ঢাকা ০২:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬

গাইবান্ধায় অবৈধ ইটভাটার কবলে পাঁচ গ্রাম, জনজীবন দুর্বিষহ

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় নিয়মনীতি উপেক্ষা করে যত্রতত্র গড়ে ওঠা অবৈধ ইটভাটাগুলো জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। লোকালয় ও আবাদি জমির মাঝে নির্মিত এসব ভাটার কালো ধোঁয়া পরিবেশের মারাত্মক দূষণ ঘটাচ্ছে এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করছে। প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে এসব অবৈধ ভাটার কার্যক্রম দিন দিন বেড়েই চলেছে।

উপজেলার কাঠালতলী এলাকায় পাশাপাশি দুটি অবৈধ ইটভাটার বিরূপ প্রভাবে পাঁচটি গ্রামের মানুষ নানা সমস্যায় জর্জরিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাটাগুলোতে মাটি বহনের জন্য দিন-রাত অন্তত ৩০টি ট্রাক্টর ও শ্যালোমেশিন চালিত পাওয়ার ট্রলি চলাচল করে। অতিরিক্ত ভারের কারণে গ্রামের রাস্তাঘাট ভেঙেচুরে যাচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, ভাটাগুলো তাদের জমির উর্বর টপসয়েল কেটে নিয়ে যাচ্ছে, যা ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সতীতলা, কাঠালতলী, বড়াইকান্দী, নশিড়ারপাড়া এবং গড়গড়িয়া গ্রামগুলোর ঘনবসতি ও আবাদি জমির মাঝে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইটভাটাগুলো স্থাপন করা হয়েছে। কাঠালতলী এলাকার স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা ইনছার মুহুরীর এমএসবি ব্রিকস এবং বুলু মেম্বারের টিএবি ব্রিকস নামের দুটি ভাটা বিশেষভাবে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। সতীতলা গ্রামের বাসিন্দা মোতালেব হোসেন জানান, এই ভাটাগুলোর কারণে আবাদি জমি শেষ হয়ে যাচ্ছে, রাস্তাঘাট ভেঙে যাচ্ছে এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। নশিড়ারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আলতাব হোসেন বলেন, ভাটাগুলোর কারণে এলাকায় শান্তিতে বসবাস করা যাচ্ছে না। ওসমানপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম প্রশ্ন তোলেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মাঝে কীভাবে এসব ইটভাটা চলতে পারে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ইরি-বোরো ফসলের জমিতেই পাশাপাশি ইটভাটাগুলো গড়ে উঠেছে। এছাড়াও, উপজেলার শ্যামপুরের চোরকাটা, পদুমশহর, হাফানিয়া ও তেনাচিরা বিলে নতুন করে আরও সাতটি ইটভাটা আবাদি জমির মাঝে গড়ে উঠছে। ১৯৮৯ সালের ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন (সংশোধিত-২০১৩) অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চল, আবাদি জমি ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন এবং ইট পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু আইন অমান্য করে এসব স্থানে প্রকাশ্যে ইট পোড়ানো হচ্ছে। এগুলোর কোনোটিরই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। টিএবি ব্রিকস ইটভাটার মালিক ইনছার মহুরি স্বীকার করেছেন যে, ছাড়পত্র না থাকায় স্থানীয় প্রশাসনকে “ম্যানেজ” করেই ভাটা চালাচ্ছেন।

ইট পোড়ানোর ধোঁয়া, গ্যাস ও ধুলাবালির কারণে ক্ষেতের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। ভন্নতের মোড়ের রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী সোলায়মান আলী জানান, ইটভাটার কারণে ভালো সড়কটিও দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের লোকজন আরও জানান, এই এলাকায় গাছে তেমন ফল ধরে না এবং নানা সমস্যা লেগেই আছে। কৃষকরা উদ্বিগ্ন যে, ইটভাটার কারণে তাদের জমিতে ফসল উৎপাদন কম হচ্ছে।

এ বিষয়ে সাঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আসাদুজ্জামান বলেন, আবাদি জমির মাঝখানে ইটভাটা থাকার কারণে বোরোসহ বিভিন্ন ফসলের ফলন দিন দিন কমে যাচ্ছে, যা কৃষকদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের। সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল কবীর জানিয়েছেন, ইটভাটাগুলো মূলত পরিবেশ অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত। এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে বা নির্দেশনা আসলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হাইকোর্টের আদেশ অমান্য, বাঁশখালীতে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মব সন্ত্রাস ও ভাঙচুরের অভিযোগ

গাইবান্ধায় অবৈধ ইটভাটার কবলে পাঁচ গ্রাম, জনজীবন দুর্বিষহ

আপডেট সময় : ০৯:৩৮:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় নিয়মনীতি উপেক্ষা করে যত্রতত্র গড়ে ওঠা অবৈধ ইটভাটাগুলো জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। লোকালয় ও আবাদি জমির মাঝে নির্মিত এসব ভাটার কালো ধোঁয়া পরিবেশের মারাত্মক দূষণ ঘটাচ্ছে এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করছে। প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে এসব অবৈধ ভাটার কার্যক্রম দিন দিন বেড়েই চলেছে।

উপজেলার কাঠালতলী এলাকায় পাশাপাশি দুটি অবৈধ ইটভাটার বিরূপ প্রভাবে পাঁচটি গ্রামের মানুষ নানা সমস্যায় জর্জরিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাটাগুলোতে মাটি বহনের জন্য দিন-রাত অন্তত ৩০টি ট্রাক্টর ও শ্যালোমেশিন চালিত পাওয়ার ট্রলি চলাচল করে। অতিরিক্ত ভারের কারণে গ্রামের রাস্তাঘাট ভেঙেচুরে যাচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, ভাটাগুলো তাদের জমির উর্বর টপসয়েল কেটে নিয়ে যাচ্ছে, যা ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সতীতলা, কাঠালতলী, বড়াইকান্দী, নশিড়ারপাড়া এবং গড়গড়িয়া গ্রামগুলোর ঘনবসতি ও আবাদি জমির মাঝে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইটভাটাগুলো স্থাপন করা হয়েছে। কাঠালতলী এলাকার স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা ইনছার মুহুরীর এমএসবি ব্রিকস এবং বুলু মেম্বারের টিএবি ব্রিকস নামের দুটি ভাটা বিশেষভাবে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। সতীতলা গ্রামের বাসিন্দা মোতালেব হোসেন জানান, এই ভাটাগুলোর কারণে আবাদি জমি শেষ হয়ে যাচ্ছে, রাস্তাঘাট ভেঙে যাচ্ছে এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। নশিড়ারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আলতাব হোসেন বলেন, ভাটাগুলোর কারণে এলাকায় শান্তিতে বসবাস করা যাচ্ছে না। ওসমানপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম প্রশ্ন তোলেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মাঝে কীভাবে এসব ইটভাটা চলতে পারে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ইরি-বোরো ফসলের জমিতেই পাশাপাশি ইটভাটাগুলো গড়ে উঠেছে। এছাড়াও, উপজেলার শ্যামপুরের চোরকাটা, পদুমশহর, হাফানিয়া ও তেনাচিরা বিলে নতুন করে আরও সাতটি ইটভাটা আবাদি জমির মাঝে গড়ে উঠছে। ১৯৮৯ সালের ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন (সংশোধিত-২০১৩) অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চল, আবাদি জমি ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন এবং ইট পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু আইন অমান্য করে এসব স্থানে প্রকাশ্যে ইট পোড়ানো হচ্ছে। এগুলোর কোনোটিরই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। টিএবি ব্রিকস ইটভাটার মালিক ইনছার মহুরি স্বীকার করেছেন যে, ছাড়পত্র না থাকায় স্থানীয় প্রশাসনকে “ম্যানেজ” করেই ভাটা চালাচ্ছেন।

ইট পোড়ানোর ধোঁয়া, গ্যাস ও ধুলাবালির কারণে ক্ষেতের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। ভন্নতের মোড়ের রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী সোলায়মান আলী জানান, ইটভাটার কারণে ভালো সড়কটিও দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের লোকজন আরও জানান, এই এলাকায় গাছে তেমন ফল ধরে না এবং নানা সমস্যা লেগেই আছে। কৃষকরা উদ্বিগ্ন যে, ইটভাটার কারণে তাদের জমিতে ফসল উৎপাদন কম হচ্ছে।

এ বিষয়ে সাঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আসাদুজ্জামান বলেন, আবাদি জমির মাঝখানে ইটভাটা থাকার কারণে বোরোসহ বিভিন্ন ফসলের ফলন দিন দিন কমে যাচ্ছে, যা কৃষকদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের। সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল কবীর জানিয়েছেন, ইটভাটাগুলো মূলত পরিবেশ অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত। এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে বা নির্দেশনা আসলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।