ঢাকা ০৮:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

দাদন ও ঋণের জালে বরিশালের জেলেরা: জ্বালানি সংকট ও নিষেধাজ্ঞায় জীবন আরও দুর্বিষহ

বরিশালের খোরশেদ আলমের মতো বহু জেলে ১৫ বছর ধরে সমুদ্র ও নদীতে মাছ ধরেও দিনশেষে দাদন ও ঋণের জালে বন্দি। প্রতিদিন মাছ ধরে মহাজনের কাছে বিক্রি করলেও তেমন আয় হয় না, বরং বছর শেষে নতুন করে দাদন নিতে হয়। এই দাদন পরিশোধ করতে না পারায় চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েই চলে সুদের বোঝা, যা তাদের জীবনকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট মৎস্য আহরণে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি করেছিল, যার ফলে প্রায় দুই মাস জেলেরা মাছ ধরতে পারেননি। এই সংকটের মধ্যেই জাটকা রক্ষা ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে দেওয়া সরকারি নিষেধাজ্ঞাও তাদের আয় বন্ধ করে দেয়। নিবন্ধিত জেলেরা সামান্য চাল ও কিছু প্রণোদনা পেলেও বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত জেলে কোনো সহায়তা পাননি। ফলে পরিবার চালাতে বাধ্য হয়ে তারা মহাজন ও আড়তদারদের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিয়েছেন।

বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের ধুলখোলা, মেমানিয়া, হরিনাথপুর, বড়জালিয়া, উলানিয়া, গোবিন্দপুরসহ বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে প্রায় দেড় লাখ জেলের বসবাস। মেঘনাসহ বিভিন্ন নদীকে ঘিরেই তাদের জীবন-জীবিকা পরিচালিত হয়। কিন্তু মাছ ধরার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা এবং ঋণগ্রস্ততা তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

হিজলার বড়জালিয়া ইউনিয়নের বাউশিয়া এলাকার জেলে ইয়াকুব ব্যাপারী জানান, তেলের সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় মাছ ধরতে পারেননি। ধারদেনা করে সংসার চালিয়েছেন। এরপর নিষেধাজ্ঞার কারণেও আয় বন্ধ হয়ে যায়। সংসার চালাতে চড়া সুদে দাদন নিতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, “দাদন নিতে নিতেই জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। মাছ ধরে বিক্রি করে এই দাদন পরিশোধ করা যায় না। বছর বছর ঠিকই সুদে বেড়ে যায়।”

জেলেরা অভিযোগ করেন, ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছে যান। মৌসুমের শুরুতে নৌকা মেরামত, জাল কেনা, জ্বালানি ও খাদ্যের জন্য ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দাদন নিতে হয়। কিন্তু সেই ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট আড়তেই মাছ বিক্রি করতে বাধ্য করা হয় তাদের। বাজারে দাম বেশি থাকলেও অন্য কোথাও মাছ বিক্রির সুযোগ থাকে না।

জেলেরা আরও জানান, এক মৌসুমের জন্য লাখে ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদ গুনতে হয়। বছরের পর বছর সুদের টাকা শোধ করলেও আসল ঋণ থেকেই যায়, যা তাদের দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হতে দেয় না।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের চিরবিদায়, প্রধানমন্ত্রীর গভীর শোক

দাদন ও ঋণের জালে বরিশালের জেলেরা: জ্বালানি সংকট ও নিষেধাজ্ঞায় জীবন আরও দুর্বিষহ

আপডেট সময় : ০৯:৩৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬

বরিশালের খোরশেদ আলমের মতো বহু জেলে ১৫ বছর ধরে সমুদ্র ও নদীতে মাছ ধরেও দিনশেষে দাদন ও ঋণের জালে বন্দি। প্রতিদিন মাছ ধরে মহাজনের কাছে বিক্রি করলেও তেমন আয় হয় না, বরং বছর শেষে নতুন করে দাদন নিতে হয়। এই দাদন পরিশোধ করতে না পারায় চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েই চলে সুদের বোঝা, যা তাদের জীবনকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট মৎস্য আহরণে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি করেছিল, যার ফলে প্রায় দুই মাস জেলেরা মাছ ধরতে পারেননি। এই সংকটের মধ্যেই জাটকা রক্ষা ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে দেওয়া সরকারি নিষেধাজ্ঞাও তাদের আয় বন্ধ করে দেয়। নিবন্ধিত জেলেরা সামান্য চাল ও কিছু প্রণোদনা পেলেও বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত জেলে কোনো সহায়তা পাননি। ফলে পরিবার চালাতে বাধ্য হয়ে তারা মহাজন ও আড়তদারদের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিয়েছেন।

বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের ধুলখোলা, মেমানিয়া, হরিনাথপুর, বড়জালিয়া, উলানিয়া, গোবিন্দপুরসহ বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে প্রায় দেড় লাখ জেলের বসবাস। মেঘনাসহ বিভিন্ন নদীকে ঘিরেই তাদের জীবন-জীবিকা পরিচালিত হয়। কিন্তু মাছ ধরার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা এবং ঋণগ্রস্ততা তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

হিজলার বড়জালিয়া ইউনিয়নের বাউশিয়া এলাকার জেলে ইয়াকুব ব্যাপারী জানান, তেলের সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় মাছ ধরতে পারেননি। ধারদেনা করে সংসার চালিয়েছেন। এরপর নিষেধাজ্ঞার কারণেও আয় বন্ধ হয়ে যায়। সংসার চালাতে চড়া সুদে দাদন নিতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, “দাদন নিতে নিতেই জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। মাছ ধরে বিক্রি করে এই দাদন পরিশোধ করা যায় না। বছর বছর ঠিকই সুদে বেড়ে যায়।”

জেলেরা অভিযোগ করেন, ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছে যান। মৌসুমের শুরুতে নৌকা মেরামত, জাল কেনা, জ্বালানি ও খাদ্যের জন্য ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দাদন নিতে হয়। কিন্তু সেই ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট আড়তেই মাছ বিক্রি করতে বাধ্য করা হয় তাদের। বাজারে দাম বেশি থাকলেও অন্য কোথাও মাছ বিক্রির সুযোগ থাকে না।

জেলেরা আরও জানান, এক মৌসুমের জন্য লাখে ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদ গুনতে হয়। বছরের পর বছর সুদের টাকা শোধ করলেও আসল ঋণ থেকেই যায়, যা তাদের দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হতে দেয় না।