গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘরে একসময় দেখা মিলতো বাঁশ-বেতের তৈরি চেয়ার, মোড়া, দোলনা কিংবা ডাইন-ইন সেটের। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সে জায়গাটি দখলে নিয়েছে লোহা, প্লাস্টিকের আসবাবপত্র। এখন হারাতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প। তবে এখনও হাল ছাড়েননি কিছু কারুশিল্পী। যার মধ্যে একজন রংপুরের এরশাদ। তার সেই নিপুণ দক্ষতার মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে আঁকড়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
তবে চাহিদা কমে যাওয়ায় কাজের মান ধরে রেখেও বিপাকে পড়েছেন কারুশিল্পীরা। এই হারিয়ে যাওয়া শিল্পকে নতুন আঙ্গিকে বাজারজাতকরণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দাবি ক্রেতাদের। এদিকে এই হস্তশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহযোগিতার কথা জানিয়েছে বিসিক।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রংপুর নগরীর শাপলা চত্বর এলাকায় বেশ কয়েকটি দোকানে বাঁশ-বেতের তৈরি চেয়ার, মোড়া, দোলনাসহ নানা আসবাবপত্র সাজানো রয়েছে। শখের বসে গ্রাহকরা আসছেন, দেখছেন। কেউ চলে যাচ্ছেন আবার কেউ বা কিনছেন। তবে আগের মতো নেই সেই চিরচেনা ভিড় কিংবা চাহিদা।
ব্যবসায়ী এরশাদ আলী বলেন, আমি ১১ বয়স থেকে এই শিল্পের সাথে জড়িত। ধীরে ধীরে কাজ শিখে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেই। একসময় আমার অধীনে অর্ধ-শতাধিক কারিগর কাজ করতো। কিন্তু দিন যতই গিয়েছে এই বাঁশ-বেতের আসবাবপত্রের চাহিদা কমে গিয়েছে। মানুষ এখন প্লাস্টিক, কাঠ, স্টিলসহ আধুনিক আসবাবপত্রের দিকে ঝুঁকছে। এখন আয় রোজগারও কমে গিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমি চেয়েছিলাম আমার ছেলে আমার এই পেশাটিকে ধরে রাখুক কিন্তু সেও এই ব্যবসা করতে আগ্রহী নয়। তবে আমি যতদিন বেঁচে থাকবো এই পেশাটিকে ধরে রাখবো। আমার জীবন-যৌবন সব বিলিয়ে দিয়েছি এই হস্তশিল্পে, তাই এখান থেকে বের হয়ে অন্যকিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব না। তবে সরকার থেকে যদি শিল্পের বাজার পুনরায় তৈরিতে উদ্যোগ নেয়া হতো তাহলে হয়তো তরুণ প্রজন্মের কাছে বাঁশ-বেতের এই হস্তশিল্পটি আবারও প্রাণ ফিরে পেত।
নগরীর শালবন এলাকার বাসিন্দা সানজিদা সীমা বলেন, ছোট বেলায় দেখতাম এই বাঁশ-বেতের তৈরি চেয়ার, মোড়া, দোলনার প্রচলন ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এর চাহিদা কমে গেছে। মানুষ এখন আর এসব কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করে না। আমি পুরনো স্মৃতি ধরে রাখতে একটি আরাম কেদারা কিনেছি।
শাবনাজ বেগম বলেন, স্টিল, প্লাস্টিকসহ অন্যান্য আসবাবপত্রের দখলে এখন আমাদের বাড়ি-ঘর। বাঁশ-বেতের আসবাবপত্রের চাহিদা এখন নেই বললেই চলে। নতুন প্রজন্ম এই হস্তশিল্পের কথা হয়তো জানেই না।
মুরাদ হাসান বলেন, এই হস্তশিল্পকে যদি নতুন আঙ্গিকে আবারও বাজারজাত করা যায়, মানুষের প্রয়োজনে এর ডিজাইন, আকর্ষণীয়তা যদি আরও বাড়ানো যায় তাহলে আমার মনে হয় এই বাঁশ-বেতের শিল্পকে আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
বাঁশ-বেত আসবাবপত্রের কারিগর আব্দুর রহিম মিয়া বলেন, আগে কাজের চাপ অনেক ছিল। কিন্তু চাহিদা কমে যাওয়ায় এখন সেরকম কাজের চাপ নেই। তবে আমরা কাজের মান ঠিক রেখেছি। কিন্তু মানুষ আর এই আসবাবপত্রগুলো কিনে না।
কারিগর সোহেল মিয়া বলেন, বাঁশ বেতের শিল্প এখন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি এগিয়ে না আসে, তবে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
























