ঢাকা ০৮:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

সংকট ও প্রতিশ্রুতির সাঁড়াশি চাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট: কোন পথে হাঁটবে সরকার?

দেশের অর্থনীতিতে গত কয়েক বছরের পুঞ্জীভূত সংকট এখনও কাটেনি, বরং সময়ের সাথে তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই অর্থমন্ত্রীর ওপর পাহাড়সম চাপ তৈরি করেছে গত নির্বাচনের আগে বিএনপির দেওয়া বড় বড় প্রতিশ্রুতিগুলো। সীমিত সামর্থ্যের গণ্ডিতে থেকে জনমনে তৈরি হওয়া আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণ আর অর্থনীতির চাকা সচল রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে পরিকল্পনার ছক কষতে গিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সরকার কি সেই গতানুগতিক পথেই হাঁটবে, নাকি সংকটের মোকাবিলায় প্রথা ভেঙে নতুন কোনো পথ খুঁজবে? বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সরকারের সামনে আসলে বিকল্প পথ খুব একটা খোলা নেই।


উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সংকট ও নতুন বৈশ্বিক চাপ

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত নতুন বিএনপি সরকারের শুরুটাই হয়েছে অর্থনীতির ওপর এক বিশাল বৈশ্বিক চাপের বোঝা নিয়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়বেলায় মনে করা হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ কেটে যাবে। কিন্তু ইরান ও পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই আশায় শুরুতেই হোঁচট দিয়েছে।

বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান অর্থনীতিতে ‘না’ পাওয়ার তালিকাটি অনেক দীর্ঘ। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর নতুন করে বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ার শঙ্কা। চড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

বাজেটের আকার ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা

অর্থনীতির এই দোদুল্যমান অবস্থার মধ্যেও সরকার প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বাজেট পরিকল্পনার ছক কষছে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যাচ্ছে, বাজেটে বেশ কিছু বড় বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে:

  • বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP): বর্তমানের ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা।
  • ফ্যামিলি কার্ড: নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ১৩ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ।
  • সরকারি বেতন কাঠামো: নতুন বেতন স্কেলের আংশিক বাস্তবায়নে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।
  • সুদ পরিশোধ: ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

অর্থের জোগান ও রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ

বিশাল এই বাজেটের অর্থের সংস্থান হবে কোথা থেকে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই ৯৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতিতে রয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ধরা হলেও, অর্থনীতিবিদদের মতে, ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছাড়া এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।

আইএমএফ তাদের ঋণ কর্মসূচির অর্থছাড় থামিয়ে দেওয়ায় বৈদেশিক ঋণের উৎসও এখন অনিশ্চিত। এমন অবস্থায় সরকার কি ব্যাংক খাতের ওপর ভর করবে, নাকি টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি মেটাবে? অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন যে, টাকা ছাপানো বা ব্যাংক থেকে ঢালাও ঋণ নেওয়ার বিষয়ে তার সরকার ‘অত্যন্ত সতর্ক’ থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের ভাবনায় ‘সাশ্রয়ী বাজেট’

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, এখন সাশ্রয়ী হওয়া কোনো বিকল্প নয়, বরং এটি একটি বাধ্যবাধকতা। তিনি মনে করেন, বাজেট উচ্চাকাঙ্ক্ষী না করে বরং অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা এবং দরিদ্র মানুষের কষ্ট কমানোর ওপর জোর দেওয়া উচিত। তার ভাষায়:

“প্রশ্নটা হলো কতটা সাশ্রয়ী হব, কোন জায়গায় সাশ্রয়ী হব এবং কীভাবে সাশ্রয়ী হব। এই ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা আমাদের নেই।”

অন্যদিকে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে কর জাল বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।

জীবনযাত্রার মান ও বিনিয়োগের চিন্তা

সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, টানা সংকোচনমূলক বাজেটের ফলে প্রবৃদ্ধিতে এক ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা দেখা দিচ্ছে। তাই বিনিয়োগ সচল রাখতে এবং প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে বাজেটের আকার বড় করা ছাড়া উপায় নেই। একইসাথে ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোর চেষ্টা করবে সরকার। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও জিডিপির বিচারে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

জাতীয় সংসদে আগামী ১১ জুন বাজেট উপস্থাপনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর হাতে কোনো ‘জাদুর কাঠি’ নেই, তবে আছে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। একদিকে যুদ্ধের প্রভাব, অন্যদিকে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন—এই দুইয়ের সমন্বয়ে কেমন হবে নতুন অর্থবছরের বাজেট, তা দেখার জন্য এখন পুরো দেশ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের চিরবিদায়, প্রধানমন্ত্রীর গভীর শোক

সংকট ও প্রতিশ্রুতির সাঁড়াশি চাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট: কোন পথে হাঁটবে সরকার?

আপডেট সময় : ১১:২৭:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬

দেশের অর্থনীতিতে গত কয়েক বছরের পুঞ্জীভূত সংকট এখনও কাটেনি, বরং সময়ের সাথে তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই অর্থমন্ত্রীর ওপর পাহাড়সম চাপ তৈরি করেছে গত নির্বাচনের আগে বিএনপির দেওয়া বড় বড় প্রতিশ্রুতিগুলো। সীমিত সামর্থ্যের গণ্ডিতে থেকে জনমনে তৈরি হওয়া আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণ আর অর্থনীতির চাকা সচল রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে পরিকল্পনার ছক কষতে গিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সরকার কি সেই গতানুগতিক পথেই হাঁটবে, নাকি সংকটের মোকাবিলায় প্রথা ভেঙে নতুন কোনো পথ খুঁজবে? বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সরকারের সামনে আসলে বিকল্প পথ খুব একটা খোলা নেই।


উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সংকট ও নতুন বৈশ্বিক চাপ

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত নতুন বিএনপি সরকারের শুরুটাই হয়েছে অর্থনীতির ওপর এক বিশাল বৈশ্বিক চাপের বোঝা নিয়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়বেলায় মনে করা হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ কেটে যাবে। কিন্তু ইরান ও পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই আশায় শুরুতেই হোঁচট দিয়েছে।

বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান অর্থনীতিতে ‘না’ পাওয়ার তালিকাটি অনেক দীর্ঘ। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর নতুন করে বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ার শঙ্কা। চড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

বাজেটের আকার ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা

অর্থনীতির এই দোদুল্যমান অবস্থার মধ্যেও সরকার প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বাজেট পরিকল্পনার ছক কষছে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যাচ্ছে, বাজেটে বেশ কিছু বড় বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে:

  • বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP): বর্তমানের ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা।
  • ফ্যামিলি কার্ড: নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ১৩ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ।
  • সরকারি বেতন কাঠামো: নতুন বেতন স্কেলের আংশিক বাস্তবায়নে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।
  • সুদ পরিশোধ: ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

অর্থের জোগান ও রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ

বিশাল এই বাজেটের অর্থের সংস্থান হবে কোথা থেকে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই ৯৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতিতে রয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ধরা হলেও, অর্থনীতিবিদদের মতে, ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছাড়া এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।

আইএমএফ তাদের ঋণ কর্মসূচির অর্থছাড় থামিয়ে দেওয়ায় বৈদেশিক ঋণের উৎসও এখন অনিশ্চিত। এমন অবস্থায় সরকার কি ব্যাংক খাতের ওপর ভর করবে, নাকি টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি মেটাবে? অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন যে, টাকা ছাপানো বা ব্যাংক থেকে ঢালাও ঋণ নেওয়ার বিষয়ে তার সরকার ‘অত্যন্ত সতর্ক’ থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের ভাবনায় ‘সাশ্রয়ী বাজেট’

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, এখন সাশ্রয়ী হওয়া কোনো বিকল্প নয়, বরং এটি একটি বাধ্যবাধকতা। তিনি মনে করেন, বাজেট উচ্চাকাঙ্ক্ষী না করে বরং অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা এবং দরিদ্র মানুষের কষ্ট কমানোর ওপর জোর দেওয়া উচিত। তার ভাষায়:

“প্রশ্নটা হলো কতটা সাশ্রয়ী হব, কোন জায়গায় সাশ্রয়ী হব এবং কীভাবে সাশ্রয়ী হব। এই ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা আমাদের নেই।”

অন্যদিকে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে কর জাল বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।

জীবনযাত্রার মান ও বিনিয়োগের চিন্তা

সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, টানা সংকোচনমূলক বাজেটের ফলে প্রবৃদ্ধিতে এক ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা দেখা দিচ্ছে। তাই বিনিয়োগ সচল রাখতে এবং প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে বাজেটের আকার বড় করা ছাড়া উপায় নেই। একইসাথে ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোর চেষ্টা করবে সরকার। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও জিডিপির বিচারে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

জাতীয় সংসদে আগামী ১১ জুন বাজেট উপস্থাপনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর হাতে কোনো ‘জাদুর কাঠি’ নেই, তবে আছে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। একদিকে যুদ্ধের প্রভাব, অন্যদিকে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন—এই দুইয়ের সমন্বয়ে কেমন হবে নতুন অর্থবছরের বাজেট, তা দেখার জন্য এখন পুরো দেশ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।