মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৮:০১ অপরাহ্ন | ৩রা নভেম্বর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার, ১৮ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

বন সংরক্ষণের সিদ্ধান্তে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ: লোকদেখানো সভার বাইরে অধিকার নিশ্চিতের তাগিদ

  • হালনাগাদ সময় : ১২:২০:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

বন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কেবল সরকারি মানচিত্রে সীমানা টানা কিংবা আমলাতান্ত্রিক প্রকল্পের চেয়ে বনের সঙ্গে যুগ যুগ ধরে বসবাসকারী আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার এবং জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিয়ে সরকারি বা আন্তর্জাতিক মহলে যখন আলোচনা হয়, তখন গাছের সংখ্যা, সীমানা কিংবা প্রকল্পের কোটি টাকার হিসাব যতটা প্রাধান্য পায়, সেখানে বনজীবী মানুষের খাবার, সুপেয় পানির উৎস কিংবা ভূমি ব্যবহারের মতো মৌলিক অধিকারগুলো ততটাই আড়ালে থেকে যায়। সম্প্রতি জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সনদের ১৭তম সম্মেলনকে (কপ-১৭) ঘিরে বাংলাদেশের অবস্থানপত্রে আদিবাসীদের সুপারিশ অন্তর্ভুক্তি নিয়ে তৈরি হওয়া মতবিরোধের ঘটনায় বিষয়টি আবারও জোরালোভাবে সামনে এসেছে।

বাইরে থেকে বন দেখতে যাওয়া একজন পর্যটকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বনে টিকে থাকা মানুষের জীবনের আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। পর্যটক বনের নিস্তব্ধতা ও সৌন্দর্য উপভোগ করে চলে গেলেও বনজীবীদের সেখান থেকেই প্রতিদিনের খাবারের সংস্থান করতে হয়। ফলে সংরক্ষণের নামে হঠাৎ কোনো একতরফা বিধিনিষেধ চাপিয়ে দিলে তাদের চলাচলের পথ যেমন বন্ধ হয়, তেমনি বদলে যায় সংসারের চরম অর্থনৈতিক বাস্তবতা। অথচ প্রকল্পের সাফল্যের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই বর্ধিত মানবিক শ্রম ও ক্ষয়ক্ষতির কোনো হিসাব লিপিবদ্ধ থাকে না।

বন সংরক্ষণ নীতিমালায় স্থানীয়দের ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে কাজে লাগানো এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় আনা প্রয়োজন। আদিবাসীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জানেন কোন মৌসুমে ফল সংগ্রহের পর গাছের পুনর্জন্মের জন্য কতটুকু রেখে দিতে হবে কিংবা বনের গভীরে কোথায় রয়েছে সুপেয় পানির ধারা। তবে স্থানীয় সব চর্চাই পরিবেশের জন্য উপকারী—এমন অন্ধ ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। অতিরিক্ত বনজ সম্পদ আহরণে যদি বনের বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকায় আহরণ সীমিত করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো বনজ সম্পদ সংগ্রহ নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করার আগে সেই আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর বিকল্প খাদ্য ও নগদ আয়ের সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা দিতে হবে; কারণ ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণের আশ্বাসে বর্তমানের ক্ষুধার সমাধান হয় না।

একই সঙ্গে বন ধ্বংসের দায় নির্ধারণে গভীর বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে। সংসারের দৈনন্দিন প্রয়োজনে বনের ওপর নির্ভর করা প্রান্তিক পরিবার এবং বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে বনাঞ্চল উজাড় করা প্রভাবশালী চক্র—এ দুইয়ের ভূমিকা কখনো এক হতে পারে না। প্রায়ই দেখা যায়, বনের বড় দখলদার ও বাণিজ্যিক শক্তিগুলো অক্ষত থেকে যায়, অথচ সব প্রশাসনিক কড়াকড়ি গিয়ে পড়ে দুর্বল ও নিরীহ আদিবাসীদের ওপর।

প্রকল্পের নামে কেবল সভার উপস্থিতিপত্রে স্বাক্ষর বা ছবি তুলে সেটিকে ‘স্থানীয়দের সম্মতি’ হিসেবে দেখানোর সংস্কৃতি বন্ধের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। আদিবাসীদের নিজেদের পরিচিত ভাষায় প্রকল্পের সুবিধা ও হারানোর ঝুঁকি বোঝানো, নারী ও তরুণদের মতামতের গুরুত্ব দেওয়া এবং পরিকল্পনা প্রণয়ন ও অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। বন রক্ষার মূল্যায়নে শুধু কত একর জমিতে গাছ লাগানো হলো তা না দেখে, মানুষের জীবন ও জীবিকায় কী পরিবর্তন এলো—তাকেই মূল মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

কওমি মাদ্রাসায় বাড়ছে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন: অভিভাবকদের মধ্যে চরম শঙ্কা ও আস্থার সংকট

03 November 2026

জ্যোতির উত্তরসূরি নাহিদার সামনে প্রথম পরীক্ষা

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

বন সংরক্ষণের সিদ্ধান্তে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ: লোকদেখানো সভার বাইরে অধিকার নিশ্চিতের তাগিদ

হালনাগাদ সময় : ১২:২০:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

বন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কেবল সরকারি মানচিত্রে সীমানা টানা কিংবা আমলাতান্ত্রিক প্রকল্পের চেয়ে বনের সঙ্গে যুগ যুগ ধরে বসবাসকারী আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার এবং জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিয়ে সরকারি বা আন্তর্জাতিক মহলে যখন আলোচনা হয়, তখন গাছের সংখ্যা, সীমানা কিংবা প্রকল্পের কোটি টাকার হিসাব যতটা প্রাধান্য পায়, সেখানে বনজীবী মানুষের খাবার, সুপেয় পানির উৎস কিংবা ভূমি ব্যবহারের মতো মৌলিক অধিকারগুলো ততটাই আড়ালে থেকে যায়। সম্প্রতি জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সনদের ১৭তম সম্মেলনকে (কপ-১৭) ঘিরে বাংলাদেশের অবস্থানপত্রে আদিবাসীদের সুপারিশ অন্তর্ভুক্তি নিয়ে তৈরি হওয়া মতবিরোধের ঘটনায় বিষয়টি আবারও জোরালোভাবে সামনে এসেছে।

বাইরে থেকে বন দেখতে যাওয়া একজন পর্যটকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বনে টিকে থাকা মানুষের জীবনের আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। পর্যটক বনের নিস্তব্ধতা ও সৌন্দর্য উপভোগ করে চলে গেলেও বনজীবীদের সেখান থেকেই প্রতিদিনের খাবারের সংস্থান করতে হয়। ফলে সংরক্ষণের নামে হঠাৎ কোনো একতরফা বিধিনিষেধ চাপিয়ে দিলে তাদের চলাচলের পথ যেমন বন্ধ হয়, তেমনি বদলে যায় সংসারের চরম অর্থনৈতিক বাস্তবতা। অথচ প্রকল্পের সাফল্যের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই বর্ধিত মানবিক শ্রম ও ক্ষয়ক্ষতির কোনো হিসাব লিপিবদ্ধ থাকে না।

বন সংরক্ষণ নীতিমালায় স্থানীয়দের ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে কাজে লাগানো এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় আনা প্রয়োজন। আদিবাসীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জানেন কোন মৌসুমে ফল সংগ্রহের পর গাছের পুনর্জন্মের জন্য কতটুকু রেখে দিতে হবে কিংবা বনের গভীরে কোথায় রয়েছে সুপেয় পানির ধারা। তবে স্থানীয় সব চর্চাই পরিবেশের জন্য উপকারী—এমন অন্ধ ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। অতিরিক্ত বনজ সম্পদ আহরণে যদি বনের বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকায় আহরণ সীমিত করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো বনজ সম্পদ সংগ্রহ নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করার আগে সেই আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর বিকল্প খাদ্য ও নগদ আয়ের সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা দিতে হবে; কারণ ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণের আশ্বাসে বর্তমানের ক্ষুধার সমাধান হয় না।

একই সঙ্গে বন ধ্বংসের দায় নির্ধারণে গভীর বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে। সংসারের দৈনন্দিন প্রয়োজনে বনের ওপর নির্ভর করা প্রান্তিক পরিবার এবং বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে বনাঞ্চল উজাড় করা প্রভাবশালী চক্র—এ দুইয়ের ভূমিকা কখনো এক হতে পারে না। প্রায়ই দেখা যায়, বনের বড় দখলদার ও বাণিজ্যিক শক্তিগুলো অক্ষত থেকে যায়, অথচ সব প্রশাসনিক কড়াকড়ি গিয়ে পড়ে দুর্বল ও নিরীহ আদিবাসীদের ওপর।

প্রকল্পের নামে কেবল সভার উপস্থিতিপত্রে স্বাক্ষর বা ছবি তুলে সেটিকে ‘স্থানীয়দের সম্মতি’ হিসেবে দেখানোর সংস্কৃতি বন্ধের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। আদিবাসীদের নিজেদের পরিচিত ভাষায় প্রকল্পের সুবিধা ও হারানোর ঝুঁকি বোঝানো, নারী ও তরুণদের মতামতের গুরুত্ব দেওয়া এবং পরিকল্পনা প্রণয়ন ও অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। বন রক্ষার মূল্যায়নে শুধু কত একর জমিতে গাছ লাগানো হলো তা না দেখে, মানুষের জীবন ও জীবিকায় কী পরিবর্তন এলো—তাকেই মূল মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

Share this news as a Photo Card