দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এক স্বতন্ত্র পরিচয়ের ধারক। জাতি, ধর্ম, ভাষা ও পরিচয়ের বৈচিত্র্য সত্ত্বেও এদেশের মানুষের মধ্যে এক গভীরতর এজমালি বন্ধন বিদ্যমান, যা পারিবারিক মূল্যবোধ, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, জীবনবোধ এবং প্রতিবেশীসুলভ আচরণে সুস্পষ্ট। উপমহাদেশীয় অঞ্চলের তুলনায় এখানে বর্ণবৈষম্যের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম; বাংলাদেশের হিন্দুরা ভারতীয় হিন্দুদের চেয়ে উদার এবং বৌদ্ধরা মিয়ানমারের মতো জাতিবাদী বা উগ্র নয়। এই অনন্য মেলবন্ধনকে একটি সুসংহত তাত্ত্বিক কাঠামোর আওতায় আনতে ‘বাংলাদেশপন্থা’ নামক ধারণার প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সহস্রাব্দ ধরে গড়ে ওঠা এই অভিন্ন জীবনধারা বিশেষত সুলতানি শাসনামলে কৃষি ও বাণিজ্যিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে এক নতুন রূপ লাভ করে। এই মিলনের প্রকাশ দেখা যায় পীরের দরবারে সবার জন্য এক ডেকচিতে রান্না করা শিন্নি বা খিচুড়ি থেকে শুরু করে মেজবান, ওরস ও জিয়াফতের মতো সামাজিক ভোজ অনুষ্ঠানে। আবার, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ বা জানাজায় দাঁড়ানো কিংবা গ্রাম্য জনপদে বাঁধ মেরামত বা ডাকাত তাড়ানোর মতো এজমালি শ্রমেও এই ঐক্যের প্রতিফলন ঘটে। গ্রামীণ জীবনে যৌথ শ্রমের এই রেওয়াজ এতটাই শক্তিশালী যে, একসময় জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচিও এর মাধ্যমেই সফল হয়েছিল, যা সীমান্তের ওপার থেকেও মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখা হতো। শ্রমঘন পোশাকশিল্পের বিকাশ বা গণঅভ্যুত্থানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ের শক্তিও এই এজমালি বন্ধন থেকেই উৎসারিত।
আমাদের লোকসাহিত্য ও লোকগানের জগৎও মধ্যযুগেই গড়ে উঠেছে, যেখানে গরিব ও সাধারণ মানুষের জয়গান গাওয়া হয়েছে এবং মিলনের কথা বলা হয়েছে। সিরাজ সাঁই ও লালন সাঁইয়ের মতো মহাপুরুষেরা তাঁতি সমাজেরই নায়ক ছিলেন। ফকিরি ও পীর-দরবেশের ধারা বস্তুবাদী নয়, বরং মরমীবাদের ধারক, যার প্রধান শক্তি হলো ‘মায়া’। বৈদিক সাহিত্যে মায়া বিভ্রম অর্থে ব্যবহৃত হলেও, বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতিতে এর অর্থ মরমের টান, ভালোবাসা এবং মাটি ও মানুষের প্রতি এক নিবিড় আবেগ। আমাদের দেশপ্রেম বীরত্বপূর্ণ চেতনার চেয়ে বরং এই ‘মায়া’ নামক গভীর মানবিক অনুভূতির রসে সিক্ত, যা জাতীয় সংগীতেও অনুরণিত হয়। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় মায়াবাস্তবতার যে ছবি ফুটে ওঠে, তা পশ্চিমবঙ্গের কবিতা থেকে এক ভিন্ন স্বরের পরিচয় বহন করে।
বাঙালি পরিচিতির মূল ভিত্তিই হলো হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির এক সুসংহত মেলবন্ধন। উনিশ শতকে এই দুইয়ের মধ্যে যে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা হয়েছিল, তা ছিল এক ভ্রান্ত ধারণা। বস্তুত, সুলতানি আমলেই বাংলা ভাষা ও বাঙালি পরিচয় এক সমন্বিত রূপ লাভ করে, যেখানে মুসলিম অস্তিত্ব অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মিশে আছে। ‘বাংলাদেশপন্থা’র ধারণার মধ্যে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং আত্মদান ও শহীদানের মধ্যেও এই মিলনবাদিতা প্রোথিত।
এটি এমন এক দেশ যেখানে অনেকে একই সাথে ধর্মনিরপেক্ষ হতে ভয় পায়, আবার সাম্প্রদায়িক হতেও আপত্তি করে। মওলানা ভাসানীর মতো একজন দাড়ি-টুপিওয়ালা নেতা এখানে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবার আইকন হয়ে ওঠেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য এবং মুসলমানি পুঁথির মিলনে গঠিত, যেখানে সব ধর্মের ছাপ বিদ্যমান। ভাষা তাই ধর্মনিরপেক্ষ না হয়ে বরং অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক হয়। ভাষা আন্দোলনের মহিমান্বিত স্মারক ‘শহীদ মিনার’ তার নামকরণেই আরবি-ফারসি শব্দ ধারণ করে।
আরেক অদ্ভুত বিষয় হলো, যেখানে কন্যা জননী ‘জয়িতা’ হিসেবে দেশের পরিচায়ক, সেখানে নারীর সবল ভূমিকার ইতিহাস সংস্কৃতিতে উপেক্ষিত হলেও কৃষ্টি-কালচারে তা প্রবলভাবে হাজির। খালেদা জিয়ার জন্য নীরব জনতার শোকের গণঅভ্যুত্থানও আমাদের এই সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়। খনা ও রোকেয়ার মতো মহীয়সী নারীদের পাশাপাশি এই সমাজই কাজলরেখা ও সুয়োরানির গল্প বিশ্বাস করে।
বাংলাদেশের মুসলমানদের বড় অংশের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় বা ভয় থাকলেও, ভাষা ও জাতিসত্তার প্রশ্নে তারা খাঁটি বাঙালি। আমাদের ইতিহাসে ধর্মের ভূমিকা পশ্চিম ইউরোপের মতো নিপীড়কের ছিল না, বরং তা ছিল মুক্তির সহযোগী। তিতুমীর থেকে শুরু করে ফরায়েজি আন্দোলন, জমিদারবিরোধী পাকিস্তান আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ—সর্বত্রই ধর্ম মানুষের হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে গাঁথা ছিল। মুক্তিযুদ্ধকে ধর্মবিবর্জিত বা ধর্মবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা একটি ভুল ব্যাখ্যা। তৎকালীন দলিলপত্র, মুক্তিযোদ্ধাদের দলবদ্ধভাবে নামাজ আদায় এবং রণধ্বনিতে ‘আল্লাহু আকবর’ স্লোগানের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ধর্ম ছিল তাদের হৃদয়ে প্রোথিত এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ হলেও সাম্প্রদায়িক নয়। আপন সম্প্রদায়ের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা এখানে কম। ষাটের দশকের আন্দোলনগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতার চেয়ে অসাম্প্রদায়িকতাই ছিল মূল চেতনা। ৭২-এর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে অসাম্প্রদায়িকতা শব্দটি থাকলে হয়তো পরবর্তীতে রাষ্ট্রধর্ম সংক্রান্ত জটিলতা এড়ানো যেত। এখানে কোনো নেতা সাম্প্রদায়িক স্লোগান দিয়ে ভোটে জিততে পারেন না, বরং জনসমাজ তাকে লজ্জা দেয়।
ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ‘বাংলাদেশপন্থা’র গুরুত্ব অপরিসীম। তিন দিক থেকে ‘খেয়ে ফেলার’ হুমকি এবং অন্যদিকে মিয়ানমারের নেতাদের হুমকি—এসব কারণে জাতীয়তাবাদের সামান্য ঝোঁক থেকে যাবে। তবে এই ধারণা জাতীয় স্বার্থকে বিদেশি-বিরোধিতার সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বের করে আনতে চায়। ‘ভারত-বিরোধী’, ‘পাকিস্তান-বিরোধী’ কিংবা ‘মার্কিন-বিরোধী’ এমন নেতিবাচক রাজনীতি কোনো জাতির প্রকৃত পরিচয় হতে পারে না, বরং তা বিভেদ ও জাতিগত বিদ্বেষকে উসকে দেয়। আমাদের রাজনীতি হোক ইতিবাচক। ইতিহাসের এই পর্বে আমরা ‘বাংলাদেশপন্থা’য় থাকতে চাই, যেমন এর আগের দুটি পর্বে বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রধান ছিল।
‘বাংলাদেশপন্থা’ হলো সংস্কৃতি ও রাজনীতির মিলনবিন্দু। বাংলাদেশ নিজেই এক বহুজাতির ‘মেল্টিং পট’ বা সত্যিকার ‘গাজরের হালুয়া’। পাশ্চাত্যে বহুত্ববাদ (Multiculturalism) প্রয়োজন কারণ সেখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে প্রকৃত অর্থে একীকরণ ঘটেনি। তাদের সংস্কৃতিকে ‘বারোমিশালি সবজি খিচুড়ি’র সাথে তুলনা করা চলে, যেখানে প্রতিটি উপাদান স্বতন্ত্রভাবে দৃশ্যমান। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, যেখানে বিভিন্ন জাতিসত্তার এক অভূতপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছে, তাকে ‘গাজরের হালুয়া’র মতো একীভূত ও সুসমন্বিত ‘এজমালি বা সমবায়ী সংস্কৃতি’ বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। ‘বহুত্ববাদ’ শব্দটি অনেক সময় ধর্মীয় একত্ববাদ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করতে পারে, তাই এই প্রেক্ষাপটে ‘এজমালি সংস্কৃতি’ শব্দটিই অধিক উপযোগী।
১৭৫৭ থেকে শুরু করে ১৮৫৭, ১৯৩৫-৩৬, ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯১ এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে এই ‘বাংলাদেশপন্থা’ ধারণ করে। এই যে চালচলন ও আচার-ব্যবহারে এজমালি মিলের সমাজ, এটিই বাংলাদেশি সমাজের মূল শক্তি। এই মিলনের মোহনায় শামিল হওয়াকেই আমরা ‘বাংলাদেশপন্থা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে চাই।
রিপোর্টারের নাম 















