কওমি ধারার মাদ্রাসাগুলোতে দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক প্রহার বা অতিরিক্ত কড়াকড়ির অভিযোগ নিয়মিত সামনে এলেও, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেটিকে ছাপিয়ে চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শিশুদের ওপর ধারাবাহিক যৌন নির্যাতনের ঘটনা। একের পর এক এমন স্পর্শকাতর ও বর্বরোচিত অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় সাধারণ অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা দেওয়ার আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এসেও অনেকেই শেষ মুহূর্তে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ফল বিক্রেতা আক্কাস আলীর (ছদ্মনাম) মতো অসংখ্য অভিভাবকের অভিজ্ঞতাতেই এই ভীতি স্পষ্ট। একমাত্র চার বছর বয়সী সন্তানকে হিফজ পড়িয়ে হাফেজ বানানোর স্বপ্ন দেখলেও সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে আসা একের পর এক যৌন নিপীড়নের খবরে তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত বাতিল করেছেন।
স্থানীয় গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিগত তিন মাসেই দেশের বিভিন্ন এলাকার কওমি মাদ্রাসাগুলোতে অন্তত দেড় ডজন যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী হিসেবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তুলনামূলকভাবে অরক্ষিত ছেলে শিশুরা। সম্প্রতি গাজীপুর, পাবনা ও লক্ষ্মীপুরের তিনটি মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের যে ঘটনাগুলো নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে, তার দুটিতেই ভুক্তভোগী ছেলে শিশু বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ প্রশাসন।
মানবাধিকার সংস্থা ‘মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন’ (এমএসএফ)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল চলতি বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই দুই মাসেই দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় কমপক্ষে ১৩টি ছেলে শিশু চরম যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
শিশু অধিকার কর্মী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, কওমি মাদ্রাসাগুলোর বেশিরভাগই আবাসিক হওয়ায় এবং সেখানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শিশুদের যোগাযোগের সুযোগ সীমিত থাকায় এই ধরনের নিপীড়ন ধামাচাপা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। কঠোর অনুশাসন, তথাকথিত ধর্মীয় মর্যাদার আড়ালে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির অভাবই এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে। মাদ্রাসায় নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং শিশুদের মানসিক ও শারীরিক সুরক্ষায় নিরপেক্ষ তদারকি ব্যবস্থা ও জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো বিকল্প নেই।

























