একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী সংস্থার দিকে তাকালে। বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা সেই আয়নায় এক অস্বস্তিকর চিত্র তুলে ধরেছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং ভোটার তালিকার প্রায় সমসংখ্যক নারী হওয়া সত্ত্বেও, সরাসরি ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন। এই বৈপরীত্য কেবল হতাশাজনক নয়, দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন সংসদ নির্বাচনে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৮৪২ জন। এর মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ৬৫ জন, যা মোট প্রার্থীর ৩.৫৩ শতাংশ। যদিও আপিলের মাধ্যমে দু-একজনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে, কিংবা কেউ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারও করতে পারেন, তবে সামগ্রিক চিত্রে বড় কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। অথচ, নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, দেশের মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ এবং নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ১ হাজার ২৩২ জন। অর্থাৎ, মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী, অথচ রাজনীতির মূল মঞ্চে তাদের উপস্থিতি প্রায় অদৃশ্য।
কেন এই নগণ্য উপস্থিতি? প্রশ্নটি কেবল ‘কেন নেই’ নয়, বরং ‘কেন রাখা হয়নি’—এই প্রশ্নটিই আজ প্রকট। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বল অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, পুরুষ-কেন্দ্রিক মনোনয়ন প্রক্রিয়া এবং অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব। সমাজে প্রচলিত ‘নারী জেতার মতো শক্তিশালী প্রার্থী নয়’—এমন ধারণা দলগুলোকে দায়মুক্তির সুযোগ করে দেয়। যদিও সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে দলগুলো নিজেদের প্রগতিশীল প্রমাণ করতে চায়, সরাসরি ভোটের মাঠে তাদের জায়গা দিতে তারা কুণ্ঠাবোধ করে। এটি দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং কাঠামোগত বাধারই প্রতিফলন।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। পুরনো কাঠামো ভেঙে নতুন পথচলার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই নতুন পথে নারীরা ব্রাত্যই থেকে গেছেন। সংস্কার কমিশন, জুলাই সনদ, রাজনৈতিক সমঝোতাসহ সব গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ ছিল প্রান্তিক, ক্ষেত্রবিশেষে একেবারেই অনুপস্থিত। অথচ, জুলাই বিপ্লবের রাজপথে নারীরা ছিলেন অদম্য, কাঁদানে গ্যাস, বুলেট ও লাঠিপেটা উপেক্ষা করে তারা আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাদের এভাবে বঞ্চিত করা এক প্রকার ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা। যদি নতুন বাংলাদেশও পুরনো পুরুষতান্ত্রিক ছকে বাঁধা হয়, তবে সেই নতুনত্ব কেবল শব্দের আড়ালেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
ইসির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপি থেকে নয়জন, জাতীয় পার্টি থেকে পাঁচ, গণসংহতি আন্দোলন থেকে চার, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) থেকে তিন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) থেকে ছয়জন নারী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধতা পেয়েছে। এছাড়া কয়েকটি ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও কয়েকজন নারী রয়েছেন। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ প্রধান ইসলামী দলগুলোর প্রার্থী তালিকা নারীশূন্য। এটি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা বহন করে যে, নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখনও তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। ধর্মের ব্যাখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত করার এই প্রবণতা সমাজে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে আরও নিরুৎসাহিত করবে। উল্লেখ্য, প্রতিটি দল সাধারণ আসনে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছিল, কিন্তু ৫১টি অংশগ্রহণকারী দলের মধ্যে ৩০টি দলই নারী প্রার্থী বর্জিত। ডান, বাম, মধ্যপন্থী কোনো দলই এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেনি, যা তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
নারীর অনুপস্থিতি কেবল একটি সংখ্যাগত সমস্যা নয়, এটি দৃষ্টিভঙ্গির সংকট। সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের জায়গা নয়, এটি সমাজের স্বপ্ন, চাহিদা ও বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সেখানে নারীর কণ্ঠ অনুপস্থিত থাকা মানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রম, নিরাপত্তা, পরিবার, কর্মক্ষেত্র—সবখানেই একচোখা সিদ্ধান্ত। যে সংসদ নারীর অভিজ্ঞতা জানে না, সে সংসদ রাষ্ট্রের অর্ধেক বাস্তবতাকেই অস্বীকার করে। দীর্ঘমেয়াদে এই অস্বীকার রাষ্ট্রকে অসমতা, সামাজিক অস্থিরতা ও নীতিগত দুর্বলতার দিকে ঠেলে দেবে। সাড়ে তিন শতাংশ নারী প্রার্থীর মধ্য থেকে সংসদে নারীর উপস্থিতি হয়তো এক অংকেই আটকে থাকবে, যা কার্যকর অর্থে একটি ‘পুরুষদের ক্লাব’ হয়ে উঠবে। সংরক্ষিত আসনের ওপর নির্ভরশীল প্রতিনিধিত্ব নারীদের রাজনৈতিক শক্তিকে আরও দুর্বল করবে, কারণ সেটি সরাসরি জনগণের ভোটে অর্জিত ক্ষমতা নয়।
একটি প্রায় নারীশূন্য সংসদ বাংলাদেশকে একটি অসম রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাবে। যেখানে অর্ধেক জনসংখ্যার দুঃখ-দুর্দশা, অধিকার এবং চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলার মতো পর্যাপ্ত কণ্ঠস্বর থাকবে না। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। গণতন্ত্র কেবল ভোটের উৎসব নয়, এটি প্রতিনিধিত্বের নৈতিক চুক্তি। সেই চুক্তিতে নারীর নাম না থাকলে রাষ্ট্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আসন্ন নির্বাচন আমাদের সামনে এক কঠিন সত্য তুলে ধরেছে—রাজনৈতিক দলগুলো এখনও নারীদের সমান নাগরিক, সমান নেতৃত্ব হিসেবে দেখতে প্রস্তুত নয়। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নকে যদি সত্যিই বাস্তবতায় রূপান্তর করতে হয়, তবে সেই স্বপ্নে নারীর মুখ, কণ্ঠ ও নেতৃত্ব স্পষ্টভাবে থাকতে হবে। অন্যথায় এই সংসদ হবে সংখ্যায় পূর্ণ, কিন্তু গণতন্ত্রে অপূর্ণ, আর ‘বৈষম্যবিরোধী’ বাংলাদেশের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
রিপোর্টারের নাম 





















