ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে নতুন হাওয়া। ভোটের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার জরিপ প্রকাশের পর থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে জোট গঠন, আসন বণ্টন এবং শরিক দলগুলোর মধ্যকার দরকষাকষি কেন্দ্র করে রাজপথের রাজনীতিতে এক ধরনের নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে জোটবদ্ধ রাজনীতির প্রভাব সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে বড় দলগুলো ছোট দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়। অতীতে এই জোট রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জাতীয় পার্টির প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট গঠনে তার ভূমিকা যেমন আলোচিত ছিল, তেমনি ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে দলবদল করে আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকে পড়ার ঘটনাও ছিল সমানভাবে আলোচিত। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন পূর্ববর্তী সময়ে এবং পরবর্তীতে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনেও জোট গঠন নিয়ে নানা নাটকীয়তা দেখা গেছে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাজনীতির মেরুকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
এবারের নির্বাচনের আগে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল ইসলামপন্থি দলগুলোর ঐক্য। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমিরের আহ্বানে জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি দল মিলে একটি বৃহৎ জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে আটটি দল নিয়ে এই যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো দলগুলো এতে যুক্ত হয়। তবে এই জোটের স্থায়িত্ব নিয়ে শুরুতেই চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়। মূলত আসন বণ্টন কেন্দ্র করে জোটের প্রধান দুই শরিক—জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়।
সূত্রমতে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোটের কাছে অন্তত ৮০টি আসন দাবি করে। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী তাদের জন্য ৪৫টি আসন ছাড়ার প্রস্তাব দেয়। এছাড়া এনসিপির জোটে অন্তর্ভুক্তি এবং নির্দিষ্ট কিছু আসনে দলটির শক্ত অবস্থানের কারণে আসন ভাগাভাগির সমীকরণ আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সাতক্ষীরাসহ জামায়াত-অধ্যুষিত কয়েকটি এলাকায় আসন দাবি এবং ইসলামী আন্দোলনের বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর জামানত হারানোর অতীত রেকর্ড নিয়ে জোটের ভেতরেই প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত সমঝোতা না হওয়ায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে ২৬৬ আসনে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির অবস্থান একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শুরুতে বিএনপির সঙ্গে এনসিপির জোটবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলটি জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করে। এই সিদ্ধান্ত অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তরুণ ভোটার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এই নতুন জোট নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটসহ (আইআরআই) বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের সমর্থন রয়েছে বিএনপির প্রতি, যেখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি সমর্থন ২৬ শতাংশ। এছাড়া এনসিপি ৬ শতাংশ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৪ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পাচ্ছে। জরিপের এই তথ্যগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগামী নির্বাচনে কোনো একক দলের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের চেয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা বেশি।
বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা, যাদের সংখ্যা প্রায় চার কোটি, তারা প্রথাগত রাজনীতির বাইরে সততা ও পরিবর্তনের পক্ষেই বেশি আগ্রহী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এর একটি প্রাথমিক প্রতিফলন দেখা গেছে। ভোটারদের একটি বড় অংশ এখন প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ, সততা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচনে বড় দুই জোটের মধ্যে ভোটের ব্যবধান খুব সামান্য হতে পারে। একদিকে বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা, অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন জোটের পরিবর্তনের অঙ্গীকার—এই দুইয়ের মধ্যে ভোটাররা কাকে বেছে নেবেন, তা-ই এখন দেখার বিষয়। তবে জোট গঠন ও ভাঙনের এই খেলা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দেবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
রিপোর্টারের নাম 















