ঢাকা ১২:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

আগ্রাসন মোকাবিলায় খামেনির আগাম প্রস্তুতি: ক্ষমতার কেন্দ্রে লারিজানি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্ভাব্য হামলা এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা ঘিরে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ চলছে। তবে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন ইঙ্গিত দিচ্ছে, এমন যেকোনো সংকট মোকাবিলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আগেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রস্তুত করে রেখেছেন। এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তার শীর্ষ নেতা আলি লারিজানি, যাকে সম্ভাব্য আগ্রাসনকালে রাষ্ট্র পরিচালনা ও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

৬৭ বছর বয়সী লারিজানি ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সাবেক কমান্ডার এবং দীর্ঘদিন পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইরানের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও গার্ড সদস্যদের মতে, আয়াতুল্লাহ খামেনি লারিজানি এবং তার মুষ্টিমেয় ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগীদের নির্দেশ দিয়েছেন আমেরিকান ও ইসরাইলি বোমা হামলা থেকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে রক্ষার জন্য।

সরকারের ঘনিষ্ঠ এক রক্ষণশীল বিশ্লেষক নাসের ইমানি জানান, আয়াতুল্লাহ খামেনির সঙ্গে জনাব লারিজানির দীর্ঘ ও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তীব্র সামরিক ও নিরাপত্তা সংকটের মুহূর্তে সর্বোচ্চ নেতা তার ওপরই আস্থা রাখছেন। ইমানি আরও বলেন, লারিজানির রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং গভীর জ্ঞানের কারণে সর্বোচ্চ নেতা তাকে এই সংবেদনশীল পরিস্থিতির জন্য উপযুক্ত মনে করেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদন এবং বাস্তবসম্মত পরামর্শের জন্য তিনি লারিজানির ওপরই নির্ভর করেন এবং যুদ্ধের সময় তার ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে খামেনি তার বিশ্বস্ত সহযোগী লারিজানির ওপর ভরসা করেন। এরপর থেকেই নিরাপত্তা, কূটনীতি ও কৌশলগত বিষয়ে লারিজানির প্রভাব ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ইসলামি শাসনব্যবস্থার অবসানের দাবিতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমনেও তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একপ্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। পেশায় হৃদরোগ সার্জন থেকে রাজনীতিতে আসা পেজেশকিয়ান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অর্থনৈতিক সংকট, বিক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক চাপসহ নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, নীতিনির্ধারণী বহু বিষয়ে তাকে লারিজানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এমনকি ইন্টারনেট বিধিনিষেধ শিথিলের মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও লারিজানির অনুমোদনের প্রয়োজন হয়েছে বলে জানা গেছে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও লারিজানি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে পরামর্শ করতে মস্কো সফর করেছেন। পাশাপাশি কাতার ও ওমানের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা তদারকিতেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। চলতি মাসে দোহা সফরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না। তবে যুদ্ধ চাপিয়ে দিলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। গত কয়েক মাসে আমরা দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রস্তুতি নিয়েছি।’

আরও জানা গেছে, খামেনি সামরিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর জন্য চার স্তরের উত্তরসূরি নির্ধারণ করে রেখেছেন। সম্ভাব্য গুপ্তহত্যা বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে বিশেষ ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। গত জুনে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের সময় আত্মগোপনে থাকা খামেনি সম্ভাব্য তিন উত্তরসূরির নাম ঠিক করেছিলেন, যদিও তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শীর্ষ শিয়া ধর্মীয় নেতা না হওয়ায় লারিজানি সর্বোচ্চ নেতার পদে সম্ভাব্য প্রার্থী নন।

খামেনির ঘনিষ্ঠ বলয়ে লারিজানি ছাড়াও রয়েছেন তার সামরিক উপদেষ্টা ইয়াহিয়া রাহিম সাফাভি, বর্তমান পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং চিফ অব স্টাফ আলি আসগর হেজাজি। যুদ্ধকালীন সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে কালিবাফকে ‘ডেপুটি’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায়ও লারিজানির প্রভাবের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। জানুয়ারির বিক্ষোভ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান নিজেকে অনভিজ্ঞ বলে উল্লেখ করে লারিজানির সঙ্গে পরামর্শের কথা বলেন।

সব মিলিয়ে, আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সম্ভাব্য সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানে ক্ষমতার ভারসাম্যে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রপ্রধান হলেও, সংকট মোকাবিলায় কার্যত লারিজানিই এখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দোকানে দোকানে ঈদ পোশাকের রঙিন পসরা, জমে উঠছে কেনাকাটা

আগ্রাসন মোকাবিলায় খামেনির আগাম প্রস্তুতি: ক্ষমতার কেন্দ্রে লারিজানি

আপডেট সময় : ১০:৪০:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্ভাব্য হামলা এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা ঘিরে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ চলছে। তবে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন ইঙ্গিত দিচ্ছে, এমন যেকোনো সংকট মোকাবিলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আগেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রস্তুত করে রেখেছেন। এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তার শীর্ষ নেতা আলি লারিজানি, যাকে সম্ভাব্য আগ্রাসনকালে রাষ্ট্র পরিচালনা ও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

৬৭ বছর বয়সী লারিজানি ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সাবেক কমান্ডার এবং দীর্ঘদিন পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইরানের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও গার্ড সদস্যদের মতে, আয়াতুল্লাহ খামেনি লারিজানি এবং তার মুষ্টিমেয় ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগীদের নির্দেশ দিয়েছেন আমেরিকান ও ইসরাইলি বোমা হামলা থেকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে রক্ষার জন্য।

সরকারের ঘনিষ্ঠ এক রক্ষণশীল বিশ্লেষক নাসের ইমানি জানান, আয়াতুল্লাহ খামেনির সঙ্গে জনাব লারিজানির দীর্ঘ ও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তীব্র সামরিক ও নিরাপত্তা সংকটের মুহূর্তে সর্বোচ্চ নেতা তার ওপরই আস্থা রাখছেন। ইমানি আরও বলেন, লারিজানির রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং গভীর জ্ঞানের কারণে সর্বোচ্চ নেতা তাকে এই সংবেদনশীল পরিস্থিতির জন্য উপযুক্ত মনে করেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদন এবং বাস্তবসম্মত পরামর্শের জন্য তিনি লারিজানির ওপরই নির্ভর করেন এবং যুদ্ধের সময় তার ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে খামেনি তার বিশ্বস্ত সহযোগী লারিজানির ওপর ভরসা করেন। এরপর থেকেই নিরাপত্তা, কূটনীতি ও কৌশলগত বিষয়ে লারিজানির প্রভাব ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ইসলামি শাসনব্যবস্থার অবসানের দাবিতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমনেও তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একপ্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। পেশায় হৃদরোগ সার্জন থেকে রাজনীতিতে আসা পেজেশকিয়ান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অর্থনৈতিক সংকট, বিক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক চাপসহ নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, নীতিনির্ধারণী বহু বিষয়ে তাকে লারিজানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এমনকি ইন্টারনেট বিধিনিষেধ শিথিলের মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও লারিজানির অনুমোদনের প্রয়োজন হয়েছে বলে জানা গেছে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও লারিজানি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে পরামর্শ করতে মস্কো সফর করেছেন। পাশাপাশি কাতার ও ওমানের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা তদারকিতেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। চলতি মাসে দোহা সফরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না। তবে যুদ্ধ চাপিয়ে দিলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। গত কয়েক মাসে আমরা দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রস্তুতি নিয়েছি।’

আরও জানা গেছে, খামেনি সামরিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর জন্য চার স্তরের উত্তরসূরি নির্ধারণ করে রেখেছেন। সম্ভাব্য গুপ্তহত্যা বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে বিশেষ ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। গত জুনে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের সময় আত্মগোপনে থাকা খামেনি সম্ভাব্য তিন উত্তরসূরির নাম ঠিক করেছিলেন, যদিও তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শীর্ষ শিয়া ধর্মীয় নেতা না হওয়ায় লারিজানি সর্বোচ্চ নেতার পদে সম্ভাব্য প্রার্থী নন।

খামেনির ঘনিষ্ঠ বলয়ে লারিজানি ছাড়াও রয়েছেন তার সামরিক উপদেষ্টা ইয়াহিয়া রাহিম সাফাভি, বর্তমান পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং চিফ অব স্টাফ আলি আসগর হেজাজি। যুদ্ধকালীন সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে কালিবাফকে ‘ডেপুটি’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায়ও লারিজানির প্রভাবের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। জানুয়ারির বিক্ষোভ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান নিজেকে অনভিজ্ঞ বলে উল্লেখ করে লারিজানির সঙ্গে পরামর্শের কথা বলেন।

সব মিলিয়ে, আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সম্ভাব্য সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানে ক্ষমতার ভারসাম্যে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রপ্রধান হলেও, সংকট মোকাবিলায় কার্যত লারিজানিই এখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।