২০১২ সালের ৮ এপ্রিল। চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে তখন এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের উপর চলছিল অকথ্য নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ। হাট-বাজার, পথ-ঘাট কোথাও নিরাপদ ছিল না সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে, সন্দ্বীপ পৌরসভার সাবেক কমিশনার ও কৃষকদল নেতা মো. কাউছার যখন আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন এবং দলীয় কর্মীদের উপর অত্যাচার বন্ধের আকুতি জানান, তখন তা তাদের কানে পৌঁছায়নি। উল্টো, ওই দিন নাজিরপুর বাজারে যুবলীগ সন্ত্রাসী জাফর উল্লাহ টিটু প্রকাশ্য দিবালোকে কাউছারকে তুলে নিয়ে যায়। পরে একটি পুকুর পাড়ে নিয়ে তাকে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করে। শুধু তাই নয়, সন্ত্রাসীরা রামদা দিয়ে কুপিয়ে কাউছারের দুটি পাও বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে মো. কাউছার একটি পা হারিয়ে পঙ্গু জীবন যাপন করছেন। তার অন্য পাটিও প্রায় অচল, যা স্বাভাবিক চলাফেরায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। গলায় খাবার গিলতে এবং কথা বলতেও তার প্রচণ্ড কষ্ট হয়। এমন নৃশংস ঘটনার পরও, মামলার আসামীরা আওয়ামী লীগ এমপির মন্ত্রীদের সুপারিশে আদালত থেকে মুক্তি পেয়ে যায়। ন্যায়বিচারের আশায়, রোববার নগরীর পলোগ্রাউন্ড মাঠে আসেন কাউছার। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি তারেক রহমানের কাছে এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে এসেছেন।
কাউছার বলেন, “স্বৈরাচারের মামলা, জেল, জুলুমে আমার জীবন-যৌবন শেষ হয়ে গেছে। দুটি পা হারিয়েছি। ২০১২ সাল থেকে আমি কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। একটি পা কেটে ফেলা হয়েছে, অন্যটিও প্রায় অচল। স্ট্রেচারে ভর দিতেও আমার কষ্ট হয়। কবে বিচার পাব, তা আমি জানি না। যতটুকু জানি, আমাকে হত্যা করতে চাওয়া যুবলীগের সন্ত্রাসী ও সন্দ্বীপ পৌরসভার সাবেক মেয়র জাফর উল্লাহ টিটু এখনও চট্টগ্রাম শহরেই লুকিয়ে আছে।”
শুধু কাউছার নন, রোববার তারেক রহমানের কাছে বিচার চাইতে আসা প্রায় ৩০টি পরিবারে একই রকম হাহাকার। এদের অনেকেই হারিয়েছেন ভাই, সন্তান, স্বামী বা বাবাকে। শহীদ তানভীর সিদ্দিকীর পিতাও তাদের মধ্যে একজন। তিনি সন্তানের হত্যার বিচার ছাড়া আর কিছুই চান না।
শহীদ পরিবার এবং পঙ্গুত্ব বরণ করা নেতাকর্মীদের একটাই দাবি, বাংলাদেশে যেন আর কোনোদিন এমন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ফিরে না আসে। তারা সেই অন্ধকার, জাহেলিয়াতের যুগ আর দেখতে চান না। পাশাপাশি, যারা বিনা অপরাধে তাদের উপর নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের শরীরের অঙ্গ কেটে নিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান তারা।
তানভীর সিদ্দিকীর বাবা বাদশা মিয়া বলেন, “গত ২৪ জুলাই আমার ছেলে ছাত্রলীগ ও পুলিশের হাতে শহীদ হন। রোববার তারেক রহমানকে বিচার দিতে গ্রামের বাড়ি কক্সবাজারের কালারমারছড়া থেকে এই জনসভায় এসেছি। স্বৈরাচারী সরকারের পতনের দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও, আমার মামলার ৩৫ জন আসামির একজনও এখনো ধরা পড়েনি। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। তারেক রহমানের কাছে আমার দাবি, তিনি যেন আমার ছেলে হত্যার বিচার করে দেন।”
২০১৪ সালের ৮ অক্টোবর, চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আদিল মাহমুদ চৌধুরীকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সন্ত্রাসীরা। রোববার ভোরে ভাইয়ের ছবি হাতে নিয়ে মিরসরাই থেকে তার দুই ভাই তারেক রহমানের জনসভায় আসেন হত্যাকারীদের বিচার চাইতে। আদিলের ভাই আদনান উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “১৭ বছরে আমরা মানসিকভাবে এবং আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে গেছি। আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে ভাই হত্যার বিচারের জন্য?”
একইভাবে, ২০১০ সালে গুমের শিকার বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম বাচার ভাই হামিদুল হক মান্নানও গতকাল রোববার ভোরে পলোগ্রাউন্ড মাঠে এসে তারেক রহমানের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন। ভাইকে গুমের বিচার চাইতে তিনি জনসভায় এসেছেন বলে জানান।
সুদূর কক্সবাজার থেকে আসা ছাত্রদল নেতা আবিদুর রহমানের পিতা লুৎফুর রহমান জানান, ২০১১ সালে চমেক হাসপাতালের হোস্টেলে তার ছেলে আবিদুরকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা নির্মমভাবে হত্যা করে। তার অপরাধ ছিল, সে চমেক ছাত্রদলের কমিটিতে সদস্য ছিল। তিনি বলেন, “খুনিরা চমেকসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা পেশায় আছেন। কেউ স্কলার নিয়ে বিদেশে আছেন। খুনিরা কখনও চিকিৎসক হতে পারে না। তারা এই পেশাকে কলঙ্কিত করছে। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।”
রিপোর্টারের নাম 























