ঢাকা ০৬:৩৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

বন বিভাগের মাঠপর্যায়ে পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মীদের হতাশা কাটছে না

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:২৬:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও আইন মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট ঘোষণার পরও বন বিভাগের মাঠপর্যায়ে কর্মরত পদোন্নতি বঞ্চিতদের হতাশা কাটছে না। খুলনা অঞ্চলের বন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পদোন্নতির প্রক্রিয়া চললেও জ্যেষ্ঠতা মানা হচ্ছে না। ফলে সিনিয়ররা বঞ্চিত থাকছেন। জুনিয়ররা সিনিয়রিটি পেতে যাচ্ছেন। যা হতাশার কারণ।

বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে পদোন্নতি বঞ্চিত ফরেস্টার ও বন প্রহরীদের পদোন্নতি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তীতে পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এতে বনকর্মীরা হতাশা কাটিয়ে আশার আলো দেখতে শুরু করেন। দীর্ঘদিনের বৈষম্যের শিকার মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে আসে। উপদেষ্টার এই পদক্ষেপকে পুঁজি করে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মচারী কোটি টাকার বাণিজ্য করেন। এতে বলি হতে হয় মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের। 

খুলনা অঞ্চলের দুজন বন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত সেপ্টেম্বর মাসে ৫৫৪ জন ফরেস্টার ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি পান। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন বিচার বিভাগ জ্যেষ্ঠতা সমস্যা সমাধানকল্পে রাজস্ব খাতে যোগদানের তারিখ থেকে এবং মামলার পক্ষভুক্ত নন; কিন্তু একই জ্যেষ্ঠতা তালিকার যোগ্য ফরেস্টারদের ক্ষেত্রেও সমতার নীতি অনুসরণ করে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়ে মতামত দিয়েছিল। কিন্তু সেই সমতার নীতির মতামতকে উপেক্ষা করে আশির দশকে যোগদান করা ফরেস্টারদের পদোন্নতি না দিয়ে পদোন্নতি পেলেন ২০১৪ সালে যোগদান করা ফরেস্টাররা। এতে পদোন্নতিবঞ্চিত হন ২৫-৩০ বছর ধরে চাকরিরত ফরেস্টাররা। অনেকে বিভাগের কর্মকর্তাদের টাকা দিয়ে পদোন্নতির নীতিমালা ও যোগ্যতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেদের মতো করে পদোন্নতি নেন। এতে সিনিয়ররা অনেকাংশে বঞ্চিত হন আর জুনিয়ররা হন লাভবান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খুলনা অঞ্চলের এক বন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডেপুটি রেঞ্জার পদেও পদোন্নতির ব্যত্যয় হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী পদোন্নতির পূর্বে গ্রেডেশন তালিকা প্রকাশের বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু গ্রেডেশন তালিকা না করে পদোন্নতির তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে পদোন্নতি বঞ্চিতদের জীবনে নেমে আসে হতাশা। আইন বিচার বিভাগের মতামত অনুযায়ী সমতার নীতি অনুসরণ করে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির কথা থাকলেও ডেপুটি রেঞ্জার পদোন্নতিতে করা হয়েছে অনিয়ম। পদোন্নতি তালিকা অনুযায়ী আশির দশকে যোগদান করা ডেপুটি রেঞ্জাররা ২০১৪ সালে যোগদান করা ডেপুটি রেঞ্জারদের তুলনায় জুনিয়র। তাদের মধ্যেও দানা বেঁধেছে ক্ষোভ। সিনিয়রিটি সমস্যার প্রতিকার পেতে বৈষ্যমের শিকার পদোন্নতিপ্রাপ্ত ডেপুটি রেঞ্জারদের একটা অংশ ইতিমধ্যে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল ও আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক বন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও টাকার বিনিময়ে পদোন্নতি পেয়েছেন। কোনও কর্মচারী দুর্নীতিতে অভিযুক্ত থাকলে তার পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রভাব ও তদবিরের বলে লামা বন বিভাগের তৈন রেঞ্জের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে সংরক্ষিত বনের গাছ কেটে পাচারের দায়ে অভিযুক্ত জুলফিকার আলী পদোন্নতি পেয়েছেন। জুলফিকার সিন্ডিকেটের অন্যতম সঙ্গী আমীরুল যার নিয়মিতকরণ হয় ২০১৮ সালে এবং চাকরিচ্যুতির কারণে ২০১৬ সালের গ্রেডেশন তালিকায় নাম না থাকলেও অদৃশ্য ক্ষমতাবলে ২০১৬ সালের নিয়মিত ফরেস্টারদের আগের সিরিয়ালে গ্রেডেশন তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এ ছাড়াও সিন্ডিকেটের আরেকজন মোহাম্মদ শাহিন মিয়া যিনি প্রকল্পে যোগদান করেন ১৯৯৮ সালের ১৫ এপ্রিল। চাকরি নিয়মিতকরণ হয় ২০০৫ সালে। তিনি যে প্রকল্পে যোগদান করেছিলেন তার সমাপ্তি হয় ২০০৬ সালে। তিনিও পেয়েছেন পদোন্নতি। এতে প্রশ্ন থেকে যায়, কীভাবে এসব লোকজন পদোন্নতি পেলেন।

তিনি বলেন, ‌‘আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি পদোন্নতি বঞ্চিত এবং সিনিয়রিটি বঞ্চিতদের তিনটি মামলা চলমান রেখে গ্রেডেশন তালিকা প্রকাশ ছাড়াই প্রমোশন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু  আদালতের কোনও নিষেধাজ্ঞা না থাকা সত্ত্বেও ৩৫ বছর ধরে চাকরি করা ফরেস্ট গার্ডদের কেন প্রমোশন দেওয়া হচ্ছে না। উল্টো ফরেস্টেরদের চার মাসের ব্যবধানে দুটি প্রমোশন হচ্ছে। যে কারণে বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের ফরেস্ট গার্ডদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান বন সংরক্ষক মুনির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পদোন্নতির জন্য যোগ্যদের তালিকা তৈরিতে পাঁচ সদস্যের কমিটি কাজ করেছে। আমি এই কমিটিতে নেই। ওই কমিটি আইনি প্রক্রিয়া, মন্ত্রণালয়ের মতামত, মামলার বিষয় আমলে নিয়েই তালিকা তৈরি ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনে সুপারিশ পাঠিয়েছে। পাবলিক সার্ভিস কমিশন এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। পদোন্নতির কমিটির সদস্যরা যোগ্যতাকে প্রধান্য দিয়েই তালিকা তৈরি ও সুপারিশ করেছেন। এ নিয়ে বিতর্ক করার কোনও সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।’

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে ইরানের পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতি কড়া বার্তা

বন বিভাগের মাঠপর্যায়ে পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মীদের হতাশা কাটছে না

আপডেট সময় : ০৮:২৬:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫

পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও আইন মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট ঘোষণার পরও বন বিভাগের মাঠপর্যায়ে কর্মরত পদোন্নতি বঞ্চিতদের হতাশা কাটছে না। খুলনা অঞ্চলের বন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পদোন্নতির প্রক্রিয়া চললেও জ্যেষ্ঠতা মানা হচ্ছে না। ফলে সিনিয়ররা বঞ্চিত থাকছেন। জুনিয়ররা সিনিয়রিটি পেতে যাচ্ছেন। যা হতাশার কারণ।

বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে পদোন্নতি বঞ্চিত ফরেস্টার ও বন প্রহরীদের পদোন্নতি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তীতে পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এতে বনকর্মীরা হতাশা কাটিয়ে আশার আলো দেখতে শুরু করেন। দীর্ঘদিনের বৈষম্যের শিকার মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে আসে। উপদেষ্টার এই পদক্ষেপকে পুঁজি করে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মচারী কোটি টাকার বাণিজ্য করেন। এতে বলি হতে হয় মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের। 

খুলনা অঞ্চলের দুজন বন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত সেপ্টেম্বর মাসে ৫৫৪ জন ফরেস্টার ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি পান। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন বিচার বিভাগ জ্যেষ্ঠতা সমস্যা সমাধানকল্পে রাজস্ব খাতে যোগদানের তারিখ থেকে এবং মামলার পক্ষভুক্ত নন; কিন্তু একই জ্যেষ্ঠতা তালিকার যোগ্য ফরেস্টারদের ক্ষেত্রেও সমতার নীতি অনুসরণ করে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়ে মতামত দিয়েছিল। কিন্তু সেই সমতার নীতির মতামতকে উপেক্ষা করে আশির দশকে যোগদান করা ফরেস্টারদের পদোন্নতি না দিয়ে পদোন্নতি পেলেন ২০১৪ সালে যোগদান করা ফরেস্টাররা। এতে পদোন্নতিবঞ্চিত হন ২৫-৩০ বছর ধরে চাকরিরত ফরেস্টাররা। অনেকে বিভাগের কর্মকর্তাদের টাকা দিয়ে পদোন্নতির নীতিমালা ও যোগ্যতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেদের মতো করে পদোন্নতি নেন। এতে সিনিয়ররা অনেকাংশে বঞ্চিত হন আর জুনিয়ররা হন লাভবান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খুলনা অঞ্চলের এক বন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডেপুটি রেঞ্জার পদেও পদোন্নতির ব্যত্যয় হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী পদোন্নতির পূর্বে গ্রেডেশন তালিকা প্রকাশের বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু গ্রেডেশন তালিকা না করে পদোন্নতির তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে পদোন্নতি বঞ্চিতদের জীবনে নেমে আসে হতাশা। আইন বিচার বিভাগের মতামত অনুযায়ী সমতার নীতি অনুসরণ করে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির কথা থাকলেও ডেপুটি রেঞ্জার পদোন্নতিতে করা হয়েছে অনিয়ম। পদোন্নতি তালিকা অনুযায়ী আশির দশকে যোগদান করা ডেপুটি রেঞ্জাররা ২০১৪ সালে যোগদান করা ডেপুটি রেঞ্জারদের তুলনায় জুনিয়র। তাদের মধ্যেও দানা বেঁধেছে ক্ষোভ। সিনিয়রিটি সমস্যার প্রতিকার পেতে বৈষ্যমের শিকার পদোন্নতিপ্রাপ্ত ডেপুটি রেঞ্জারদের একটা অংশ ইতিমধ্যে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল ও আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক বন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও টাকার বিনিময়ে পদোন্নতি পেয়েছেন। কোনও কর্মচারী দুর্নীতিতে অভিযুক্ত থাকলে তার পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রভাব ও তদবিরের বলে লামা বন বিভাগের তৈন রেঞ্জের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে সংরক্ষিত বনের গাছ কেটে পাচারের দায়ে অভিযুক্ত জুলফিকার আলী পদোন্নতি পেয়েছেন। জুলফিকার সিন্ডিকেটের অন্যতম সঙ্গী আমীরুল যার নিয়মিতকরণ হয় ২০১৮ সালে এবং চাকরিচ্যুতির কারণে ২০১৬ সালের গ্রেডেশন তালিকায় নাম না থাকলেও অদৃশ্য ক্ষমতাবলে ২০১৬ সালের নিয়মিত ফরেস্টারদের আগের সিরিয়ালে গ্রেডেশন তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এ ছাড়াও সিন্ডিকেটের আরেকজন মোহাম্মদ শাহিন মিয়া যিনি প্রকল্পে যোগদান করেন ১৯৯৮ সালের ১৫ এপ্রিল। চাকরি নিয়মিতকরণ হয় ২০০৫ সালে। তিনি যে প্রকল্পে যোগদান করেছিলেন তার সমাপ্তি হয় ২০০৬ সালে। তিনিও পেয়েছেন পদোন্নতি। এতে প্রশ্ন থেকে যায়, কীভাবে এসব লোকজন পদোন্নতি পেলেন।

তিনি বলেন, ‌‘আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি পদোন্নতি বঞ্চিত এবং সিনিয়রিটি বঞ্চিতদের তিনটি মামলা চলমান রেখে গ্রেডেশন তালিকা প্রকাশ ছাড়াই প্রমোশন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু  আদালতের কোনও নিষেধাজ্ঞা না থাকা সত্ত্বেও ৩৫ বছর ধরে চাকরি করা ফরেস্ট গার্ডদের কেন প্রমোশন দেওয়া হচ্ছে না। উল্টো ফরেস্টেরদের চার মাসের ব্যবধানে দুটি প্রমোশন হচ্ছে। যে কারণে বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের ফরেস্ট গার্ডদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান বন সংরক্ষক মুনির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পদোন্নতির জন্য যোগ্যদের তালিকা তৈরিতে পাঁচ সদস্যের কমিটি কাজ করেছে। আমি এই কমিটিতে নেই। ওই কমিটি আইনি প্রক্রিয়া, মন্ত্রণালয়ের মতামত, মামলার বিষয় আমলে নিয়েই তালিকা তৈরি ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনে সুপারিশ পাঠিয়েছে। পাবলিক সার্ভিস কমিশন এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। পদোন্নতির কমিটির সদস্যরা যোগ্যতাকে প্রধান্য দিয়েই তালিকা তৈরি ও সুপারিশ করেছেন। এ নিয়ে বিতর্ক করার কোনও সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।’