টানা তিন মাসের দীর্ঘ মৌসুমভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা শেষে পুনরায় পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষায় আরোপিত এই বিরতি কাটিয়ে ১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশি-বিদেশি ভ্রমণপিপাসুদের পদচারণায় আবারও মুখরিত হয়ে উঠছে বনের পর্যটন কেন্দ্রগুলো। ম্যানগ্রোভের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে সুন্দরবনযাত্রাকে সুশৃঙ্খল, আনন্দদায়ক ও নিরাপদ রাখতে পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১০টি তথ্য ও পরামর্শ নিচে তুলে ধরা হলো:
- যাতায়াতের প্রধান রুট ও মাধ্যম: সুন্দরবনে প্রবেশের প্রধান তিনটি প্রবেশদ্বার হলো খুলনা, বাগেরহাটের মোংলা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর। বড় লঞ্চ বা ক্রুজ জাহাজে ভ্রমণ করতে চাইলে যাত্রা শুরু করতে হবে খুলনা বা মোংলা থেকে। ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে সহজেই খুলনা ও মোংলা পৌঁছানো যায়। নন-এসি বাসে ভাড়া পড়ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং এসি বাসের ভাড়া ৮৫০ থেকে ১,৫০০ টাকা। এছাড়া ঢাকা থেকে খুলনায় নিয়মিত আন্তনগর ট্রেন যোগাযোগ রয়েছে।
- বন বিভাগের অনুমোদন ও পাস: সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ সব এলাকায় ইচ্ছেমতো প্রবেশের সুযোগ নেই। বন বিভাগের নির্ধারিত স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করে ট্রাভেল পাস সংগ্রহ করতে হয়। কেবল অনুমোদিত পর্যটন স্পটগুলোতেই যাওয়ার অনুমতি রয়েছে এবং সংবেদনশীল অভয়ারণ্য এলাকায় যেতে হলে বিশেষ ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়।
- একদিনের ট্যুর ও ট্রলার ব্যবস্থা: স্বল্প সময়ের ভ্রমণের জন্য বাগেরহাটের মোংলা, খুলনার চালনা এবং সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার পাওয়া যায়। একদিনে ঘুরে আসার জন্য মোংলা থেকে পশুর নদ দিয়ে করমজল ও হাড়বাড়িয়া; খুলনা থেকে রূপসা ও শিবসা নদী হয়ে কালাবাগী ও শেখেরটেক; কিংবা মুন্সিগঞ্জ থেকে কলাগাছিয়া ও দোবেকী সবচেয়ে জনপ্রিয় রুট।
- প্রবেশ ফি ও খরচ: কোনো অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সির প্যাকেজে গেলে বন বিভাগের সমস্ত এন্ট্রি ফি ও ট্যাক্স সাধারণত প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত থাকে। তবে ব্যক্তিগত বা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গেলে প্রতিটি পর্যটন স্পটের নির্ধারিত প্রবেশ ফি পর্যটককে আলাদাভাবে টিকিট কেটে পরিশোধ করতে হবে।
- মোংলা থেকে করমজল-হাড়বাড়িয়া ভ্রমণ: খুব সকালে মোংলা ফেরিঘাট থেকে রওনা দিলে একদিনের মধ্যেই করমজল প্রজনন কেন্দ্র ও হাড়বাড়িয়া ইকো-ট্যুরিজম স্পট ঘুরে আসা সম্ভব। সারাদিনের জন্য ট্রলারের ভাড়া পড়বে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। কেবল করমজল ঘুরতে ট্রলার ভাড়া পাওয়া যায় এক থেকে দুই হাজার টাকায়। এসব ক্ষেত্রে দুপুরের প্রয়োজনীয় খাবার পর্যটকদের সাথে করে নিয়ে যাওয়াই শ্রেয়।
- ইকোকটেজের অভিজ্ঞতা: প্রচলিত জাহাজে থাকার পাশাপাশি খুলনার দাকোপ উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন কৈলাসগঞ্জ ও বাণীশান্তা ইউনিয়নে গড়ে ওঠা দৃষ্টিনন্দন ইকোকটেজগুলোতে রাত্রিযাপনের চমৎকার সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় সংস্কৃতি ও গ্রামীণ আবহে বনের সীমানা উপভোগ করতে অনেক পর্যটক এখন এসব কটেজ বেছে নিচ্ছেন।
- আবাসিক জলযান ও জাহাজের সুবিধা: বর্তমানে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য খুলনা ও মোংলায় প্রায় ৬৫টি মানসম্মত রেজিস্টার্ড পর্যটকবাহী জলযান চালু রয়েছে। ছোট-বড় ভেদে এসব জাহাজে ৬ জন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৭৫ জন পর্যটকের থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে।
- প্যাকেজের সময়সীমা ও আগাম বুকিং: সাধারণত লঞ্চ ও ক্রুজগুলোর ট্যুর ৩ দিন ও ২ রাতের হয়ে থাকে। যেকোনো বিশ্বস্ত ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ অর্থ অগ্রিম দিয়ে বুকিং চূড়ান্ত করতে হয়। বিশেষ করে সরকারি ছুটির দিনগুলোতে বাড়তি ভিড় থাকায় অন্তত এক-দুই মাস আগেই বুকিং সেরে ফেলা নিরাপদ।
- আনুমানিক ব্যয় ও সুবিধাদি: জলযানের মানভেদে খরচে ভিন্নতা থাকে। নন-এসি জলযানে ভ্রমণ করতে জনপ্রতি খরচ হয় ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এসি জাহাজে এই ব্যয় দাঁড়ায় ১৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। এই প্যাকেজ খরচের মধ্যেই বন বিভাগের অনুমোদন ফি, অভিজ্ঞ বন প্রহরী ও গাইড, সার্বক্ষণিক খাবার ও নৌযানে রাত্রিযাপনের যাবতীয় খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
- পরিবেশ সুরক্ষা ও বনের কঠোর বিধিমালা: সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বন বিভাগ কিছু কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। বনে উচ্চশব্দ করা এবং ড্রোন ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বনে প্রবেশ কঠোরভাবে দণ্ডনীয়। এছাড়া প্লাস্টিক দূষণ রোধে একবার ব্যবহারযোগ্য (ওয়ান-টাইম) প্লাস্টিকের বোতল, গ্লাস বা প্লেট বহন না করার বিষয়ে কঠোর কড়াকড়ি রয়েছে। বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে—এমন যেকোনো আচরণ থেকে পর্যটকদের সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।
























