ঢাকা ০২:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

ভোলার গজারিয়ায় নৌকা শিল্পে প্রাণের স্পন্দন: স্বাবলম্বী হচ্ছে শত শত পরিবার

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:০৫:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

ভোলার লালমোহন ও চরফ্যাশন উপজেলার সীমান্তবর্তী গজারিয়া বাজার এলাকায় এখন নৌকা তৈরির ধুম। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত এই জনপদে নৌকা তৈরির এই চিরাচরিত শিল্পকে কেন্দ্র করে ভাগ্যবদল হয়েছে শত শত পরিবারের। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে একদিকে যেমন জেলেরা তাদের জীবিকার প্রধান বাহন খুঁজে পাচ্ছেন, অন্যদিকে কারিগর ও ব্যবসায়ীরাও দেখছেন সচ্ছলতার মুখ।

সরেজমিনে গজারিয়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চরফ্যাশন-ভোলা মহাসড়কের কোলঘেঁষে গড়ে উঠেছে অসংখ্য নৌকা তৈরির কারখানা। এখানকার কারখানায় তৈরি নৌকা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে দক্ষিণ আইচা, শশীভূষণ, দুলারহাট ও মনপুরাসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলায়। নৌকা তৈরির উদ্যোক্তা বা স্থানীয় ভাষায় ‘ব্যাপারী’ হিসেবে পরিচিত মামুন হোসেন, নাগর, কালাম, আলমগীর হোসেন ও বেল্লাল হোসেনদের মতো অনেকেই এখন এই ব্যবসার মাধ্যমে সচ্ছল জীবন অতিবাহিত করছেন।

উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারা বছরই এখানে নৌকা তৈরির কাজ চলে। তবে ইলিশ প্রজনন মৌসুম ও মাছ ধরার ভরা মৌসুমে নৌকার চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কারিগররা মূলত ‘ডিঙি’ ও ‘কোষা’—এই দুই ধরনের নৌকা তৈরিতে পারদর্শী। সাধারণত একটি কোষা নৌকা ৯ থেকে ১০ ফুট এবং ডিঙি নৌকা ১৫ থেকে ১৬ ফুট দৈর্ঘ্যের হয়ে থাকে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত থাকলে একটি কারখানায় প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি নৌকা তৈরি করা সম্ভব হয়। স্থানীয় বাজারে বর্তমানে কোষা নৌকার কদর সবচেয়ে বেশি।

নৌকা তৈরির উপকরণ হিসেবে সাধারণত কড়ই, চম্বল, সুন্দরী ও মেহগনি কাঠ ব্যবহার করা হয়। এছাড়া মজবুত গঠনের জন্য ব্যবহার করা হয় বিশেষ ধরনের পেরেক ও জলুয়া। ব্যয়ের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১২ হাত লম্বা একটি নৌকা তৈরিতে কাঠ বাবদ চার হাজার, শ্রমিকের মজুরি তিন থেকে চার হাজার এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপকরণে প্রায় তিন হাজার টাকা খরচ হয়। সব মিলিয়ে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি নৌকা বাজারে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। খরচ বাদে প্রতিটি নৌকায় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা মুনাফা থাকে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রবীণ কারিগররা জানান, স্বল্প পুঁজিতে এই ব্যবসা পরিচালনা করা এখন চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলে এই শিল্পকে আরও আধুনিকায়ন এবং বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ভোলার এই ঐতিহ্যবাহী নৌকা শিল্প দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নির্বাচনী সমঝোতায় জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দল: আসন ভাগাভাগির ঘোষণা কাল

ভোলার গজারিয়ায় নৌকা শিল্পে প্রাণের স্পন্দন: স্বাবলম্বী হচ্ছে শত শত পরিবার

আপডেট সময় : ১১:০৫:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

ভোলার লালমোহন ও চরফ্যাশন উপজেলার সীমান্তবর্তী গজারিয়া বাজার এলাকায় এখন নৌকা তৈরির ধুম। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত এই জনপদে নৌকা তৈরির এই চিরাচরিত শিল্পকে কেন্দ্র করে ভাগ্যবদল হয়েছে শত শত পরিবারের। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে একদিকে যেমন জেলেরা তাদের জীবিকার প্রধান বাহন খুঁজে পাচ্ছেন, অন্যদিকে কারিগর ও ব্যবসায়ীরাও দেখছেন সচ্ছলতার মুখ।

সরেজমিনে গজারিয়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চরফ্যাশন-ভোলা মহাসড়কের কোলঘেঁষে গড়ে উঠেছে অসংখ্য নৌকা তৈরির কারখানা। এখানকার কারখানায় তৈরি নৌকা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে দক্ষিণ আইচা, শশীভূষণ, দুলারহাট ও মনপুরাসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলায়। নৌকা তৈরির উদ্যোক্তা বা স্থানীয় ভাষায় ‘ব্যাপারী’ হিসেবে পরিচিত মামুন হোসেন, নাগর, কালাম, আলমগীর হোসেন ও বেল্লাল হোসেনদের মতো অনেকেই এখন এই ব্যবসার মাধ্যমে সচ্ছল জীবন অতিবাহিত করছেন।

উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারা বছরই এখানে নৌকা তৈরির কাজ চলে। তবে ইলিশ প্রজনন মৌসুম ও মাছ ধরার ভরা মৌসুমে নৌকার চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কারিগররা মূলত ‘ডিঙি’ ও ‘কোষা’—এই দুই ধরনের নৌকা তৈরিতে পারদর্শী। সাধারণত একটি কোষা নৌকা ৯ থেকে ১০ ফুট এবং ডিঙি নৌকা ১৫ থেকে ১৬ ফুট দৈর্ঘ্যের হয়ে থাকে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত থাকলে একটি কারখানায় প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি নৌকা তৈরি করা সম্ভব হয়। স্থানীয় বাজারে বর্তমানে কোষা নৌকার কদর সবচেয়ে বেশি।

নৌকা তৈরির উপকরণ হিসেবে সাধারণত কড়ই, চম্বল, সুন্দরী ও মেহগনি কাঠ ব্যবহার করা হয়। এছাড়া মজবুত গঠনের জন্য ব্যবহার করা হয় বিশেষ ধরনের পেরেক ও জলুয়া। ব্যয়ের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১২ হাত লম্বা একটি নৌকা তৈরিতে কাঠ বাবদ চার হাজার, শ্রমিকের মজুরি তিন থেকে চার হাজার এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপকরণে প্রায় তিন হাজার টাকা খরচ হয়। সব মিলিয়ে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি নৌকা বাজারে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। খরচ বাদে প্রতিটি নৌকায় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা মুনাফা থাকে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রবীণ কারিগররা জানান, স্বল্প পুঁজিতে এই ব্যবসা পরিচালনা করা এখন চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলে এই শিল্পকে আরও আধুনিকায়ন এবং বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ভোলার এই ঐতিহ্যবাহী নৌকা শিল্প দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।