দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুর হার অতীতের তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত সর্বশেষ জরিপে এই ইতিবাচক তথ্য উঠে এসেছে। তবে শিশুমৃত্যু কমলেও নবজাতকের মৃত্যুর হার, ধীরগতির জন্মনিবন্ধন, ক্রমাগত শিশুশ্রম, নিরাপদ পানীয় জলের তীব্র সংকট এবং শিশুদের রক্তে ক্ষতিকর সিসার ভয়াবহ উপস্থিতির মতো বিষয়গুলো এখনও দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন খাতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিদ্যমান।
রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিবিএস তাদের বহুল আলোচিত ‘বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (এমআইসিএস) ২০২৫-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। ‘প্রগতির পথে’ শিরোনামে প্রকাশিত এই বিশেষ জরিপ ও প্রতিবেদন তৈরিতে সার্বিক প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহযোগিতা প্রদান করেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশাল এই জরিপ পরিচালনার জন্য দেশের মোট ৩ হাজার ১৪৯টি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে ৬২ হাজার ৯৮০টি পরিবারের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে এর মধ্য থেকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ৬১ হাজার ২০৭টি পরিবারের সাক্ষাৎকার সরাসরি গ্রহণ করেন জরিপকারীরা।
প্রকাশিত জরিপের প্রধান ইতিবাচক দিক হলো দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৩৩ জনে নেমে এসেছে। যেখানে এক দশক থেকে ১৪ বছর পূর্বেও এই শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ৩৯ জন। মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসার এই ধারাবাহিকতাকে দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় সাফল্য বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এই সুখবরের মধ্যেও কিছুটা থমকে আছে নবজাতক মৃত্যুর হার। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি হাজার জীবিত জন্ম নেওয়া শিশুর মধ্যে এখনও ২২ জন নবজাতক মারা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এমআইসিএস জরিপটিতে দেশের প্রসূতি স্বাস্থ্য ও প্রসবের চিত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তনের তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের মোট ৭১ শতাংশেরই জন্ম হয়েছে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে। তবে এ ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে ধনী ও দরিদ্র পরিবারের মধ্যে বিশাল ব্যবধান বা বৈষম্য লক্ষ্য করা গেছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সন্তান প্রসবের হার মাত্র ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ। এর বিপরীতে দেশের সবচেয়ে ধনী পরিবারের নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৮৬ দশমিক ৯ শতাংশ, যা স্বাস্থ্যসেবা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ক্ষেত্রে সুযোগের মারাত্মক বৈষম্যকে ফুটিয়ে তোলে।
জরিপ অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্মনিবন্ধনের হার বর্তমানে ৫৯ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে শিশুদের প্রারম্ভিক শিক্ষার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৫০ দশমিক ২ শতাংশ শিশু তাদের বয়সের জন্য নির্ধারিত মৌলিক পাঠদক্ষতা অর্জন করতে পেরেছে। লিঙ্গভিত্তিক বিবেচনায় এ ক্ষেত্রে মেয়ে শিশুরা তুলনামূলক এগিয়ে রয়েছে; যেখানে মেয়েদের মৌলিক পাঠদক্ষতার হার ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ, সেখানে ছেলেদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
অন্যদিকে শিশুসুরক্ষা সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কোমলমতি শিশুদের ৯ দশমিক ১ শতাংশ এখনও ঝুঁকিপূর্ণ বা সাধারণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবার থেকে আসা এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া বা পড়াশোনার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যেই শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।
দেশের সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের ক্ষেত্রেও উঠে এসেছে এক অসন্তোষজনক চিত্র। কাগজে-কলমে দেশের প্রায় ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ অন্ততপক্ষে মৌলিক পানীয় জলের সুযোগ সুবিধা পেলেও, সেই পানির প্রকৃত গুণগত মান ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে বিবিএস। প্রতিবেদনে বলা হয়, জরিপভুক্ত পরিবারগুলোর মধ্যে অন্তত ৮৫ শতাংশ সদস্য প্রতিদিন ই. কোলাই বা মানববর্জ্যের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ায় দূষিত পানি পান করছেন। এছাড়া দেশের ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ সঠিক উপায়ে হাত ধোয়ার মৌলিক সুবিধা পাচ্ছেন এবং ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষের জন্য উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত হয়েছে।
এবারের এমআইসিএস জরিপে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো শিশু এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের রক্ত পরীক্ষা করে সিসাসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতির হার পরিমাপ করা হয়েছে। ল্যাব টেস্টের এই ভয়াবহ ফলাফলে দেখা গেছে, ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী দেশের মোট ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুর রক্তে অত্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রায় (প্রতি ডেসিলিটারে অন্তত ৫ মাইক্রোগ্রাম) সিসার উপস্থিতি বিরাজ করছে। বিশেষ করে দেশের শহরাঞ্চল এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানা বা সিসাসংশ্লিষ্ট ব্যাটারি ও ভাঙারির কাজের কাছাকাছি এলাকায় যেসব শিশুরা পরিবারসহ বসবাস করে, তাদের রক্তে সিসার এই বিষাক্ত মাত্রা আরও বহুগুণ বেশি বলে উঠে এসেছে গবেষণায়।
সার্বিকভাবে বিবিএস তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, শিশুমৃত্যু হ্রাস, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বৃদ্ধি এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি নবজাতকের মৃত্যু রোধ, প্রসূতি সেবার মানের বৈষম্য দূরীকরণ, শতভাগ জন্মনিবন্ধন নিশ্চিতকরণ, প্রাথমিক শিক্ষার দক্ষতা বাড়ানো, শিশুশ্রম বন্ধ করা, ই. কোলাই মুক্ত নিরাপদ সুপেয় পানি সরবরাহ এবং পরিবেশগত বিষাক্ত দূষণের হাত থেকে শিশুদের সুরক্ষা দিতে অবিলম্বে আরও সমন্বিত ও কার্যকর সরকারি নীতি গ্রহণ করা আবশ্যক।
রিপোর্টারের নাম 

























