কয়েক বছরের দীর্ঘ অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী রূপান্তরের পর, বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খাতে এখন নতুন প্রাণের স্পন্দন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে ‘অপেক্ষা করো ও দেখো’ নীতির অবসান ঘটতে শুরু করেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিরতা ফিরবে, যা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করবে।
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য-উপাত্ত বলছে, সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি সূচক ইতিমধ্যে স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয়ে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে; ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ব্যাংকিং চ্যানেলে ৩২.৮২ বিলিয়ন ডলার দেশে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। এই শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর ভর করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও স্বস্তি ফিরেছে। বর্তমানে আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী নিট রিজার্ভ ২৭.৮৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। যদিও শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি কম হওয়ায় ডলারের সাশ্রয় হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পায়নের জন্য কিছুটা উদ্বেগের, তবুও মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা কমায় আমদানিকারকদের এলসি খোলার খরচ কিছুটা কমেছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতের সংস্কার ও সামষ্টিক অর্থনীতির বিপর্যয় ঠেকাতে সফল হয়েছে, তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ডিসেম্বর মাসের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) সূচক ৫৪.২-এ উন্নীত হওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে কৃষি ও সেবা খাতের হাত ধরে অর্থনীতি সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে নির্মাণ খাতে এখনো কিছুটা সংকোচন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা এখন একটি টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অপেক্ষায় আছেন, কারণ ব্যবসায়িক রিটার্ন আসতে সাধারণত ৫-৭ বছর সময় লাগে।
তবে এই ইতিবাচকু অগ্রগতির বিপরীতে নতুন সরকারের জন্য বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জও অপেক্ষা করছে। টানা পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি আয় কমছে এবং ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে মন্দা শিল্পায়নের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ এবং বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, নির্বাচনের পর আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন, ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই হবে নতুন সরকারের প্রধান কাজ। সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত ও আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 

























