মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৮:০৪ অপরাহ্ন | ৩রা নভেম্বর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার, ১৮ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

মজুরির ন্যায্য দাবি বনাম রাজনৈতিক নাশকতা: পোশাকশিল্পে অচলাবস্থার নেপথ্যে কী?

  • হালনাগাদ সময় : ১১:২৪:৪৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

দেশের প্রধান রফতানি আয়ের উৎস তৈরি পোশাকশিল্প বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে পড়েছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক বিক্ষোভ, কর্মবিরতি, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনের জেরে একযোগে বন্ধ হয়ে গেছে ৫২৯টি কারখানা। কাজে যোগ দেননি প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক। কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, কোথাও অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর-সব মিলিয়ে শিল্পাঞ্চলজুড়ে তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা।

শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মপরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষের মধ্যেই আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধন ও বহিরাগতদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে সরকার। অন্যদিকে, মালিকপক্ষ উৎপাদন সচল রাখা এবং বিদেশি ক্রয়াদেশ ধরে রাখা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নতুন মজুরি বোর্ড গঠন ও কারখানা চালু রাখার সরকারি উদ্যোগের মধ্যেও কাটছে না সংকট। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির সমাধান, মালিকপক্ষের স্বার্থ এবং আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ-সব মিলিয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের এই অস্থিরতার নেপথ্যে কী কী কারণ রয়েছে? সংকট উত্তরণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্যোগই বা কতটা কার্যকর?

মাসিক মজুরি কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে কয়েক দিন ধরেই রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন করেছে শ্রমিকরা। গতকালও দিনভর বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, কর্মবিরতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনের একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও কারখানা ভাঙচুরের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

শ্রমিক অসন্তোষের কারণে একযোগে বন্ধ হয়ে যায় ৫২৯টি কারখানা। এসব কারখানার প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক কাজে যোগ দেননি।

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবির মধ্যেই আন্দোলনে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ, রাজনৈতিক উস্কানি এবং সীমান্তের ওপার থেকে অস্থিরতা সৃষ্টির ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, পোশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যাহত করে দেশকে অস্থিতিশীল করার একটি পরিকল্পনা চলছে।

অন্যদিকে মালিকপক্ষ বলছে, বিশৃঙ্খলা বন্ধ না হলে কারখানা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন ও গেজেট প্রকাশ করলেও শ্রমিক অসন্তোষ কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

গতকাল রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের জরুরি বৈঠকে পোশাক খাতের অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

gazipurশ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে পোশাক খাতকে অস্থির করার চেষ্টা চলছে। শ্রমিকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, এমন একটি গোষ্ঠী বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তে লিপ্ত। সরকার রাজনৈতিকভাবে তা মোকাবিলা করবে। বৈঠকে শিল্প কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম, জনগণের নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীল পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নিরীহ গার্মেন্টস শ্রমিকদের ব্যবহার করে সীমান্তের ওপার থেকে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি শ্রমিক ও মালিকদের আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা যেত। এ নিয়ে সহিংস আন্দোলন করার কোনো কারণ ছিল না। আন্দোলনে মুখোশধারী ব্যক্তিরা ঢুকে পড়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সহিংসতায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেকোনো অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকবে।

উত্তাল শিল্পাঞ্চল

দাবি আদায়ে গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে রাস্তায় নামেন শ্রমিকরা। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর অবরোধের মধ্য দিয়ে আন্দোলন শুরু হয়। পরে মিরপুর-১১, ১২ ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। শ্রমিকরা বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ, মজুরি বৃদ্ধি, যথেচ্ছ ছাঁটাই বন্ধ এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার দাবিতে স্লোগান দেন।

আন্দোলনের এক পর্যায়ে মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ শুরু হয়। কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের একপর্যায়ে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। এ সময় পুলিশ বক্স ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গেলে তাদেরও ধাওয়া দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। সংঘর্ষের কারণে মিরপুর-১০, ১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীরা ভোগান্তিতে পড়েন।

গতকাল মিরপুরে বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা।
গতকাল মিরপুরে বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা।

একই দাবিতে সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরাও কর্মবিরতি দিয়ে সড়কে অবস্থান নেন। নিশ্চিন্তপুরের আল-মুসলিম, টাউজার লাইন ও নিউ এইজসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভে অংশ নেন। নরসিংহপুরে অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিকেলে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়।

অন্যদিকে গাজীপুরের পল্লীবিদ্যুৎ, হরিণহাটি, মৌচাক ও কোনাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে কাঠ ও বাঁশ ফেলে আগুন দেওয়া হয়। যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের পাশাপাশি পুলিশ বক্স ও একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। কালিয়াকৈরে একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গুদাম ও একটি পিকআপভ্যানে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া যায়।

বন্ধ ৫২৯ কারখানা, কাজে অনুপস্থিত প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক

শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে গাজীপুর, ময়মনসিংহ, সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে। রোববার বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের পাঁচটি প্রধান শিল্পাঞ্চলের ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ৫২৯টি থেকে শ্রমিকরা বের হয়ে যান। এসব কারখানার প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দেননি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে ২৭৬টি বন্ধ হয়ে যায়। এসব কারখানার ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৩৬০ জন শ্রমিক কাজে যোগ দেননি। সাভার-আশুলিয়া ও জিরানী এলাকার ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ১৮৫টি বন্ধ ছিল। এ অঞ্চলে কাজে অনুপস্থিত ছিলেন ২ লাখ ৯০ হাজার ২০৫ জন শ্রমিক।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এলাকার ৩২০টি কারখানার মধ্যে মিরপুরের ৬৮টি বন্ধ হয়ে যায়। এসব কারখানার ৫১ হাজার ৬২৫ জন শ্রমিক কাজে যোগ দেননি। নারায়ণগঞ্জের ১৯৭টি এবং চট্টগ্রামের ৩৪০টি কারখানায় শ্রমিকদের কর্মস্থল ছেড়ে যাওয়ার কোনো ঘটনা ওই পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়নি।

অন্যদিকে বিজিএমইএর দেওয়া পৃথক হিসাবেও শিল্পাঞ্চলজুড়ে বড় ধরনের অচলাবস্থার চিত্র উঠে এসেছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি শিল্পাঞ্চলের ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ৩১৮টি বন্ধ ছিল এবং এসব কারখানা থেকে ৭ লাখ ২ হাজার ২৫৫ জন শ্রমিক বেরিয়ে এসেছিলেন। বিকেল পর্যন্ত পাওয়া দুই হিসাবের সময় ও গণনার ভিত্তি এক নয়। তবে উভয় পরিসংখ্যানেই পোশাকশিল্পের উৎপাদন কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্নের বিষয়টি স্পষ্ট।

আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ

শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে। পুলিশের দাবি, শ্রমিক আন্দোলনকে পুঁজি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ডিবির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান রোববার ১১ জনকে গ্রেফতারের তথ্য জানান। তার দাবি, গ্রেফতার ব্যক্তিরা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী।

পুলিশের দাবি, ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীদের ঢাকায় এনে আন্দোলনে যুক্ত করেছেন। এ ছাড়া মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার আবু নাসের রিকাবদার আরও ১৭ জনকে আটকের কথা জানান। তাদের বিরুদ্ধে নাশকতার পর আওয়ামী লীগের হয়ে মিছিল করার প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজবুল ইসলামের শ্রমিক আন্দোলনে অংশ নেওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলনের ছবি পোস্ট দিয়ে তিনি অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনও আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন।

যে দাবিতে আন্দোলনে শ্রমিকরা

শ্রমিকদের মূল দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালের নভেম্বরে নির্ধারিত এ মজুরি ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। এরপর খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমান বেতনে শহরে পরিবার নিয়ে বসবাস ও ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পুরুষ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে নিয়োগে বৈষম্যের অভিযোগও তুলেছেন কেউ কেউ।

শ্রমিকদের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে বকেয়া বেতন পরিশোধ, যথেচ্ছ ছাঁটাই ও কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ, নিয়োগপত্র প্রদান, দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মদিবস কার্যকর, অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য না করা, সাপ্তাহিক ছুটি নিশ্চিত এবং অবাধে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার। এসব দাবিতে চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন (টাফ)।

সংগঠনটির সভাপতি ফয়জুল হাকিম ও সাধারণ সম্পাদক আমির আব্বাস এক বিবৃতিতে বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় বাড়ায় শ্রমজীবী মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। অথচ সরকার ও মালিকপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নিতে সময়ক্ষেপণ করেছে।

বিবৃতিতে শ্রমিকদের ওপর পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ, লাঠিপেটা ও গ্রেফতারের নিন্দা জানিয়ে গ্রেফতার ব্যক্তিদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিয়োগপত্র, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

মজুরি বোর্ড গঠন, মালিকপক্ষের অবস্থান

শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যেই গতকাল সকালে গার্মেন্টসশ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। পরে এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিন ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুবকে রাখা হয়েছে। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন। নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ।

শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। শ্রমিকদের রাজপথের আন্দোলন ছেড়ে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে ফিরে কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

mirpur_Fire_dm
গতকাল মিরপুরে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয় পোশাক শ্রমিকরা।

এদিকে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকেরা যে চাপের মধ্যে রয়েছেন, তা মালিকপক্ষও উপলব্ধি করে। তবে বৈশ্বিক মন্দা, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রফতানি আদেশ কমে যাওয়ার মতো চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের সক্ষমতা ও উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘শ্রমিক বাঁচলেই শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলেই শ্রমিক বাঁচবে।’

অন্যদিকে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘বিশৃঙ্খলা ও কারখানা ভাঙচুর বন্ধ না হলে মালিকেরা আর কারখানা চালু রাখতে চান না। কারখানা পরিচালনার উপযুক্ত পরিবেশ না থাকলে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘মজুরি বোর্ড গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে এবং এ বার্তা শ্রমিকদের আগেই দেওয়া হয়েছিল। তারপরও বিভিন্ন স্থানে বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুর হয়েছে। উদ্যোক্তারা চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। অধিকাংশ শ্রমিক ও মালিকই কারখানা চালু রাখতে চান। তবে গুটিকয়েক শ্রমিক নামধারী ব্যক্তি বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছেন।’ পরিস্থিতি নিয়ে শিগগিরই সরকারের সঙ্গে বসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান বিজিএমইএ সভাপতি।

শিল্প বাঁচাতে দ্রুত সমাধানের তাগিদ

পোশাকশিল্পের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যর্থতা, জ্বালানির উচ্চমূল্য, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তা এবং ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় পোশাক খাত কঠিন সময় পার করছে। অন্যদিকে শ্রমিকরা ঘরভাড়া, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে রয়েছেন। শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে দ্রুত টেকসই পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিল্প বাঁচলে শুধু মালিক বাঁচবে না, দেশও বাঁচবে।

আন্দোলন নিয়ে নেতাদের ভিন্নমত, কাজে ফেরার আহ্বান মালিকপক্ষের 

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার মনে করেন, সরকার তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন শ্রমিকদেরও নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝে কাজে ফিরে যাওয়া উচিত। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায়ে আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বর্তমান আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদেরই ক্ষতির মুখে ফেলবে। তাই এ ধরনের কর্মকাণ্ড শ্রমিকদের নিজেদেরই প্রতিহত করতে হবে।

বর্তমান আন্দোলনকে অযৌক্তিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের আন্দোলন তিনি সমর্থন করেন না।

শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়ে নাজমা আক্তার বলেন, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের যে প্রতিনিধি রয়েছেন, তিনিও মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা করবেন।

একই ধরনের অবস্থান জানিয়েছেন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের (এনজিডব্লিউএফ) সভাপতি আমিরুল হক আমিন। তার মতে, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য সরকারকে চাপ দেওয়ার পাশাপাশি উৎসাহ ও সহযোগিতা করে আসছে। গত ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে মজুরি বোর্ড গঠন নিয়ে আলোচনা চলছিল। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ কারখানা বন্ধ করে শ্রমিকদের রাস্তায় নামার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না।

আমিরুল হক আমিন বলেন, ‘এ আন্দোলনের পেছনে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের ইন্ধন থাকলে তা সমর্থন বা সহযোগিতা করা হবে না। কারখানায় স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শ্রমিকদের দ্রুত কাজে ফেরার আহ্বান জানান তিনি।

আমিরুল হকের ভাষ্য, শ্রমিকদের স্বার্থেই সংগঠনগুলো মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে কাজ করছে। তাই অযথা রাস্তায় আন্দোলন করে পরিস্থিতি ঘোলাটে না করে কাজে ফিরে যাওয়া উচিত।

গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের (জিডব্লিউটিইউসি) সহসভাপতি জলি তালুকদারের মতে, মজুরি পুনর্বিবেচনার বিষয়ে অভ্যুত্থানের পরপরই উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে মজুরি বোর্ড গঠনে অযাচিত দেরি করা হয়েছে।

জলি তালুকদার বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলেও পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনে দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে। শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হওয়ার আগেই কেন মজুরি বোর্ড গঠন করা হলো না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তার প্রশ্ন, দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি পোশাক খাতের শ্রমিকদের দাবি কেন সবার শেষে গুরুত্ব পাচ্ছে?

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

কওমি মাদ্রাসায় বাড়ছে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন: অভিভাবকদের মধ্যে চরম শঙ্কা ও আস্থার সংকট

03 November 2026

জ্যোতির উত্তরসূরি নাহিদার সামনে প্রথম পরীক্ষা

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

মজুরির ন্যায্য দাবি বনাম রাজনৈতিক নাশকতা: পোশাকশিল্পে অচলাবস্থার নেপথ্যে কী?

হালনাগাদ সময় : ১১:২৪:৪৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

দেশের প্রধান রফতানি আয়ের উৎস তৈরি পোশাকশিল্প বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে পড়েছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক বিক্ষোভ, কর্মবিরতি, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনের জেরে একযোগে বন্ধ হয়ে গেছে ৫২৯টি কারখানা। কাজে যোগ দেননি প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক। কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, কোথাও অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর-সব মিলিয়ে শিল্পাঞ্চলজুড়ে তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা।

শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মপরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষের মধ্যেই আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধন ও বহিরাগতদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে সরকার। অন্যদিকে, মালিকপক্ষ উৎপাদন সচল রাখা এবং বিদেশি ক্রয়াদেশ ধরে রাখা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নতুন মজুরি বোর্ড গঠন ও কারখানা চালু রাখার সরকারি উদ্যোগের মধ্যেও কাটছে না সংকট। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির সমাধান, মালিকপক্ষের স্বার্থ এবং আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ-সব মিলিয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের এই অস্থিরতার নেপথ্যে কী কী কারণ রয়েছে? সংকট উত্তরণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্যোগই বা কতটা কার্যকর?

মাসিক মজুরি কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে কয়েক দিন ধরেই রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন করেছে শ্রমিকরা। গতকালও দিনভর বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, কর্মবিরতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনের একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও কারখানা ভাঙচুরের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

শ্রমিক অসন্তোষের কারণে একযোগে বন্ধ হয়ে যায় ৫২৯টি কারখানা। এসব কারখানার প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক কাজে যোগ দেননি।

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবির মধ্যেই আন্দোলনে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ, রাজনৈতিক উস্কানি এবং সীমান্তের ওপার থেকে অস্থিরতা সৃষ্টির ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, পোশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যাহত করে দেশকে অস্থিতিশীল করার একটি পরিকল্পনা চলছে।

অন্যদিকে মালিকপক্ষ বলছে, বিশৃঙ্খলা বন্ধ না হলে কারখানা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন ও গেজেট প্রকাশ করলেও শ্রমিক অসন্তোষ কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

গতকাল রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের জরুরি বৈঠকে পোশাক খাতের অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

gazipurশ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে পোশাক খাতকে অস্থির করার চেষ্টা চলছে। শ্রমিকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, এমন একটি গোষ্ঠী বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তে লিপ্ত। সরকার রাজনৈতিকভাবে তা মোকাবিলা করবে। বৈঠকে শিল্প কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম, জনগণের নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীল পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নিরীহ গার্মেন্টস শ্রমিকদের ব্যবহার করে সীমান্তের ওপার থেকে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি শ্রমিক ও মালিকদের আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা যেত। এ নিয়ে সহিংস আন্দোলন করার কোনো কারণ ছিল না। আন্দোলনে মুখোশধারী ব্যক্তিরা ঢুকে পড়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সহিংসতায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেকোনো অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকবে।

উত্তাল শিল্পাঞ্চল

দাবি আদায়ে গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে রাস্তায় নামেন শ্রমিকরা। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর অবরোধের মধ্য দিয়ে আন্দোলন শুরু হয়। পরে মিরপুর-১১, ১২ ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। শ্রমিকরা বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ, মজুরি বৃদ্ধি, যথেচ্ছ ছাঁটাই বন্ধ এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার দাবিতে স্লোগান দেন।

আন্দোলনের এক পর্যায়ে মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ শুরু হয়। কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের একপর্যায়ে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। এ সময় পুলিশ বক্স ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গেলে তাদেরও ধাওয়া দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। সংঘর্ষের কারণে মিরপুর-১০, ১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীরা ভোগান্তিতে পড়েন।

গতকাল মিরপুরে বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা।
গতকাল মিরপুরে বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা।

একই দাবিতে সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরাও কর্মবিরতি দিয়ে সড়কে অবস্থান নেন। নিশ্চিন্তপুরের আল-মুসলিম, টাউজার লাইন ও নিউ এইজসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভে অংশ নেন। নরসিংহপুরে অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিকেলে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়।

অন্যদিকে গাজীপুরের পল্লীবিদ্যুৎ, হরিণহাটি, মৌচাক ও কোনাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে কাঠ ও বাঁশ ফেলে আগুন দেওয়া হয়। যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের পাশাপাশি পুলিশ বক্স ও একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। কালিয়াকৈরে একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গুদাম ও একটি পিকআপভ্যানে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া যায়।

বন্ধ ৫২৯ কারখানা, কাজে অনুপস্থিত প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক

শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে গাজীপুর, ময়মনসিংহ, সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে। রোববার বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের পাঁচটি প্রধান শিল্পাঞ্চলের ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ৫২৯টি থেকে শ্রমিকরা বের হয়ে যান। এসব কারখানার প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দেননি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে ২৭৬টি বন্ধ হয়ে যায়। এসব কারখানার ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৩৬০ জন শ্রমিক কাজে যোগ দেননি। সাভার-আশুলিয়া ও জিরানী এলাকার ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ১৮৫টি বন্ধ ছিল। এ অঞ্চলে কাজে অনুপস্থিত ছিলেন ২ লাখ ৯০ হাজার ২০৫ জন শ্রমিক।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এলাকার ৩২০টি কারখানার মধ্যে মিরপুরের ৬৮টি বন্ধ হয়ে যায়। এসব কারখানার ৫১ হাজার ৬২৫ জন শ্রমিক কাজে যোগ দেননি। নারায়ণগঞ্জের ১৯৭টি এবং চট্টগ্রামের ৩৪০টি কারখানায় শ্রমিকদের কর্মস্থল ছেড়ে যাওয়ার কোনো ঘটনা ওই পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়নি।

অন্যদিকে বিজিএমইএর দেওয়া পৃথক হিসাবেও শিল্পাঞ্চলজুড়ে বড় ধরনের অচলাবস্থার চিত্র উঠে এসেছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি শিল্পাঞ্চলের ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ৩১৮টি বন্ধ ছিল এবং এসব কারখানা থেকে ৭ লাখ ২ হাজার ২৫৫ জন শ্রমিক বেরিয়ে এসেছিলেন। বিকেল পর্যন্ত পাওয়া দুই হিসাবের সময় ও গণনার ভিত্তি এক নয়। তবে উভয় পরিসংখ্যানেই পোশাকশিল্পের উৎপাদন কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্নের বিষয়টি স্পষ্ট।

আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ

শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে। পুলিশের দাবি, শ্রমিক আন্দোলনকে পুঁজি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ডিবির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান রোববার ১১ জনকে গ্রেফতারের তথ্য জানান। তার দাবি, গ্রেফতার ব্যক্তিরা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী।

পুলিশের দাবি, ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীদের ঢাকায় এনে আন্দোলনে যুক্ত করেছেন। এ ছাড়া মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার আবু নাসের রিকাবদার আরও ১৭ জনকে আটকের কথা জানান। তাদের বিরুদ্ধে নাশকতার পর আওয়ামী লীগের হয়ে মিছিল করার প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজবুল ইসলামের শ্রমিক আন্দোলনে অংশ নেওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলনের ছবি পোস্ট দিয়ে তিনি অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনও আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন।

যে দাবিতে আন্দোলনে শ্রমিকরা

শ্রমিকদের মূল দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালের নভেম্বরে নির্ধারিত এ মজুরি ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। এরপর খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমান বেতনে শহরে পরিবার নিয়ে বসবাস ও ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পুরুষ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে নিয়োগে বৈষম্যের অভিযোগও তুলেছেন কেউ কেউ।

শ্রমিকদের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে বকেয়া বেতন পরিশোধ, যথেচ্ছ ছাঁটাই ও কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ, নিয়োগপত্র প্রদান, দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মদিবস কার্যকর, অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য না করা, সাপ্তাহিক ছুটি নিশ্চিত এবং অবাধে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার। এসব দাবিতে চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন (টাফ)।

সংগঠনটির সভাপতি ফয়জুল হাকিম ও সাধারণ সম্পাদক আমির আব্বাস এক বিবৃতিতে বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় বাড়ায় শ্রমজীবী মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। অথচ সরকার ও মালিকপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নিতে সময়ক্ষেপণ করেছে।

বিবৃতিতে শ্রমিকদের ওপর পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ, লাঠিপেটা ও গ্রেফতারের নিন্দা জানিয়ে গ্রেফতার ব্যক্তিদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিয়োগপত্র, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

মজুরি বোর্ড গঠন, মালিকপক্ষের অবস্থান

শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যেই গতকাল সকালে গার্মেন্টসশ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। পরে এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিন ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুবকে রাখা হয়েছে। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন। নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ।

শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। শ্রমিকদের রাজপথের আন্দোলন ছেড়ে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে ফিরে কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

mirpur_Fire_dm
গতকাল মিরপুরে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয় পোশাক শ্রমিকরা।

এদিকে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকেরা যে চাপের মধ্যে রয়েছেন, তা মালিকপক্ষও উপলব্ধি করে। তবে বৈশ্বিক মন্দা, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রফতানি আদেশ কমে যাওয়ার মতো চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের সক্ষমতা ও উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘শ্রমিক বাঁচলেই শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলেই শ্রমিক বাঁচবে।’

অন্যদিকে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘বিশৃঙ্খলা ও কারখানা ভাঙচুর বন্ধ না হলে মালিকেরা আর কারখানা চালু রাখতে চান না। কারখানা পরিচালনার উপযুক্ত পরিবেশ না থাকলে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘মজুরি বোর্ড গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে এবং এ বার্তা শ্রমিকদের আগেই দেওয়া হয়েছিল। তারপরও বিভিন্ন স্থানে বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুর হয়েছে। উদ্যোক্তারা চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। অধিকাংশ শ্রমিক ও মালিকই কারখানা চালু রাখতে চান। তবে গুটিকয়েক শ্রমিক নামধারী ব্যক্তি বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছেন।’ পরিস্থিতি নিয়ে শিগগিরই সরকারের সঙ্গে বসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান বিজিএমইএ সভাপতি।

শিল্প বাঁচাতে দ্রুত সমাধানের তাগিদ

পোশাকশিল্পের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যর্থতা, জ্বালানির উচ্চমূল্য, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তা এবং ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় পোশাক খাত কঠিন সময় পার করছে। অন্যদিকে শ্রমিকরা ঘরভাড়া, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে রয়েছেন। শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে দ্রুত টেকসই পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিল্প বাঁচলে শুধু মালিক বাঁচবে না, দেশও বাঁচবে।

আন্দোলন নিয়ে নেতাদের ভিন্নমত, কাজে ফেরার আহ্বান মালিকপক্ষের 

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার মনে করেন, সরকার তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন শ্রমিকদেরও নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝে কাজে ফিরে যাওয়া উচিত। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায়ে আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বর্তমান আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদেরই ক্ষতির মুখে ফেলবে। তাই এ ধরনের কর্মকাণ্ড শ্রমিকদের নিজেদেরই প্রতিহত করতে হবে।

বর্তমান আন্দোলনকে অযৌক্তিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের আন্দোলন তিনি সমর্থন করেন না।

শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়ে নাজমা আক্তার বলেন, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের যে প্রতিনিধি রয়েছেন, তিনিও মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা করবেন।

একই ধরনের অবস্থান জানিয়েছেন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের (এনজিডব্লিউএফ) সভাপতি আমিরুল হক আমিন। তার মতে, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য সরকারকে চাপ দেওয়ার পাশাপাশি উৎসাহ ও সহযোগিতা করে আসছে। গত ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে মজুরি বোর্ড গঠন নিয়ে আলোচনা চলছিল। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ কারখানা বন্ধ করে শ্রমিকদের রাস্তায় নামার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না।

আমিরুল হক আমিন বলেন, ‘এ আন্দোলনের পেছনে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের ইন্ধন থাকলে তা সমর্থন বা সহযোগিতা করা হবে না। কারখানায় স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শ্রমিকদের দ্রুত কাজে ফেরার আহ্বান জানান তিনি।

আমিরুল হকের ভাষ্য, শ্রমিকদের স্বার্থেই সংগঠনগুলো মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে কাজ করছে। তাই অযথা রাস্তায় আন্দোলন করে পরিস্থিতি ঘোলাটে না করে কাজে ফিরে যাওয়া উচিত।

গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের (জিডব্লিউটিইউসি) সহসভাপতি জলি তালুকদারের মতে, মজুরি পুনর্বিবেচনার বিষয়ে অভ্যুত্থানের পরপরই উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে মজুরি বোর্ড গঠনে অযাচিত দেরি করা হয়েছে।

জলি তালুকদার বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলেও পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনে দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে। শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হওয়ার আগেই কেন মজুরি বোর্ড গঠন করা হলো না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তার প্রশ্ন, দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি পোশাক খাতের শ্রমিকদের দাবি কেন সবার শেষে গুরুত্ব পাচ্ছে?

Share this news as a Photo Card