ঢাকা ০৮:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

রাজনীতি থেকে চিরতরে অবসরের ঘোষণা বিএনপির সেই আলোচিত এমপির

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:০৪:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

মাগুরা-২ (মহম্মদপুর-শালিখা-সদরের চার ইউনিয়ন) সংসদীয় আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কাজী সালিমুল হক কামাল রাজনীতি ও ভবিষ্যতে সব ধরনের নির্বাচন থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ১২টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এ ঘোষণা দেন তিনি।

সালিমুল হক ফেসবুকে লেখেন, ‘দীর্ঘ সাত বছর কারাবাসে আমার পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবারের একান্ত অনুরোধে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর কোনও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো না এবং সক্রিয় রাজনীতি থেকে চিরতরে অবসর গ্রহণ করছি। জীবনের বাকি সময়টুকু পরিবার নিয়ে শান্তিতে কাটাতে চাই।’

কাজী সালিমুল হক কামাল তার স্ট্যাটাসে স্মৃতিচারণ করে লেখেন, ২০০৮ সালের পর তিনি রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। ২০১৭ সালে একটি মিথ্যা মামলায় কারাবরণ করতে হয়। দীর্ঘ কারাবাস শেষে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর অসুস্থ শরীরে তিনি ২২ আগস্ট কারাগার থেকে মুক্তি পান। মুক্তির দিন নেতাকর্মীদের ভালোবাসা ও আবেগ তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। মুক্তির পর গত ১৬ মাসে মাত্র চারবার মাগুরায় আসেন এবং প্রতিবারই নেতাকর্মীদের চোখে ভালোবাসার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের কষ্ট ও বেদনা দেখেছেন। ১৬ বছর ধরে মাগুরার ত্যাগী নেতাকর্মীরা মামলা, হামলা, জেল ও নির্যাতন সহ্য করেও বিএনপির পতাকা আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।

স্ট্যাটাসে দলীয় হাইকমান্ডের প্রতি প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‌তৃণমূল নেতাকর্মীদের আবেগ ও অনুভূতির কোনও মূল্য দেওয়া হচ্ছে না। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচনের জন্য মাগুরা-২ আসনে প্রাথমিক প্রার্থী ঘোষণার পর তৃণমূলে যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে, তা দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনার ফল। মাগুরা-২ আসনের ৫১৩ জন দায়িত্বশীল নেতার মধ্যে ৫০১ জন, ১৯টি ইউনিয়নের ১৮ জন সাবেক চেয়ারম্যান এবং দুজন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান লিখিতভাবে ওই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তবে তৃণমূলের সেই মতামতকে কোনও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে বিতর্কিতদের পুনর্বাসনের চেষ্টা দলকে আদর্শিকভাবে দুর্বল করছে। এতে ভবিষ্যতে দলের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়তে পারে।

আড়পাড়ার এক প্রতিবাদ সভার প্রসঙ্গ টেনে কাজী সালিমুল হক কামাল বলেন, তিনি কখনও নিজের জন্য মনোনয়ন চাননি। তৃণমূলের পছন্দ অনুযায়ী অন্য কোনও যোগ্য প্রার্থী দিলেও নেতাকর্মীরা মেনে নিতেন। তবে দলের বর্তমান অনড় অবস্থান দেখে তিনি উপলব্ধি করেছেন, এখানে তৃণমূলের যুক্তি বা আবেগের কোনও মূল্য নেই।

স্ট্যাটাসের শেষাংশে নেতাকর্মীদের সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ক্ষোভ থাকলেও এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যাতে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তরুণদের সামনে রাজনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। তারুণ্যের জয় হোক। তবে মনে রাখবেন, কর্মীদের চোখের পানি কখনও দলের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না।

এর আগে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাগুরার দুটি আসন (মাগুরা-১ ও মাগুরা-২) থেকে সালিমুল হকের পক্ষে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন স্থানীয় বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা।

শালিখা উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আনিসুর রহমান বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে সালিমুল হক নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিয়ে আগামীকাল বৈঠক আহ্বান করেছি। সেখানে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে দীর্ঘদিন নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেই আমরা বিএনপি করি। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে আমরা কেউ নই।’

বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, মাগুরা জেলা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সাবেক সভাপতি কাজী সালিমুল হক ১৯৯৪ সালে বহুল আলোচিত মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। ওই উপনির্বাচনে ভোট ডাকাতি ও কারচুপির অভিযোগ তুলে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। পরে বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সংসদে বিল পাস করে। এরপর ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনেও মাগুরা-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৮ সালের পর সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাজী সালিমুল হকও আসামি ছিলেন। এ মামলায় ২০১৭ সাল থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে কারামুক্ত হন।

দীর্ঘ বিরতির পর গত ডিসেম্বরে মাগুরার রাজনীতির মঞ্চে ফেরেন সালিমুল হক। এরপর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্যসচিব রবিউল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে মাগুরা-২ আসনের নির্বাচনী এলাকায় একাধিক বড় সমাবেশ করেন। তারা দুজনই এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী। এর আগে ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তাকে এ আসনে মনোনয়ন দেয় দলটি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে ইরানের পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতি কড়া বার্তা

রাজনীতি থেকে চিরতরে অবসরের ঘোষণা বিএনপির সেই আলোচিত এমপির

আপডেট সময় : ০৬:০৪:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫

মাগুরা-২ (মহম্মদপুর-শালিখা-সদরের চার ইউনিয়ন) সংসদীয় আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কাজী সালিমুল হক কামাল রাজনীতি ও ভবিষ্যতে সব ধরনের নির্বাচন থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ১২টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এ ঘোষণা দেন তিনি।

সালিমুল হক ফেসবুকে লেখেন, ‘দীর্ঘ সাত বছর কারাবাসে আমার পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবারের একান্ত অনুরোধে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর কোনও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো না এবং সক্রিয় রাজনীতি থেকে চিরতরে অবসর গ্রহণ করছি। জীবনের বাকি সময়টুকু পরিবার নিয়ে শান্তিতে কাটাতে চাই।’

কাজী সালিমুল হক কামাল তার স্ট্যাটাসে স্মৃতিচারণ করে লেখেন, ২০০৮ সালের পর তিনি রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। ২০১৭ সালে একটি মিথ্যা মামলায় কারাবরণ করতে হয়। দীর্ঘ কারাবাস শেষে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর অসুস্থ শরীরে তিনি ২২ আগস্ট কারাগার থেকে মুক্তি পান। মুক্তির দিন নেতাকর্মীদের ভালোবাসা ও আবেগ তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। মুক্তির পর গত ১৬ মাসে মাত্র চারবার মাগুরায় আসেন এবং প্রতিবারই নেতাকর্মীদের চোখে ভালোবাসার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের কষ্ট ও বেদনা দেখেছেন। ১৬ বছর ধরে মাগুরার ত্যাগী নেতাকর্মীরা মামলা, হামলা, জেল ও নির্যাতন সহ্য করেও বিএনপির পতাকা আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।

স্ট্যাটাসে দলীয় হাইকমান্ডের প্রতি প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‌তৃণমূল নেতাকর্মীদের আবেগ ও অনুভূতির কোনও মূল্য দেওয়া হচ্ছে না। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচনের জন্য মাগুরা-২ আসনে প্রাথমিক প্রার্থী ঘোষণার পর তৃণমূলে যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে, তা দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনার ফল। মাগুরা-২ আসনের ৫১৩ জন দায়িত্বশীল নেতার মধ্যে ৫০১ জন, ১৯টি ইউনিয়নের ১৮ জন সাবেক চেয়ারম্যান এবং দুজন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান লিখিতভাবে ওই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তবে তৃণমূলের সেই মতামতকে কোনও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে বিতর্কিতদের পুনর্বাসনের চেষ্টা দলকে আদর্শিকভাবে দুর্বল করছে। এতে ভবিষ্যতে দলের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়তে পারে।

আড়পাড়ার এক প্রতিবাদ সভার প্রসঙ্গ টেনে কাজী সালিমুল হক কামাল বলেন, তিনি কখনও নিজের জন্য মনোনয়ন চাননি। তৃণমূলের পছন্দ অনুযায়ী অন্য কোনও যোগ্য প্রার্থী দিলেও নেতাকর্মীরা মেনে নিতেন। তবে দলের বর্তমান অনড় অবস্থান দেখে তিনি উপলব্ধি করেছেন, এখানে তৃণমূলের যুক্তি বা আবেগের কোনও মূল্য নেই।

স্ট্যাটাসের শেষাংশে নেতাকর্মীদের সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ক্ষোভ থাকলেও এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যাতে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তরুণদের সামনে রাজনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। তারুণ্যের জয় হোক। তবে মনে রাখবেন, কর্মীদের চোখের পানি কখনও দলের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না।

এর আগে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাগুরার দুটি আসন (মাগুরা-১ ও মাগুরা-২) থেকে সালিমুল হকের পক্ষে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন স্থানীয় বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা।

শালিখা উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আনিসুর রহমান বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে সালিমুল হক নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিয়ে আগামীকাল বৈঠক আহ্বান করেছি। সেখানে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে দীর্ঘদিন নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেই আমরা বিএনপি করি। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে আমরা কেউ নই।’

বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, মাগুরা জেলা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সাবেক সভাপতি কাজী সালিমুল হক ১৯৯৪ সালে বহুল আলোচিত মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। ওই উপনির্বাচনে ভোট ডাকাতি ও কারচুপির অভিযোগ তুলে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। পরে বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সংসদে বিল পাস করে। এরপর ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনেও মাগুরা-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৮ সালের পর সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাজী সালিমুল হকও আসামি ছিলেন। এ মামলায় ২০১৭ সাল থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে কারামুক্ত হন।

দীর্ঘ বিরতির পর গত ডিসেম্বরে মাগুরার রাজনীতির মঞ্চে ফেরেন সালিমুল হক। এরপর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্যসচিব রবিউল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে মাগুরা-২ আসনের নির্বাচনী এলাকায় একাধিক বড় সমাবেশ করেন। তারা দুজনই এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী। এর আগে ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তাকে এ আসনে মনোনয়ন দেয় দলটি।