বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে আলোচিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ২০২৬ সালের মধ্যেই চূড়ান্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ সরকার। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চলমান এই আলোচনা বর্তমানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী। সম্প্রতি কুয়ালালামপুরে নিজ দপ্তরে সংবাদমাধ্যম বারনামাকে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে হাইকমিশনার এই আশাবাদের কথা ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া এফটিএ নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা কয়েক বছর আগে শুরু হলেও ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ঢাকা সফরের পর তা এক নতুন ও শক্তিশালী গতি লাভ করেছে। ইতিমধ্যে উভয় দেশ চুক্তির প্রধান শর্তাবলি ও সামগ্রিক কাঠামোর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।
হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী বলেন, আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব এই এফটিএ প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করা। যদিও এ ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো অত্যন্ত জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট কারিগরি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তবুও উভয় দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ফলে এই আলোচনায় নিরবচ্ছিন্ন অগ্রগতি হবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। বাণিজ্যের প্রসারের পাশাপাশি বাংলাদেশ বর্তমানে মালয়েশিয়ার সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে বিশেষভাবে আগ্রহী। বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ায় অধ্যয়ন করছেন, যা দেশটিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসে পরিণত করেছে বাংলাদেশকে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশি শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরাও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন।
হাইকমিশনার আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, অনেক সময় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কেবল মানবসম্পদ বা শ্রমিক সরবরাহের সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করে দেখানো হয়, যা প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, বাংলাদেশ এই একতরফা ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য, দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ, শিক্ষা এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। তবে মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের সার্বিক কল্যাণ ও নিরাপত্তার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের কাছে সবসময়ই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে এবং এ বিষয়ে মালয়েশিয়ান সরকারের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় বজায় রাখা হবে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ৫৪ বছরে পদার্পণের প্রাক্কালে এই মৈত্রী আরও গভীর ও অর্থবহ হবে বলে তিনি আশা করেন।
গত দুই বছরে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগ অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বাংলাদেশ সফর এবং ২০২৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশের সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালয়েশিয়া সফর দুই দেশের বন্ধুত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। হাইকমিশনারের মতে, বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে রাজনৈতিক শক্তিই ক্ষমতায় আসুক না কেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্বের এই ধারাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অব্যাহত থাকবে। উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৩.৩৫ বিলিয়ন রিঙ্গিত (প্রায় ২.৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা আগের বছরের তুলনায় ৫.১ শতাংশ বেশি। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ বর্তমানে মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে স্বীকৃত, যেখানে দুই দেশের আমদানি-রফতানি পণ্যতালিকায় পেট্রোলিয়াম, পাম অয়েল, তৈরি পোশাক ও রাসায়নিক দ্রব্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী রয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 






















