শারদীয় দুর্গাপূজা মানেই ঢাকের বাদ্যি, ধূপের গন্ধ, আলোর রোশনাই এবং মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার আরাধনা। প্রতি বছর এই নির্দিষ্ট কটি দিনের জন্য দেবী কৈলাস থেকে নিজের বাপের বাড়িতে আসেন। তাঁকে ঘিরেই মর্ত্যে শুরু হয় আনন্দোৎসব। তবে দেবীর প্রতিমা তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রাচীন এক রীতি আজও বহু মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বাংলার দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে গঙ্গার পলিমাটির পাশাপাশি পতিতালয়ের মাটিও ব্যবহার করা হয়। কোথাও এই মাটি প্রতিমা তৈরির মূল উপাদানের সঙ্গে মেশানো হয়, আবার কোথাও এই রীতির প্রতীকী গুরুত্ব ফুটিয়ে তোলা হয়।
যে সমাজ পতিতাদের নানা সময়ে অবহেলা ও বৈষম্যের নজরে দেখে, সেই সমাজের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসবের প্রতিমা তৈরিতে তাদের বসতির মাটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এর পেছনে রয়েছে প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককথা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির এক বহুল আলোচিত ব্যাখ্যা। তবে এই রীতির উৎস ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি নিয়ে প্রচলিত সব দাবির পক্ষে সমানভাবে জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই বিশ্বাসের দিকটি বিবেচনা করার পাশাপাশি ইতিহাস ও লোকাচারের পার্থক্য বুঝতে হবে।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, দুর্গার মূর্তি তৈরিতে গঙ্গার পলিমাটি, গোবর, গোমূত্র এবং নিষিদ্ধপল্লির মাটি ব্যবহার করা হয়। এই উপাদানগুলোর সঙ্গে সাধারণ মাটি মিশিয়ে প্রতিমা রূপ দেওয়া হয় বলে বর্ণনায় পাওয়া যায়। এছাড়া নর্তকী, কাপালিনী, গোয়ালিনী, মালিনী, পতিতা, ধোপানি, নাপিতনি, ব্রাহ্মণী ও শূদ্রাণীর ঘরের মাটির উল্লেখও কিছু প্রাচীন লোকাচারে রয়েছে।
বাংলার দুর্গা প্রতিমা গড়ার এই রীতি অনেক জায়গায় ‘পুণ্যমাটি’ বা ‘নিষিদ্ধপল্লির মাটি’ হিসেবে পরিচিত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতিমা নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে এই মাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রথা অনুযায়ী, এই মাটি জোর করে সংগ্রহ করার বা কিনে আনার কোনো সুযোগ নেই। পুরোহিত কিংবা প্রতিমাশিল্পী মন্ত্র উচ্চারণ করে যৌনপল্লির বাসিন্দাদের দ্বারে গিয়ে মাটি প্রার্থনা করেন। তাঁরা যখন স্বেচ্ছায় ও প্রসন্নচিত্তে তা দান করেন, কেবল তখনই তা সংগ্রহ করা হয়। তবে সব অঞ্চলে বা সব শিল্পীর ক্ষেত্রে এই নিয়ম হুবহু একভাবে পালিত হয় না। কোথাও সামান্য মাটি মূল মাটির সঙ্গে যুক্ত করা হয়, আবার কোথাও এই প্রথাটি কেবল প্রতীকীভাবে স্মরণ করা হয়।


























