মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৬:৫৩ অপরাহ্ন | ২৮শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার, ১২ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

ভূমধ্যসাগরের জলে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন: অনিয়মিত অভিবাসনে নিঃস্ব পরিবার, সক্রিয় পাচারচক্র

  • হালনাগাদ সময় : ০৫:৩৮:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, পরিবারের সচ্ছলতা আর সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রতিবছর দূরদেশের উদ্দেশে পাড়ি জমান লাখো বাংলাদেশি তরুণ। এই প্রবাসীদের রক্ত-ঘামে অর্জিত রেমিট্যান্সেই শক্তিশালী হয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, সমৃদ্ধ হয় জাতীয় অর্থনীতি। কিন্তু এই স্বপ্নের সোনালী পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক নির্মম ও রক্তক্ষয়ী বাস্তবতা। উন্নত জীবনের হাতছানিতে বিভ্রান্ত হয়ে সমুদ্র ও মরুভূমির বিপজ্জনক অনিয়মিত পথ বেছে নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন, নিখোঁজ হচ্ছেন কিংবা আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ‘মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রজেক্ট’-এর নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিগত এক দশকে বিপজ্জনক অনিয়মিত পথে ইউরোপ ও অন্যান্য দেশে যাওয়ার চেষ্টাকালে অন্তত ১ হাজার ৩২৯ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে নিখোঁজ হয়েছেন আরও ৮৫৯ জন। অর্থাৎ, এই সময়ে সাগর ও সীমান্তে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সম্মিলিত সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ২ হাজার ১৮৮। বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়া হয়ে ছোট ডিঙি নৌকায় বিপজ্জনক ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়েই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশির সলিলসমাধি ঘটেছে। তবে উদ্ধার না হওয়া মরদেহ এবং নথিভুক্ত না হওয়া অসংখ্য ট্র্যাজেডির কারণে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বহুগুণ বেশি হতে পারে।

দেশে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের অভাব, চরম পারিবারিক আর্থিক সংকট এবং দ্রুত ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর প্রবল আকাঙ্ক্ষাকেই তরুণদের এই মৃত্যুঝুঁকি নেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই অসহায়ত্বের সুযোগ নেয় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী নেটওয়ার্ক। ইউরোপে উচ্চ বেতনের চাকরির মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে একেকজন প্রার্থীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত। পরিবারের শেষ সম্বল ফসলি জমি বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই পথে নামার পর দেখা যায় প্রতিশ্রুত ভিসা কিংবা কাজের কোনো অস্তিত্ব নেই। উল্টো লিবিয়া বা মরু অঞ্চলের টর্চার সেলে আটকে রেখে পরিবারের কাছে দফায় দফায় মুক্তিপণ আদায় ও অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রচার-প্রচারণা বা আইনের ভয় দেখিয়ে এই বিপজ্জনক স্রোত পুরোপুরি থামানো অসম্ভব। তরুণদের এই পথ থেকে ফেরাতে হলে দেশে উপযুক্ত কাজের পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি বৈধ পথে স্বল্পব্যয়ে বিদেশে যাওয়ার কার্যকর বিকল্প নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য প্রথাগত মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের বাইরে গিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার উন্নত দেশগুলোতে দক্ষ ও কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের জন্য সরকারি পর্যায়ে শ্রমচুক্তি করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ, নিয়োগদাতা ও ভিসার সত্যতা যাচাইয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা এবং বিদেশে বিপদগ্রস্ত প্রবাসীদের উদ্ধারে দূতাবাসগুলোর সক্রিয় তৎপরতা নিশ্চিত করতে হবে।

রেমিট্যান্সের অঙ্ক দিয়ে কখনোই একজন অভিবাসী শ্রমিকের প্রাণের ক্ষতি পূরণ হতে পারে না। বিদেশে একজন কর্মীর মৃত্যুর অর্থ শুধু একটি জীবনের অবসান নয়, বরং একটি পরিবারের আজীবনের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া। তাই অভিবাসন নীতিতে শুধু সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে কর্মীর জীবন, নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও মানবিক মর্যাদাকে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণের কেন্দ্রে রাখার জোর দাবি উঠেছে।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

বেকারদের জন্য চাকরির দরজা খুলবে কবে? উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেই তীব্র হাহাকার

28 October 2026

জাপানি উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে পাঁচটি অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

ভূমধ্যসাগরের জলে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন: অনিয়মিত অভিবাসনে নিঃস্ব পরিবার, সক্রিয় পাচারচক্র

হালনাগাদ সময় : ০৫:৩৮:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, পরিবারের সচ্ছলতা আর সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রতিবছর দূরদেশের উদ্দেশে পাড়ি জমান লাখো বাংলাদেশি তরুণ। এই প্রবাসীদের রক্ত-ঘামে অর্জিত রেমিট্যান্সেই শক্তিশালী হয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, সমৃদ্ধ হয় জাতীয় অর্থনীতি। কিন্তু এই স্বপ্নের সোনালী পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক নির্মম ও রক্তক্ষয়ী বাস্তবতা। উন্নত জীবনের হাতছানিতে বিভ্রান্ত হয়ে সমুদ্র ও মরুভূমির বিপজ্জনক অনিয়মিত পথ বেছে নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন, নিখোঁজ হচ্ছেন কিংবা আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ‘মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রজেক্ট’-এর নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিগত এক দশকে বিপজ্জনক অনিয়মিত পথে ইউরোপ ও অন্যান্য দেশে যাওয়ার চেষ্টাকালে অন্তত ১ হাজার ৩২৯ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে নিখোঁজ হয়েছেন আরও ৮৫৯ জন। অর্থাৎ, এই সময়ে সাগর ও সীমান্তে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সম্মিলিত সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ২ হাজার ১৮৮। বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়া হয়ে ছোট ডিঙি নৌকায় বিপজ্জনক ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়েই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশির সলিলসমাধি ঘটেছে। তবে উদ্ধার না হওয়া মরদেহ এবং নথিভুক্ত না হওয়া অসংখ্য ট্র্যাজেডির কারণে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বহুগুণ বেশি হতে পারে।

দেশে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের অভাব, চরম পারিবারিক আর্থিক সংকট এবং দ্রুত ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর প্রবল আকাঙ্ক্ষাকেই তরুণদের এই মৃত্যুঝুঁকি নেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই অসহায়ত্বের সুযোগ নেয় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী নেটওয়ার্ক। ইউরোপে উচ্চ বেতনের চাকরির মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে একেকজন প্রার্থীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত। পরিবারের শেষ সম্বল ফসলি জমি বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই পথে নামার পর দেখা যায় প্রতিশ্রুত ভিসা কিংবা কাজের কোনো অস্তিত্ব নেই। উল্টো লিবিয়া বা মরু অঞ্চলের টর্চার সেলে আটকে রেখে পরিবারের কাছে দফায় দফায় মুক্তিপণ আদায় ও অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রচার-প্রচারণা বা আইনের ভয় দেখিয়ে এই বিপজ্জনক স্রোত পুরোপুরি থামানো অসম্ভব। তরুণদের এই পথ থেকে ফেরাতে হলে দেশে উপযুক্ত কাজের পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি বৈধ পথে স্বল্পব্যয়ে বিদেশে যাওয়ার কার্যকর বিকল্প নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য প্রথাগত মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের বাইরে গিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার উন্নত দেশগুলোতে দক্ষ ও কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের জন্য সরকারি পর্যায়ে শ্রমচুক্তি করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ, নিয়োগদাতা ও ভিসার সত্যতা যাচাইয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা এবং বিদেশে বিপদগ্রস্ত প্রবাসীদের উদ্ধারে দূতাবাসগুলোর সক্রিয় তৎপরতা নিশ্চিত করতে হবে।

রেমিট্যান্সের অঙ্ক দিয়ে কখনোই একজন অভিবাসী শ্রমিকের প্রাণের ক্ষতি পূরণ হতে পারে না। বিদেশে একজন কর্মীর মৃত্যুর অর্থ শুধু একটি জীবনের অবসান নয়, বরং একটি পরিবারের আজীবনের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া। তাই অভিবাসন নীতিতে শুধু সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে কর্মীর জীবন, নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও মানবিক মর্যাদাকে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণের কেন্দ্রে রাখার জোর দাবি উঠেছে।

Share this news as a Photo Card