ঢাকা ১২:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

৯ বছরেও ফেরেনি একজনও: অনিশ্চয়তায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ

কক্সবাজার প্রতিনিধি

প্রত্যাবাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, শরণার্থী শিবিরে ক্রমেই বাড়ছে জনসংখ্যা, অন্যদিকে কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা। এমন বাস্তবতায় কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে আটকে আছে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ। আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস ঘিরে আবারও সামনে এসেছে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী এই মানবিক সংকট।

কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গা যুবনেতা মুজিবুর রহমান বলেন, “আমাদের স্বপ্ন আছে, মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে। কিন্তু যুদ্ধ, রাজনীতি, কূটনীতি ও পরিচয়ের সংকটে সেই স্বপ্ন আজও বাস্তব হয়নি।”

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিলিয়ে বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছে ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ।

পরিচয়হীন এক জনগোষ্ঠী

রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী ও সমাজনেতারা বলছেন, সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো নাগরিক পরিচয়ের প্রশ্ন। মিয়ানমার সরকার এখনো রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথও বন্ধ হয়ে আছে।

রোহিঙ্গা সমাজকর্মী ডা. জুবায়ের বলেন, “আমরা রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত হতে চাই। কিন্তু মিয়ানমার আমাদের সেই পরিচয় স্বীকার করে না। নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা ছাড়া প্রত্যাবাসন বাস্তবসম্মত নয়।”

তার মতে, শরণার্থী ক্যাম্পের জীবন কার্যত একটি বন্দি জীবনের মতো। এখানে কর্মসংস্থান সীমিত, স্বাধীন চলাচলের সুযোগ নেই এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সবসময় তাড়া করে বেড়ায়।

বড় হচ্ছে নতুন প্রজন্মের সংকট

২০১৭ সালে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া অনেক শিশু এখন তরুণ হয়ে উঠেছে। তাদের একটি বড় অংশ কখনো মিয়ানমার দেখেনি। তারা শুধু বাবা-মায়ের মুখে নিজেদের গ্রামের গল্প শুনে বড় হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি এই অনিশ্চয়তা একটি ‘হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম’ তৈরি করছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশের সুযোগ না থাকায় তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বাড়ছে জনসংখ্যা

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। তবে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকৃত সংখ্যা ১৫ লাখেরও বেশি।

আরআরআরসি কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, “প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু ক্যাম্পে জন্ম নিচ্ছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন করে আরও দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ফলে সংকট দিন দিন আরও বড় হচ্ছে।”

কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা

রোহিঙ্গা সংকট একসময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক গুরুত্ব পেলেও বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক মনোযোগ অনেকটাই সরে গেছে।

এর প্রভাব পড়েছে অর্থায়নের ক্ষেত্রেও। মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আশ্রয় ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহ ও সহায়তা কমতে থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া স্থবির

২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি হলেও গত নয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও স্থায়ীভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।

দুই দফা প্রত্যাবাসন উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর পুরো প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। মিয়ানমারে চলমান সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তার অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরআরআরসি কমিশনার বলেন, “প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ পরিবেশ প্রয়োজন। সেই পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।”

বিকল্প কী?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রত্যাবাসনই একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থার কারণে বিকল্প পরিকল্পনা নিয়েও ভাবতে হবে।

তাদের মতে, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন, দক্ষতা উন্নয়ন, সীমিত কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ততায় নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “১৫ লাখ মানুষকে বছরের পর বছর শুধু ত্রাণনির্ভর অবস্থায় রাখা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না।”

স্বপ্ন এখনো ফেরা

সব অনিশ্চয়তার মাঝেও রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন একটাই—নিজ দেশে ফিরে যাওয়া।

রোহিঙ্গা যুবনেতা মুজিবুর রহমান বলেন, “ক্যাম্পে থাকলে ভবিষ্যৎ শূন্য। আমাদের একটাই লক্ষ্য, আমরা আমাদের মাতৃভূমিতে ফিরতে চাই।”

ক্যাম্পের সংকীর্ণ জীবন, সীমিত সুযোগ এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার মধ্যেও লাখো রোহিঙ্গা এখনো সেই দিনের অপেক্ষায় আছে, যেদিন তারা নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের মাটিতে ফিরে যেতে পারবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

এক বছরে ২২০ মিলিয়ন ঘনফুট কমেছে গ্যাস উৎপাদন, বাড়ছে সংকটের শঙ্কা

৯ বছরেও ফেরেনি একজনও: অনিশ্চয়তায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ

আপডেট সময় : ১০:৩৮:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

কক্সবাজার প্রতিনিধি

প্রত্যাবাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, শরণার্থী শিবিরে ক্রমেই বাড়ছে জনসংখ্যা, অন্যদিকে কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা। এমন বাস্তবতায় কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে আটকে আছে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ। আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস ঘিরে আবারও সামনে এসেছে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী এই মানবিক সংকট।

কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গা যুবনেতা মুজিবুর রহমান বলেন, “আমাদের স্বপ্ন আছে, মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে। কিন্তু যুদ্ধ, রাজনীতি, কূটনীতি ও পরিচয়ের সংকটে সেই স্বপ্ন আজও বাস্তব হয়নি।”

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিলিয়ে বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছে ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ।

পরিচয়হীন এক জনগোষ্ঠী

রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী ও সমাজনেতারা বলছেন, সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো নাগরিক পরিচয়ের প্রশ্ন। মিয়ানমার সরকার এখনো রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথও বন্ধ হয়ে আছে।

রোহিঙ্গা সমাজকর্মী ডা. জুবায়ের বলেন, “আমরা রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত হতে চাই। কিন্তু মিয়ানমার আমাদের সেই পরিচয় স্বীকার করে না। নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা ছাড়া প্রত্যাবাসন বাস্তবসম্মত নয়।”

তার মতে, শরণার্থী ক্যাম্পের জীবন কার্যত একটি বন্দি জীবনের মতো। এখানে কর্মসংস্থান সীমিত, স্বাধীন চলাচলের সুযোগ নেই এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সবসময় তাড়া করে বেড়ায়।

বড় হচ্ছে নতুন প্রজন্মের সংকট

২০১৭ সালে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া অনেক শিশু এখন তরুণ হয়ে উঠেছে। তাদের একটি বড় অংশ কখনো মিয়ানমার দেখেনি। তারা শুধু বাবা-মায়ের মুখে নিজেদের গ্রামের গল্প শুনে বড় হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি এই অনিশ্চয়তা একটি ‘হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম’ তৈরি করছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশের সুযোগ না থাকায় তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বাড়ছে জনসংখ্যা

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। তবে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকৃত সংখ্যা ১৫ লাখেরও বেশি।

আরআরআরসি কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, “প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু ক্যাম্পে জন্ম নিচ্ছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন করে আরও দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ফলে সংকট দিন দিন আরও বড় হচ্ছে।”

কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা

রোহিঙ্গা সংকট একসময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক গুরুত্ব পেলেও বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক মনোযোগ অনেকটাই সরে গেছে।

এর প্রভাব পড়েছে অর্থায়নের ক্ষেত্রেও। মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আশ্রয় ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহ ও সহায়তা কমতে থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া স্থবির

২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি হলেও গত নয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও স্থায়ীভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।

দুই দফা প্রত্যাবাসন উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর পুরো প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। মিয়ানমারে চলমান সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তার অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরআরআরসি কমিশনার বলেন, “প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ পরিবেশ প্রয়োজন। সেই পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।”

বিকল্প কী?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রত্যাবাসনই একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থার কারণে বিকল্প পরিকল্পনা নিয়েও ভাবতে হবে।

তাদের মতে, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন, দক্ষতা উন্নয়ন, সীমিত কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ততায় নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “১৫ লাখ মানুষকে বছরের পর বছর শুধু ত্রাণনির্ভর অবস্থায় রাখা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না।”

স্বপ্ন এখনো ফেরা

সব অনিশ্চয়তার মাঝেও রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন একটাই—নিজ দেশে ফিরে যাওয়া।

রোহিঙ্গা যুবনেতা মুজিবুর রহমান বলেন, “ক্যাম্পে থাকলে ভবিষ্যৎ শূন্য। আমাদের একটাই লক্ষ্য, আমরা আমাদের মাতৃভূমিতে ফিরতে চাই।”

ক্যাম্পের সংকীর্ণ জীবন, সীমিত সুযোগ এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার মধ্যেও লাখো রোহিঙ্গা এখনো সেই দিনের অপেক্ষায় আছে, যেদিন তারা নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের মাটিতে ফিরে যেতে পারবে।