ঢাকা ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

ন্যায়বিচারের আশায় রোহিঙ্গারা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৪:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) আজ সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা ঐতিহাসিক গণহত্যা মামলার চূড়ান্ত শুনানি। দুই সপ্তাহব্যাপী এই শুনানিতে ন্যায়বিচারের পাশাপাশি নিজ জন্মভূমিতে সম্মান, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে ফিরে যাওয়ার আশায় তাকিয়ে আছেন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা। গাম্বিয়ার করা এই মামলার শুনানি চলবে তিন সপ্তাহ। তবে আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান এই বিচার প্রক্রিয়া থেকে বিশ্ববাসীর নজর সরাতে ফের কূটকৌশলের আশ্রয় নিতে শুরু করেছে ধুরন্ধর মিয়ানমার। সম্প্রতি কক্সবাজার ও বান্দরবানের মিয়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা এই প্রক্রিয়ারই অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা সূত্রগুলো বলছে, দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে বসতি গড়ে মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা নাগরিকরা। তবে সবচেয়ে বড় ঢলটি আসে ২০১৭ সালে। জান্তা সরকারের সেনাবাহিনীর গণহত্যার শিকার হন হাজার হাজার রোহিঙ্গা নাগরিকরা। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় তাদের ঘরবাড়ি-সম্পত্তি। টানা কয়েক মাস চলা ওই সহিংসতায় জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে অন্তত ১০ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক। উখিয়া-টেকনাফের শরণার্থী শিবির আর ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করছেন আশ্রিত রোহিঙ্গারা।

বিজ্ঞাপন

উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প-৩-এ বসবাসকারী রোহিঙ্গা তরুণ এনায়েত উল্লাহ জানান, ২০১৭ সালে পরিকল্পিতভাবে আমাদের ওপর গণহত্যা চালায় জান্তা সরকার। এটা এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ইউটিউব, গুগল, ফেসবুক আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এর অগণিত প্রমাণ আছে। গাম্বিয়ার মামলার মাধ্যমে আমরা সুষ্ঠু বিচার আশা করছি।

একই ক্যাম্পে বসবাস করা বৃদ্ধ ফরিদ উল্লাহ জানান, বিচার শেষ হলে আমরা বাংলাদেশ ছেড়ে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরতে চাই। কিন্তু অধিকার, নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব নিয়ে নিজ দেশে ফিরতে চাই আমরা।

৪ নম্বর ক্যাম্পে বসবাস করা রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ করিম জানান, বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আগের সরকার আমাদের সমস্যা ইস্যু করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করেছে। সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেনি। গণহত্যার প্রমাণ মিয়ানমারের পর বাংলাদেশের কাছে সবচেয়ে বেশি আছে। বাংলাদেশেরই উচিত ছিল আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার অংশীদার হওয়া। কিন্তু মামলা করেছে গাম্বিয়া। গাম্বিয়াকে তথ্য প্রমাণ দিয়ে সহযোগিতা করলে অনেক আগেই মামলার অগ্রগতি আরো জোরদার হতো। তারপরও অন্তর্বর্তী সরকার দক্ষতার সঙ্গে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে গাম্বিয়াকে সহযোগিতা করবে বলে আশা করি।

শুধু এনায়েত, ফরিদ কিংবা করিমই নন, কুতুপালং ও ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গার প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার অভিযোগে বিচার হবে মিয়ানমার সরকারের। আর পূর্ণ মর্যাদা নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যাবেন তারা।

মামলায় গাম্বিয়াকে সহযোগিতা করেনি বাংলাদেশ

২০১৯ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে গাম্বিয়া। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে সহযোগিতা করতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদনও জানায় দেশটি। কিন্তু তখনকার ফ্যাসিস্ট সরকার মুখে অনেক কথা বললেও বাস্তবে গাম্বিয়ার সঙ্গে কোনো সমন্বয় করেনি।

আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ সরাসরি মামলার পক্ষভুক্ত না হলেও ভুক্তভোগী রাষ্ট্র হিসেবে গাম্বিয়ার মামলাকে শক্তিশালী করতে আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারত। মামলার প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যাশিত মাত্রায় রাষ্ট্র হিসেবে যুক্ত হওয়া, তথ্যপ্রমাণ ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল অনেকটাই নীরব।

রোহিঙ্গা সংকট ও সমাধান নিয়ে কাজ করা গবেষক নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. ছালেহ শাহরিয়ার জানান, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকার শুরু থেকেই রোহিঙ্গা ইস্যুকে চালাকি দিয়ে মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছে। এর দুটি উদ্দেশ্য দৃশ্যমান ছিল, একটি হলো বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয় দিয়ে নোবেল পুরস্কার হাতিয়ে নেওয়া। অন্যটি রোহিঙ্গা ইস্যুকে পুঁজি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক অনুদান নয়ছয় করে লুটপাটের আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনার আর তা হলো রোহিঙ্গা ইস্যুকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক মহলের নজরে থাকা। আর এই কারণেই সংকটের সমাধান তিনি চাননি। ভুক্তভোগী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক আদালতে যেখানে বাংলাদেশ নিজেই মামলা করতে পারত সেখানে গাম্বিয়াকে ঠিকমতো সহযোগিতাও করেনি। আর এসব কারণেই মামলাটি দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়েছে।

সবচেয়ে হতাশার কথাটি হলো বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও এই ইস্যুতে মনোযোগী নয়। গত বছর প্রধান উপদেষ্টা লাখো রোহিঙ্গার সামনে জাতিসংঘ মহাসচিবকে পাশে রেখে বলে এসেছিলেন এক বছরের মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরু হবে। কিন্তু তার পর থেকে সরকারের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গাম্বিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তারা শুরু থেকেই বলছেন, মিয়ানমার কেন গণহত্যার জন্য দায়ী এবং কেন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে আমরা তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করব। এর পক্ষে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ ইতোমধ্যে সংগ্রহ করার দাবি জানিয়েছে দেশটি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিজের রায় যদি ইতিবাচক হয় অর্থাৎ মামলায় যদি গাম্বিয়া জয়ী হয় তবে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বহুগুণে বাড়াবে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় নতুন গতি আনবে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, গাম্বিয়ার মামলাটি এখন চূড়ান্ত শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। ১২ জানুয়ারি থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শুনানি চলবে। ভুক্তভোগী বা ইন্টারেস্টেড রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মামলাটির ওপর নজর রাখছে। যতটুকু জানা গেছে, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ সরবরাহ করতে পেরেছে গাম্বিয়া। রায়ে সম্ভবত রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে বলে শোনা যাচ্ছে। এটা যদি সত্যি হয় তবে একদিকে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নৈতিকভাবে দুর্বল হবে, অন্যদিকে রোহিঙ্গারা আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে। এতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা বাংলাদেশের পক্ষে সুবিধা হবে। সবমিলিয়ে আমরা এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের দিকে তাকিয়ে আছি।

রোহিঙ্গা কমিউনিটির নেতা আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের জানান, আদালতে শুনানির খবরে আমরা খুশি। এর আগেও দুটি শুনানি হয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টেও গণহত্যার বিষয়টি উঠে এসেছে। এবার তৃতীয়বারের মতো ও চূড়ান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এটাও রোহিঙ্গাদের পক্ষে যাবে বলেই আমাদের ধারণা কিন্তু মিয়ানমারে ভারত ও চীনের সরাসরি স্বার্থ রয়েছে। তাই বড় শক্তিগুলোর নীরবতা আর বাংলাদেশের সীমিত ভূমিকা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। যদি শুরু থেকেই পূর্ণ সহযোগিতা আর আন্তরিকতা থাকত, মামলা আরো শক্ত হতো।

সীমান্তে উত্তেজনা চক্রান্তের অংশ

এক সপ্তাহ ধরে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তে। ওপার থেকে ছোড়া গুলির আঘাতে হতাহত হয়েছে কয়েকজন বাংলাদেশি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকার স্থানীয়রা ও শরণার্থী শিবিরে বসবাস করা রোহিঙ্গাদের মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা ছড়ানো হতে পারে সীমান্তে।

মিয়ানমারে বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত সাবেক কূটনীতিক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো প্রভাব পড়বে না। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়বে। আর এতে বিচলিত হয়ে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করবে। ওপারে সংঘাত বাড়লে নিশ্চিতভাবে তার কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে। দুই পক্ষের সহিংসতায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল পক্ষ বাংলাদেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করবে। আর এমনটা হলে বাংলাদেশেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে। তাই সময় থাকতে সীমান্তে বিজিবির শক্তি বৃদ্ধি করার পাশাপাশি সীমান্তকেন্দ্রিক গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে বাংলাদেশকে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঝিনাইদহে বাড়ি নির্মাণের জন্য মাটি খুঁড়তেই মিলল দুটি হ্যান্ড গ্রেনেড

ন্যায়বিচারের আশায় রোহিঙ্গারা

আপডেট সময় : ০৯:৩৪:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) আজ সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা ঐতিহাসিক গণহত্যা মামলার চূড়ান্ত শুনানি। দুই সপ্তাহব্যাপী এই শুনানিতে ন্যায়বিচারের পাশাপাশি নিজ জন্মভূমিতে সম্মান, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে ফিরে যাওয়ার আশায় তাকিয়ে আছেন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা। গাম্বিয়ার করা এই মামলার শুনানি চলবে তিন সপ্তাহ। তবে আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান এই বিচার প্রক্রিয়া থেকে বিশ্ববাসীর নজর সরাতে ফের কূটকৌশলের আশ্রয় নিতে শুরু করেছে ধুরন্ধর মিয়ানমার। সম্প্রতি কক্সবাজার ও বান্দরবানের মিয়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা এই প্রক্রিয়ারই অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা সূত্রগুলো বলছে, দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে বসতি গড়ে মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা নাগরিকরা। তবে সবচেয়ে বড় ঢলটি আসে ২০১৭ সালে। জান্তা সরকারের সেনাবাহিনীর গণহত্যার শিকার হন হাজার হাজার রোহিঙ্গা নাগরিকরা। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় তাদের ঘরবাড়ি-সম্পত্তি। টানা কয়েক মাস চলা ওই সহিংসতায় জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে অন্তত ১০ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক। উখিয়া-টেকনাফের শরণার্থী শিবির আর ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করছেন আশ্রিত রোহিঙ্গারা।

বিজ্ঞাপন

উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প-৩-এ বসবাসকারী রোহিঙ্গা তরুণ এনায়েত উল্লাহ জানান, ২০১৭ সালে পরিকল্পিতভাবে আমাদের ওপর গণহত্যা চালায় জান্তা সরকার। এটা এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ইউটিউব, গুগল, ফেসবুক আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এর অগণিত প্রমাণ আছে। গাম্বিয়ার মামলার মাধ্যমে আমরা সুষ্ঠু বিচার আশা করছি।

একই ক্যাম্পে বসবাস করা বৃদ্ধ ফরিদ উল্লাহ জানান, বিচার শেষ হলে আমরা বাংলাদেশ ছেড়ে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরতে চাই। কিন্তু অধিকার, নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব নিয়ে নিজ দেশে ফিরতে চাই আমরা।

৪ নম্বর ক্যাম্পে বসবাস করা রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ করিম জানান, বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আগের সরকার আমাদের সমস্যা ইস্যু করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করেছে। সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেনি। গণহত্যার প্রমাণ মিয়ানমারের পর বাংলাদেশের কাছে সবচেয়ে বেশি আছে। বাংলাদেশেরই উচিত ছিল আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার অংশীদার হওয়া। কিন্তু মামলা করেছে গাম্বিয়া। গাম্বিয়াকে তথ্য প্রমাণ দিয়ে সহযোগিতা করলে অনেক আগেই মামলার অগ্রগতি আরো জোরদার হতো। তারপরও অন্তর্বর্তী সরকার দক্ষতার সঙ্গে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে গাম্বিয়াকে সহযোগিতা করবে বলে আশা করি।

শুধু এনায়েত, ফরিদ কিংবা করিমই নন, কুতুপালং ও ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গার প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার অভিযোগে বিচার হবে মিয়ানমার সরকারের। আর পূর্ণ মর্যাদা নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যাবেন তারা।

মামলায় গাম্বিয়াকে সহযোগিতা করেনি বাংলাদেশ

২০১৯ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে গাম্বিয়া। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে সহযোগিতা করতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদনও জানায় দেশটি। কিন্তু তখনকার ফ্যাসিস্ট সরকার মুখে অনেক কথা বললেও বাস্তবে গাম্বিয়ার সঙ্গে কোনো সমন্বয় করেনি।

আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ সরাসরি মামলার পক্ষভুক্ত না হলেও ভুক্তভোগী রাষ্ট্র হিসেবে গাম্বিয়ার মামলাকে শক্তিশালী করতে আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারত। মামলার প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যাশিত মাত্রায় রাষ্ট্র হিসেবে যুক্ত হওয়া, তথ্যপ্রমাণ ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল অনেকটাই নীরব।

রোহিঙ্গা সংকট ও সমাধান নিয়ে কাজ করা গবেষক নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. ছালেহ শাহরিয়ার জানান, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকার শুরু থেকেই রোহিঙ্গা ইস্যুকে চালাকি দিয়ে মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছে। এর দুটি উদ্দেশ্য দৃশ্যমান ছিল, একটি হলো বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয় দিয়ে নোবেল পুরস্কার হাতিয়ে নেওয়া। অন্যটি রোহিঙ্গা ইস্যুকে পুঁজি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক অনুদান নয়ছয় করে লুটপাটের আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনার আর তা হলো রোহিঙ্গা ইস্যুকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক মহলের নজরে থাকা। আর এই কারণেই সংকটের সমাধান তিনি চাননি। ভুক্তভোগী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক আদালতে যেখানে বাংলাদেশ নিজেই মামলা করতে পারত সেখানে গাম্বিয়াকে ঠিকমতো সহযোগিতাও করেনি। আর এসব কারণেই মামলাটি দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়েছে।

সবচেয়ে হতাশার কথাটি হলো বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও এই ইস্যুতে মনোযোগী নয়। গত বছর প্রধান উপদেষ্টা লাখো রোহিঙ্গার সামনে জাতিসংঘ মহাসচিবকে পাশে রেখে বলে এসেছিলেন এক বছরের মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরু হবে। কিন্তু তার পর থেকে সরকারের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গাম্বিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তারা শুরু থেকেই বলছেন, মিয়ানমার কেন গণহত্যার জন্য দায়ী এবং কেন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে আমরা তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করব। এর পক্ষে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ ইতোমধ্যে সংগ্রহ করার দাবি জানিয়েছে দেশটি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিজের রায় যদি ইতিবাচক হয় অর্থাৎ মামলায় যদি গাম্বিয়া জয়ী হয় তবে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বহুগুণে বাড়াবে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় নতুন গতি আনবে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, গাম্বিয়ার মামলাটি এখন চূড়ান্ত শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। ১২ জানুয়ারি থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শুনানি চলবে। ভুক্তভোগী বা ইন্টারেস্টেড রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মামলাটির ওপর নজর রাখছে। যতটুকু জানা গেছে, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ সরবরাহ করতে পেরেছে গাম্বিয়া। রায়ে সম্ভবত রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে বলে শোনা যাচ্ছে। এটা যদি সত্যি হয় তবে একদিকে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নৈতিকভাবে দুর্বল হবে, অন্যদিকে রোহিঙ্গারা আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে। এতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা বাংলাদেশের পক্ষে সুবিধা হবে। সবমিলিয়ে আমরা এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের দিকে তাকিয়ে আছি।

রোহিঙ্গা কমিউনিটির নেতা আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের জানান, আদালতে শুনানির খবরে আমরা খুশি। এর আগেও দুটি শুনানি হয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টেও গণহত্যার বিষয়টি উঠে এসেছে। এবার তৃতীয়বারের মতো ও চূড়ান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এটাও রোহিঙ্গাদের পক্ষে যাবে বলেই আমাদের ধারণা কিন্তু মিয়ানমারে ভারত ও চীনের সরাসরি স্বার্থ রয়েছে। তাই বড় শক্তিগুলোর নীরবতা আর বাংলাদেশের সীমিত ভূমিকা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। যদি শুরু থেকেই পূর্ণ সহযোগিতা আর আন্তরিকতা থাকত, মামলা আরো শক্ত হতো।

সীমান্তে উত্তেজনা চক্রান্তের অংশ

এক সপ্তাহ ধরে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তে। ওপার থেকে ছোড়া গুলির আঘাতে হতাহত হয়েছে কয়েকজন বাংলাদেশি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকার স্থানীয়রা ও শরণার্থী শিবিরে বসবাস করা রোহিঙ্গাদের মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা ছড়ানো হতে পারে সীমান্তে।

মিয়ানমারে বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত সাবেক কূটনীতিক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো প্রভাব পড়বে না। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়বে। আর এতে বিচলিত হয়ে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করবে। ওপারে সংঘাত বাড়লে নিশ্চিতভাবে তার কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে। দুই পক্ষের সহিংসতায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল পক্ষ বাংলাদেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করবে। আর এমনটা হলে বাংলাদেশেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে। তাই সময় থাকতে সীমান্তে বিজিবির শক্তি বৃদ্ধি করার পাশাপাশি সীমান্তকেন্দ্রিক গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে বাংলাদেশকে।