারা সরে এসেছে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে।

২০১৪ সালে পত্রিকাটির ‘খালেদা জিয়া এখন বিএনপি-জামায়াতের নেতা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে খালেদা জিয়াকে ‘জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী’, ‘দেশদ্রোহী’ ও ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে দেখানো হয়। ২০১৪-২৩ সালের মধ্যে পত্রিকাটি বিএনপির বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতা, সন্ত্রাস ও অস্ত্র চোরাচালানের সংযোগ, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতা এবং ষড়যন্ত্রে জড়িত হিসেবে উপস্থাপনের মতো কৌশল গ্রহণ করেছিল।

তবে বর্তমানে পত্রিকাটিতে সেই খালেদা জিয়াকে ‘আপসহীন নারী’, ‘জনগণের ভরসাস্থল’ ও ‘গণতন্ত্রের প্রতীক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ‘আপসহীন নারী খালেদা জিয়া’ শিরোনামের প্রতিবেদনে তার তিনবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া ও সার্ক চেয়ারপারসনের মতো ঐতিহাসিক সাফল্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

জনকণ্ঠ:
বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, জনকণ্ঠ তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। শেখ হাসিনার শাসনামলে এই পত্রিকার পাতায় বিএনপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চলা নেতিবাচক প্রচার আজ অনেকটাই বদলে গেছে।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে জনকণ্ঠের একটি খবরের শিরোনাম ছিল ‘খালেদার লাঠি বহরসহ আদালতে হাজিরা। বকশীবাজার রণক্ষেত্র’। ওই প্রতিবেদনে ‘রণক্ষেত্র’, ‘লাঠি বহর’, ‘গাড়ি পোড়ানো’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম হিসেবে চিত্রিত করা হয়।

২০১৬ সালের ১১ জানুয়ারি জনকণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘বিদ্রোহের আগে খালেদাকে ৪৫ বার ফোন করে তারেক’ শিরোনামে বিডিআর বিদ্রোহের সঙ্গে বিএনপি নেতৃত্বকে জড়ানোর চেষ্টা করা হয়। একই বছর জুন মাসে ‘ফের জ্বালাও পোড়াও আন্দোলনের ছক বিএনপি-জামায়াতের’ শিরোনামে দলটিকে সহিংসতায় উসকানিদাতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

বিভিন্ন কলামের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের চরিত্র হননের চেষ্টা করেছিল পত্রিকাটি। ‘কোকো কাহিনির আরেক পিঠ ফালু কাহিনি’ কলামে (২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি) বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক আলীকে কেন্দ্র করে দলটিকে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত করা হয়। ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি শাহরিয়ার কবিরের ‘খালেদার রাষ্ট্রদ্রোহ বনাম আমাদের রাষ্ট্রদ্রোহ’ কলামে খালেদা জিয়াকে সরাসরি ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যা দেওয়া হয়।

২০১৬ সালের ২ নভেম্বর ‘দুই নেত্রী? একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ’ কলামে খালেদা জিয়াকে ‘অদক্ষ, অপ্রস্তুত ও দেশপ্রেম বিহীন’ নেতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়। ২০২৩ সালের ২৩ জুন জনকণ্ঠে লেখা হয়, ‘২০০১ সালে মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল খালেদা জিয়া’ শিরোনামে বিএনপির ক্ষমতায় আসাকে অবৈধ প্রমাণের চেষ্টা চালানো হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পত্রিকাটির সম্পাদকীয় নীতিতে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

দেশের অধিকাংশ পত্রিকাতেই এভাবে আওয়ামী লীগের শাসনামলে দলটির রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠায় এক ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের এই পরিবর্তিত বয়ান আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের ইতিহাস নয়; এটি ক্ষমতা, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার এক গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি। যে পত্রিকাগুলো একসময় বিরোধী রাজনীতিকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’, ‘সন্ত্রাস’ ও ‘অনৈতিকতা’র প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছিল, সময়ের পরিবর্তনে তারাই আবার ভিন্ন ভাষায় একই রাজনৈতিক শক্তিকে গণতন্ত্রের আশা হিসেবে হাজির করেছে। এই রূপান্তর প্রমাণ করে—বাংলাদেশে বেশিরভাগ গণমাধ্যম এখনো ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাষা বদলায় কিন্তু সাংবাদিকতার নৈতিক অবস্থান বদলায় না, যা বস্তুনিষ্ঠতার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাখাইনে ত্রিমুখী ভয়াবহ সংঘর্ষ: টেকনাফে শিশু গুলিবিদ্ধ, ৫৩ সশস্ত্র সদস্য আটক

রাজনৈতিক আবর্তে গণমাধ্যম: পরিবর্তিত বয়ান ও বস্তুনিষ্ঠতার প্রশ্ন

আপডেট সময় : ০৯:২৮:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সংবাদ উপস্থাপনার ধরন নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পালাবদলের সময়গুলোতে দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলোর সম্পাদকীয় নীতি এবং সংবাদ পরিবেশনায় ভিন্ন সুর পরিলক্ষিত হয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি কেবল বিচ্ছিন্ন সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নয়, বরং ক্ষমতা, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার এক গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি।

এক-এগারোর সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বাংলাদেশের কিছু প্রধান সংবাদমাধ্যম বিএনপি এবং দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিতভাবে সংবাদ পরিবেশন শুরু করে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই বিএনপিবিরোধী প্রচার আরও তীব্র হয়। সে সময় খালেদা জিয়াকে অবৈধ কর্মকাণ্ডের মদতদাতা এবং তারেক রহমানকে ‘পলাতক অপরাধী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো, যেখানে তথ্যের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই প্রাধান্য পেত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই সুর বদলাতে শুরু করেছে, যারা একসময় বিএনপির সমালোচনা করতেন, তাদের লেখায় এখন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সংবাদের সমাজতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণারত তাইয়িব আহমেদ বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোর এমন ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, “এর প্রধান কারণ হলো তাদের রাজনৈতিক মেরুকরণ; অধিকাংশ সংবাদপত্রই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কমবেশি সম্পৃক্ত। দ্বিতীয়ত, মিডিয়া হাউসগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো ও প্রয়োজনীয়তাও একটি বড় কারণ। মূলত এ দুই কারণে তাদের সংবাদ উপস্থাপন প্রায়ই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের অনুকূলে ঝুঁকে পড়ে। ফলে অনেক সময় তারা সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতার নীতি লঙ্ঘন করে এবং ‘জার্নালিস্টিক পাওয়ার’-এর অপব্যবহার করে।”

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এই অন্তর্নিহিত দ্বিচারিতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রভাবের কিছু উদাহরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রথম আলো:
২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রথম আলোর পাতায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বিতর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকে। ২০০৭ সালের ৩ জুন ‘খালেদার সম্মতিতে বসুন্ধরার কাছে ১০০ কোটি (টাকা) চেয়েছিলেন তারেক’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাঠক মনে গভীর সংশয় সৃষ্টি করে। এরপর ‘দ্বিতীয় মেয়াদে খালেদা জিয়া বেপরোয়া হয়ে পড়েন’ শিরোনামে সাবেক একান্ত সচিব নুরুল ইসলামের সাক্ষাৎকারকে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

২০০৭ সালের ৪ জুন প্রথম আলোতে ‘বিএনপির দুর্নীতি দুর্বৃত্তপনা’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়, যেখানে বলা হয়, “একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তার সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এর প্রধান দায় দলের শীর্ষ নেত্রী খালেদা জিয়ার। কারণ তিনি ছিলেন নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। তার অবগতির বাইরে কোনো কিছুই ঘটেনি, ঘটা সম্ভব ছিল না। তিনি তার দুই ছেলে, এক ভাই, বোন, দুই ভাগনে ও ভয়ঙ্কর নীতিহীন কিছু চাটুকার নেতাকে নিয়ে এমন এক চক্র গড়ে তুলেছিলেন, যেটাকে রাজনৈতিক দল বলে স্বীকার করা যায় না, দুর্বৃত্তচক্র বললেই সঠিক হয়। তাদের সবার যথাযথ বিচার হতে হবে।”

২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রথম আলোর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও কলামে বিএনপিকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি ও ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে যুক্ত দেখানোর চেষ্টা করা হয়। ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর ‘তারেক হামলাকারীদের আশ্বাস দিয়েছিলেন’ এবং ২০১৪ সালের ২২ আগস্ট ‘গ্রেনেড হামলায় খালেদা-তারেক জড়িত’ শিরোনামে তাদের সরাসরি অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কলামে ‘নৈতিকভাবে তারেকও দণ্ডিত’ (২০১৩) ও ‘তারেক রহমানের অভিনব রাষ্ট্রপতিতত্ত্ব’ (২০১৪) শিরোনামে তাদের চরিত্র হনন ও জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করা হয়।

২০২১ সালের ২৪ জুন ‘তারেকের নেতৃত্বে বিএনপি দাঁড়াতে পারছে না’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দলটিকে দিশাহীন ও অকার্যকর হিসেবে দেখানো হয়। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট একটি কলামে বিএনপিকে জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বিএনপির বিরুদ্ধে প্রথম আলোর কভারেজে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে সংযোগ, নৈতিক দোষারোপ ও চরিত্রহনন, ইতিহাস বিকৃতি, নেতৃত্বের দুর্বলতা প্রচার এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনার মতো কৌশলগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিএনপিকে একটি অগ্রহণযোগ্য ও অনৈতিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়।

ডেইলি স্টার:
২০০৯ সালের ২৬ অক্টোবর ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত ‘ইট ওয়াজ এ হাওয়া ভবন প্লট’ (এটি ছিল হাওয়া ভবনের ষড়যন্ত্র) শিরোনামের প্রতিবেদনে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় বিএনপিকে জড়িয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। প্রতিবেদনটির মূল সারাংশ ছিল, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনা ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার ভেতর থেকে পরিকল্পিত, অনুমোদিত ও বাস্তবায়িত এক সুদীর্ঘ রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞের ষড়যন্ত্র।

প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরা হয়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ‘হাওয়া ভবন’ একটি বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত, যেখানে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতা ও পলাতক খুনিরা একত্র হয়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে ‘দেশ ও ইসলামের শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। এই ষড়যন্ত্র ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হয়—হত্যার স্থান নির্ধারণ, অস্ত্র নির্বাচন, জঙ্গিদের ভাড়াটে হিসেবে ব্যবহার, অর্থ জোগান, গ্রেনেড সরবরাহ—সবকিছুতেই বিএনপি সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল বলে দাবি করা হয়। হামলা ব্যর্থ হওয়ার পর শুরু হয় রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের আরেকটি অধ্যায়—সত্য আড়াল করার ষড়যন্ত্র। প্রমাণ ধ্বংস, অবিস্ফোরিত গ্রেনেড উড়িয়ে দেওয়া, লাশ গোপনে দাফন, নিরপরাধ মানুষকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন, ভুয়া তদন্ত কমিশন গঠন এবং ‘বিদেশি শত্রু’ ও ‘জজ মিয়া’ নাটক—সবই ছিল মূল অপরাধীদের রক্ষা করার সুপরিকল্পিত কৌশল। প্রশাসন, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশ ওই প্রহসনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২০১৩ সালে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে যখন আন্দোলন তুঙ্গে, তখন সরকারের বিভিন্ন বাহিনী কর্তৃক যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিয়ে এর দোষ বিরোধী দলগুলোর ওপর চাপানোর অভিযোগ ওঠে। সে সময় সরকারের অনুগত গণমাধ্যমগুলো ‘এমবেডেড জার্নালিজম’-এর মাধ্যমে সরকারের ‘আগুন-সন্ত্রাস’ বয়ান প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তথাকথিত মূলধারার প্রায় নব্বই ভাগ গণমাধ্যম তখন সরাসরি সরকারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বিরোধী দলগুলোকে ‘আগুন-সন্ত্রাসী’ বলে অভিযুক্ত করতে থাকে।

এরকম একটি সময়ে ডেইলি স্টার ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে একটি কার্টুন ছাপে। তাতে দেখানো হয়, শেখ হাসিনার চেয়ারের নিচে একটি বাস দাউ দাউ করে জ্বলছে। শেখ হাসিনা চেয়ারে বসে একটি পাখা দিয়ে সেই আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন এবং বলছেন, ‘হেল্প-হেল্প’। আর তার সামনে একটি পেট্রলবোমা নিয়ে খালেদা জিয়া বসে আছেন! তার মাথা থেকে বিচ্ছুরণ হচ্ছে ‘মাই চেয়ার’ ভাবনাটি। সেই কার্টুনের ওপরে পাঠকদের লক্ষ্য করে প্রশ্ন করা হয়, ‘হোয়াট ডু ইউ থিংক ক্যান মেক দ্য ব্লিকারিং টপ টু রিচ আ ট্রুস?’ অর্থাৎ আপনার মতে ঝগড়ায় লিপ্ত শীর্ষ দুই নেতাকে কোন বিষয় একটি সমঝোতায় নিয়ে যেতে পারে?

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এর এমন অসংখ্য সংবাদ, শিরোনাম ও কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে, যা জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে অবস্থান প্রকাশ করে। ২০১১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তারিখে ডেইলি স্টার শিরোনাম করেছিল, ‘প্রোটেক্টিং করাপ্ট সন খালেদা’স বিগেস্ট পলিটিক্যাল মিস্টেক’ (দুর্নীতিগ্রস্ত ছেলেকে বাঁচানো খালেদার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল)। পরের দিন শিরোনাম করে, ‘খালেদা ফেইলড বাই সেভিং করাপ্ট সান’ (খালেদার পতন হয়েছে নিজের ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে)। ২০১৪ সালের ১৭ জুন তারিখে শিরোনাম করেছিল, ‘তারিক বিলিভস ইন রং হিস্ট্রি’ (তারেক ভুল ইতিহাসে বিশ্বাস করে)। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে যেদিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেদিন প্রথম আলো কোকোর মানি লন্ডারিংয়ের খবর ছাপে। অর্থাৎ এই গুরুত্বপূর্ণ খবরটি দেখতে দেখতেই দেশবাসী সকালবেলা ভোট দিতে কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর প্রথম আলো শিরোনাম করল, ‘তারেক-কোকো সৎ হলে অসৎ কে?’

বাংলাদেশ প্রতিদিন:
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি বদলের অন্যতম উদাহরণ হলো বাংলাদেশ প্রতিদিন। শেখ হাসিনার শাসনামলে পত্রিকাটির পাতায় বিএনপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রচার দেখা গেলেও বর্তমানে সেই অবস্থান থেকে তারা সরে এসেছে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে।

২০১৪ সালে পত্রিকাটির ‘খালেদা জিয়া এখন বিএনপি-জামায়াতের নেতা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে খালেদা জিয়াকে ‘জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী’, ‘দেশদ্রোহী’ ও ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে দেখানো হয়। ২০১৪-২৩ সালের মধ্যে পত্রিকাটি বিএনপির বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতা, সন্ত্রাস ও অস্ত্র চোরাচালানের সংযোগ, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতা এবং ষড়যন্ত্রে জড়িত হিসেবে উপস্থাপনের মতো কৌশল গ্রহণ করেছিল।

তবে বর্তমানে পত্রিকাটিতে সেই খালেদা জিয়াকে ‘আপসহীন নারী’, ‘জনগণের ভরসাস্থল’ ও ‘গণতন্ত্রের প্রতীক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ‘আপসহীন নারী খালেদা জিয়া’ শিরোনামের প্রতিবেদনে তার তিনবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া ও সার্ক চেয়ারপারসনের মতো ঐতিহাসিক সাফল্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

জনকণ্ঠ:
বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, জনকণ্ঠ তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। শেখ হাসিনার শাসনামলে এই পত্রিকার পাতায় বিএনপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চলা নেতিবাচক প্রচার আজ অনেকটাই বদলে গেছে।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে জনকণ্ঠের একটি খবরের শিরোনাম ছিল ‘খালেদার লাঠি বহরসহ আদালতে হাজিরা। বকশীবাজার রণক্ষেত্র’। ওই প্রতিবেদনে ‘রণক্ষেত্র’, ‘লাঠি বহর’, ‘গাড়ি পোড়ানো’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম হিসেবে চিত্রিত করা হয়।

২০১৬ সালের ১১ জানুয়ারি জনকণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘বিদ্রোহের আগে খালেদাকে ৪৫ বার ফোন করে তারেক’ শিরোনামে বিডিআর বিদ্রোহের সঙ্গে বিএনপি নেতৃত্বকে জড়ানোর চেষ্টা করা হয়। একই বছর জুন মাসে ‘ফের জ্বালাও পোড়াও আন্দোলনের ছক বিএনপি-জামায়াতের’ শিরোনামে দলটিকে সহিংসতায় উসকানিদাতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

বিভিন্ন কলামের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের চরিত্র হননের চেষ্টা করেছিল পত্রিকাটি। ‘কোকো কাহিনির আরেক পিঠ ফালু কাহিনি’ কলামে (২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি) বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক আলীকে কেন্দ্র করে দলটিকে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত করা হয়। ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি শাহরিয়ার কবিরের ‘খালেদার রাষ্ট্রদ্রোহ বনাম আমাদের রাষ্ট্রদ্রোহ’ কলামে খালেদা জিয়াকে সরাসরি ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যা দেওয়া হয়।

২০১৬ সালের ২ নভেম্বর ‘দুই নেত্রী? একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ’ কলামে খালেদা জিয়াকে ‘অদক্ষ, অপ্রস্তুত ও দেশপ্রেম বিহীন’ নেতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়। ২০২৩ সালের ২৩ জুন জনকণ্ঠে লেখা হয়, ‘২০০১ সালে মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল খালেদা জিয়া’ শিরোনামে বিএনপির ক্ষমতায় আসাকে অবৈধ প্রমাণের চেষ্টা চালানো হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পত্রিকাটির সম্পাদকীয় নীতিতে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

দেশের অধিকাংশ পত্রিকাতেই এভাবে আওয়ামী লীগের শাসনামলে দলটির রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠায় এক ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের এই পরিবর্তিত বয়ান আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের ইতিহাস নয়; এটি ক্ষমতা, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার এক গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি। যে পত্রিকাগুলো একসময় বিরোধী রাজনীতিকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’, ‘সন্ত্রাস’ ও ‘অনৈতিকতা’র প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছিল, সময়ের পরিবর্তনে তারাই আবার ভিন্ন ভাষায় একই রাজনৈতিক শক্তিকে গণতন্ত্রের আশা হিসেবে হাজির করেছে। এই রূপান্তর প্রমাণ করে—বাংলাদেশে বেশিরভাগ গণমাধ্যম এখনো ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাষা বদলায় কিন্তু সাংবাদিকতার নৈতিক অবস্থান বদলায় না, যা বস্তুনিষ্ঠতার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।