ঢাকা ০৬:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

‘চোখের সামনে আমার মেয়েটা পুড়ে গেলো, বাঁচাতে পারলাম না’

লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের বসতঘরে কারা আগুন দিয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। আগুন লাগানোর পেছনে কারা জড়িত, কীভাবে এবং কী উদ্দেশ্যে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে—সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা।

আগুনে ঘরে থাকা বেলালের ঘুমন্ত শিশুসন্তান আয়েশা আক্তার (৭) পুড়ে মারা গেছে। দগ্ধ হয় ঘুমন্ত আরও দুই মেয়ে সালমা আক্তার (১৭) ও সামিয়া আক্তার (১৪)। তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।

শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ২টার দিকে সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের পশ্চিম চরমনসা গ্রামের সুতারগোপ্টা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

বেলালের স্ত্রী নাজমা আক্তারের ভাষ্যমতে, আগুন আর ধোঁয়ার তীব্রতায় ঘুম ভেঙে যায় তার। রাত ২টা বাজে তখন। ঘরের ভেতর আগুন জ্বলছিল। সেই আগুনে পুড়ছিল মেয়ে আয়েশা আক্তার। আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছোট্ট আয়েশা চিৎকার করছিল, ‘আব্বু, আমাকে নাও, আমাকে নাও।’ চোখের সামনে সেই দৃশ্য দেখলেও কোনোভাবেই তার কাছে যেতে পারেননি মা।

শনিবার সকালে চরমনসা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের (৫০) বাড়ির সামনে ভিড়। পুড়ে যাওয়ার ঘরের পাশে বসে বিলাপ করছেন নাজমা। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘আগুন লাগার পর বড় মেয়ে আর মেজো মেয়েকে টিনের ফাঁক দিয়ে ঘর থেকে বের করা হয়। ছোট মেয়েটা শুধু চিৎকার করছিল—আব্বু আমাকে নাও, আমাকে নাও বলে। কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারিনি। আমার চোখের সামনে মেয়েটা পুড়ে গেলো। বাঁচাতে পারলাম না।’

বেলাল হোসেন ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সুতারগোপ্টা বাজারের সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী। এ ঘটনাকে নাশকতা বলে দাবি করেছেন তিনি। গতকাল দিবাগত রাত ২টার দিকে তার বাড়ির দরজায় তালা দিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় পুড়ে মারা যায় তার ৭ বছর বয়সী মেয়ে আয়েশা। গুরুতর দগ্ধ হয় দুই মেয়ে। তাদের দুজনকে চিকিৎসার জন্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে। বেলালকে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আগুনে বেলালের ঘরটি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বিকালে পারিবারিক কবরস্থানে আয়েশাকে দাফন করা হয়।

বেলাল হোসেন বলেন, ‘ঘরের দুই দরজায় তালা ছিল। এজন্য দুই মেয়ে, স্ত্রী নিয়ে আমি নিজে ঘরের টিনের বেড়া ফাঁকা করে বের হয়েছি। এ সময় ছোট মেয়ে চিৎকার করছিল। কিন্তু আমি আগুনের তীব্রতা আর ধোঁয়ায় কিছুই দেখতে পারছিলাম না। একপর্যায়ে আগুনের তীব্রতা বেড়ে গেলে ঘরে ঢুকতে পারিনি। সেখানে মেয়ে মারা যায়।’

পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের খাবার খেয়ে বেলালের পরিবারের সদস্যরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। রাত ২টার দিকে দরজায় তালা লাগিয়ে ঘরে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পেট্রল ঢেলে আগুন দেওয়া হয়, ফলে তা দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিবেশী আবদুল কাদের বলেন, ‘এমন নৃশংস ঘটনা এ এলাকায় কখনো ঘটেনি। আগুন লাগার সময় আমরা ছুটে আসি। কিন্তু আগুন এত তীব্র ছিল যে কেউ তার কাছে যেতে পারেনি।’

জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাছিবুর রহমান বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে দরজায়ও তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। পরিকল্পিতভাবে এ কাজটি করেছে সন্ত্রাসীরা। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।’

লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওয়াহিদ পারভেজ বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে কি না, সে বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। যদি পরিকল্পিত ঘটনা হয়, তাহলে আগুন লাগানোর পেছনে কারা জড়িত, কীভাবে এবং কী উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে—সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

লক্ষ্মীপুর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার রণজিৎ কুমার দাস বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহত অবস্থায় এক শিশুকে উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া দগ্ধ অবস্থায় তিন জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আগুন কীভাবে লেগেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। 

লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে বেলাল মেয়ের জানাজা ও দাফনে অংশ নেন। শোকার্ত এই বাবা বলেন, ‘আমার বাড়িতে কারা আগুন দিয়েছে, তা খুঁজে বের করতে হবে পুলিশকে। মেয়ের হত্যার বিচারটুকু অন্তত নিশ্চিত হোক।’

এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি এ ন্যক্কারজনক ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দোষী দুর্বৃত্তদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানান।

/এএম/

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কাতারে মোসাদের গোপন তৎপরতা: দোহা অস্বীকার করলো অবগত থাকার তথ্য

‘চোখের সামনে আমার মেয়েটা পুড়ে গেলো, বাঁচাতে পারলাম না’

আপডেট সময় : ১০:৩৫:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫

লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের বসতঘরে কারা আগুন দিয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। আগুন লাগানোর পেছনে কারা জড়িত, কীভাবে এবং কী উদ্দেশ্যে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে—সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা।

আগুনে ঘরে থাকা বেলালের ঘুমন্ত শিশুসন্তান আয়েশা আক্তার (৭) পুড়ে মারা গেছে। দগ্ধ হয় ঘুমন্ত আরও দুই মেয়ে সালমা আক্তার (১৭) ও সামিয়া আক্তার (১৪)। তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।

শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ২টার দিকে সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের পশ্চিম চরমনসা গ্রামের সুতারগোপ্টা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

বেলালের স্ত্রী নাজমা আক্তারের ভাষ্যমতে, আগুন আর ধোঁয়ার তীব্রতায় ঘুম ভেঙে যায় তার। রাত ২টা বাজে তখন। ঘরের ভেতর আগুন জ্বলছিল। সেই আগুনে পুড়ছিল মেয়ে আয়েশা আক্তার। আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছোট্ট আয়েশা চিৎকার করছিল, ‘আব্বু, আমাকে নাও, আমাকে নাও।’ চোখের সামনে সেই দৃশ্য দেখলেও কোনোভাবেই তার কাছে যেতে পারেননি মা।

শনিবার সকালে চরমনসা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের (৫০) বাড়ির সামনে ভিড়। পুড়ে যাওয়ার ঘরের পাশে বসে বিলাপ করছেন নাজমা। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘আগুন লাগার পর বড় মেয়ে আর মেজো মেয়েকে টিনের ফাঁক দিয়ে ঘর থেকে বের করা হয়। ছোট মেয়েটা শুধু চিৎকার করছিল—আব্বু আমাকে নাও, আমাকে নাও বলে। কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারিনি। আমার চোখের সামনে মেয়েটা পুড়ে গেলো। বাঁচাতে পারলাম না।’

বেলাল হোসেন ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সুতারগোপ্টা বাজারের সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী। এ ঘটনাকে নাশকতা বলে দাবি করেছেন তিনি। গতকাল দিবাগত রাত ২টার দিকে তার বাড়ির দরজায় তালা দিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় পুড়ে মারা যায় তার ৭ বছর বয়সী মেয়ে আয়েশা। গুরুতর দগ্ধ হয় দুই মেয়ে। তাদের দুজনকে চিকিৎসার জন্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে। বেলালকে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আগুনে বেলালের ঘরটি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বিকালে পারিবারিক কবরস্থানে আয়েশাকে দাফন করা হয়।

বেলাল হোসেন বলেন, ‘ঘরের দুই দরজায় তালা ছিল। এজন্য দুই মেয়ে, স্ত্রী নিয়ে আমি নিজে ঘরের টিনের বেড়া ফাঁকা করে বের হয়েছি। এ সময় ছোট মেয়ে চিৎকার করছিল। কিন্তু আমি আগুনের তীব্রতা আর ধোঁয়ায় কিছুই দেখতে পারছিলাম না। একপর্যায়ে আগুনের তীব্রতা বেড়ে গেলে ঘরে ঢুকতে পারিনি। সেখানে মেয়ে মারা যায়।’

পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের খাবার খেয়ে বেলালের পরিবারের সদস্যরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। রাত ২টার দিকে দরজায় তালা লাগিয়ে ঘরে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পেট্রল ঢেলে আগুন দেওয়া হয়, ফলে তা দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিবেশী আবদুল কাদের বলেন, ‘এমন নৃশংস ঘটনা এ এলাকায় কখনো ঘটেনি। আগুন লাগার সময় আমরা ছুটে আসি। কিন্তু আগুন এত তীব্র ছিল যে কেউ তার কাছে যেতে পারেনি।’

জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাছিবুর রহমান বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে দরজায়ও তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। পরিকল্পিতভাবে এ কাজটি করেছে সন্ত্রাসীরা। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।’

লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওয়াহিদ পারভেজ বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে কি না, সে বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। যদি পরিকল্পিত ঘটনা হয়, তাহলে আগুন লাগানোর পেছনে কারা জড়িত, কীভাবে এবং কী উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে—সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

লক্ষ্মীপুর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার রণজিৎ কুমার দাস বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহত অবস্থায় এক শিশুকে উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া দগ্ধ অবস্থায় তিন জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আগুন কীভাবে লেগেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। 

লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে বেলাল মেয়ের জানাজা ও দাফনে অংশ নেন। শোকার্ত এই বাবা বলেন, ‘আমার বাড়িতে কারা আগুন দিয়েছে, তা খুঁজে বের করতে হবে পুলিশকে। মেয়ের হত্যার বিচারটুকু অন্তত নিশ্চিত হোক।’

এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি এ ন্যক্কারজনক ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দোষী দুর্বৃত্তদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানান।

/এএম/