ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিকের মোহনায় দক্ষিণ আফ্রিকার সাইমন’স টাউনে শুরু হয়েছে ব্রিকস জোটের সদস্য দেশগুলোর এক সপ্তাহব্যাপী যৌথ নৌ মহড়া। ‘উইল ফর পিস ২০২৬’ নামক এই মহড়ায় অংশ নিয়েছে চীন, রাশিয়া ও ইরান। তবে জোটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েও এই সামরিক মহড়া থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছে ভারত। আর ব্রাজিল অংশ নিয়েছে কেবল পর্যবেক্ষক হিসেবে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
উদ্বেগজনক বৈশ্বিক সামুদ্রিক উত্তেজনার মুখে এই মহড়াকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে ওয়াশিংটন এই জোটকে কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং একটি ভূ–রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
মহড়ায় কে কী পাঠালো?
শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই মহড়ার নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন। এতে চীন ও ইরান পাঠিয়েছে তাদের শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ার। রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পাঠিয়েছে কর্ভেট এবং স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা মোতায়েন করেছে একটি ফ্রিগেট।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দক্ষিণ আফ্রিকার জয়েন্ট টাস্কফোর্স কমান্ডার ক্যাপ্টেন এনডওয়াখুলু থমাস থামাহা বলেন, এটি কেবল একটি সামরিক মহড়া নয়, বরং ব্রিকস জোটের দেশগুলোর সক্ষমতার একটি শক্তিশালী বার্তা। তিনি একে ‘ব্রিকস প্লাস’ অপারেশন হিসেবে অভিহিত করেন, যার লক্ষ্য সামুদ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মহড়ায় অংশ নেওয়া একটি রুশ যুদ্ধজাহাজ। ছবি: রয়টার্স
২০২৪ সালে ব্রিকস সম্প্রসারিত হওয়ার পর ইরান, মিসর, ইথিওপিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এতে যোগ দেয়। এবারের মহড়ায় ব্রাজিল ছাড়াও পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে মিসর, ইন্দোনেশিয়া ও ইথিওপিয়া।
কেন সরে দাঁড়ালো ভারত?
ব্রিকসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েও ভারতের অনুপস্থিতি বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তনের পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা নয়াদিল্লির জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভূ–রাজনৈতিক বিশ্লেষক হর্ষ পন্থ আল–জাজিরাকে বলেন, ভারত এই মহড়া থেকে দূরে থাকছে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার্থে। ব্রিকস মূলত অর্থনৈতিক সহযোগিতার জোট, সামরিক জোট নয়। তাই ভারত নিজেকে এই ‘ওয়ারগেম’–এর সঙ্গে জড়াতে চাইছে না।
উল্লেখ্য, রুশ তেল কেনা এবং ইউক্রেন যুদ্ধে পরোক্ষ সহযোগিতার অভিযোগে ভারতের ওপর সম্প্রতি কঠোর ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এমন পরিস্থিতিতে ব্রিকসের সামরিক মহড়ায় যোগ দেওয়া নয়াদিল্লির জন্য কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ট্রাম্পের চোখরাঙানি ও বৈশ্বিক রাজনীতি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু থেকেই ব্রিকস জোটের প্রতি আক্রমণাত্মক। ক্ষমতায় আসার পর তিনি ব্রিকস সদস্যদের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের মতে, এই জোট ‘যুক্তরাষ্ট্র–বিরোধী’ নীতি অনুসরণ করছে।
গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলা সীমান্ত থেকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়া এবং একটি রুশ তেলবাহী ট্যাঙ্কার আটকের পর এই মহড়া শুরু হওয়ায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে। কিউবা, কলম্বিয়া এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের বিরুদ্ধেও সামরিক ব্যবস্থার হুমকি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প।
এর জবাবে গত জুলাইয়ে ব্রিকস সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নাম না নিয়ে এককভাবে শুল্ক আরোপ ও ইরানের ওপর সামরিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল।
দক্ষিণ আফ্রিকার ঝুঁকি
দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য এই মহড়া আয়োজন বড় ধরনের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্যের ওপর ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এর পেছনে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার আনা গণহত্যার মামলা।
এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার অভ্যন্তরেও এই মহড়া নিয়ে বিতর্ক চলছে। সরকারের শরিক দল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (ডিএ) মনে করে, এই মহড়া দক্ষিণ আফ্রিকাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি ‘গুটি’ হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ দিচ্ছে। তাদের মতে, ব্রিকসের কোনও প্রতিরক্ষা ভূমিকা নেই, তাই এমন মহড়ার কোনও প্রয়োজন ছিল না।
রিপোর্টারের নাম 
























