আগস্টের শেষ দিকে রাঙামাটির কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে উভচর প্রাণী ও বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণে গিয়ে দেখা মিলল এক মনোমুগ্ধকর ও বিরল পাখির—পাকড়া ধনেশের (Pied Hornbill)। বৈজ্ঞানিক নাম Anthracoceros albirostris। বাংলাদেশের ধনেশ পরিবারের পাখিগুলো সাধারণত ঘন অরণ্যে বাস করে, তাই এদের দেখা পাওয়া অত্যন্ত বিরল ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
পাকড়া ধনেশ মাঝারি আকারের পাখি। এর মাথা, গলা ও দেহের বেশিরভাগ অংশ কালো, তবে বুক ও পেট উজ্জ্বল সাদা। বড় ও বাঁকানো ঠোঁটের ওপর ফাঁপা আকৃতির ক্যাস্প বা শিংয়ের মতো অংশ এদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পুরুষ ধনেশের ঠোঁট তুলনামূলক উজ্জ্বল ও বড় হয়, চোখের চারপাশ ফ্যাকাশে সাদা।
বাংলাদেশে এই প্রজাতির পাখি মূলত সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘন বনাঞ্চলে দেখা যায়। এরা উঁচু গাছের কোটরে ডিম পাড়ে এবং উপক্রান্তীয়-ক্রান্তীয় অরণ্যেই বসবাস করে। বনের ফল ও বীজ খেয়ে দূর-দূরান্তে বীজ ছড়িয়ে দেয়, ফলে বন পুনর্জন্ম লাভ করে। তাই ধনেশ পাখিকে ‘বনের কৃষক’ বা Farmer of the Forest বলা হয়।
এদের প্রজনন আচরণও ব্যতিক্রমী। স্ত্রী পাখি গাছের গহ্বরে ঢুকে বাইরে কাদা, ফলের আঁশ ও মল দিয়ে পথ বন্ধ করে দেয়, কেবল একটি সরু ফাঁক থাকে যার মাধ্যমে পুরুষ পাখি স্ত্রী ও ছানাদের খাবার দেয়। এই সময়ে স্ত্রী ও ছানারা গহ্বরের ভেতরেই নিরাপদে থাকে।
পৃথিবীতে মোট ৬২ প্রজাতির ধনেশ আছে, এর মধ্যে ৩২টি এশিয়ায়। বাংলাদেশে তিন প্রজাতির ধনেশ পাওয়া যায়—পাকড়া ধনেশ, রাজ ধনেশ (Buceros bicornis) ও পাতাঠুঁটি ধনেশ (Rhyticeros undulatus)। আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের তালিকা অনুযায়ী, পাকড়া ধনেশ ঝুঁকিমুক্ত হলেও দেশের প্রেক্ষাপটে এদের সংখ্যা সীমিত। রাজ ধনেশ সংকটাপন্ন এবং পাতাঠুঁটি ধনেশ অপ্রতুল তথ্যের আওতায় রয়েছে।
ধনেশ পাখির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হচ্ছে বন উজাড়, প্রজননের উপযুক্ত গাছের অভাব এবং ঠোঁট ও পালকের জন্য শিকার। তাই পুরনো ও বড় গাছ সংরক্ষণ, টেকসই বন ব্যবস্থাপনা, এবং কৃত্রিম বাসা স্থাপনের মাধ্যমে প্রজননে সহায়তা করা জরুরি।
বন বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় জনগণের যৌথ উদ্যোগে এই সুন্দর ও পরিবেশবান্ধব পাখিটিকে বাঁচানো সম্ভব। কারণ ধনেশ শুধু বনের সৌন্দর্যের প্রতীক নয়—এরা পুরো অরণ্যের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এক অপরিহার্য প্রাণী।
রিপোর্টারের নাম 




















