‘রেহানা মরিয়ম নূর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছিলেন তরুণ প্রতিভাবান নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ। সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের দীর্ঘ পাঁচ বছর পর তিনি দর্শকদের জন্য নিয়ে আসছেন নতুন মৌলিক সিরিজ ‘অ্যানি’। বিগত জুন মাসেই সাদের এই বহুল প্রতীক্ষিত সিরিজের ঘোষণা প্রথম প্রকাশ্যে আসে এবং সে সময়ই এটি জার্মানির বিখ্যাত আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ‘সেরিয়েনক্যাম্প ফেস্টিভ্যাল’-এ নির্বাচিত হয়ে বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।
জার্মানির পর এবার সুইজারল্যান্ডের মাটিতে অনন্য এক বাজিমাত করল সাদের ‘অ্যানি’। দেশটির ৩২তম জেনেভা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে মর্যাদাপূর্ণ ‘সেরা সিরিজ’-এর মুকুট অর্জন করেছে সিরিজটি। রবিবার (৮ নভেম্বর) উৎসবের জমকালো সমাপনী দিনে আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ডের উপস্থিতিতে এই আনুষ্ঠানিক পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজ থেকে দেশের জন্য বয়ে আনা এই আনন্দের বার্তা প্রথম প্রকাশ করেন সিরিজটির নাম ভূমিকায় অভিনয় করা জনপ্রিয় অভিনেত্রী নাজিফা তুষি। তিনি জানান, উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘ফিউচার ইজ সেনসিবল’ ক্যাটাগরিতে সেরা সিরিজের অনন্য এই স্বীকৃতি লাভ করেছে ‘অ্যানি’।
এই বৈশ্বিক অর্জনে গভীর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তুষি বলেন, ‘জেনেভা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের “ফিউচার ইজ সেনসিবল” বিভাগটি আমার কাছে অত্যন্ত অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই প্ল্যাটফর্মে এমন সমস্ত শিল্পকর্ম ও মানবিক আখ্যানকে মূল্যায়ন করা হয়, যেগুলো নিছক বিনোদনের খোরাক জোগায় না; বরং গভীর মানবিক মূল্যবোধকে উন্মোচিত করে, মনে নানা মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দেয় এবং আমরা যে গ্রহে বাস করছি ও আগামী দিনে যে ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছি, তা নিয়ে মানবসমাজকে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। এমন একটি সংবেদনশীল ও দূরদর্শী বিভাগে আমাদের “অ্যানি”র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া যেকোনো শিল্পীর জন্য এক অসাধারণ অনুভূতির বিষয়।’
সিরিজটিতে জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক নাম চরিত্রে অভিনয় করার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তুষি জানান, অ্যানি হয়ে ওঠার সামগ্রিক রূপান্তর ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর তাঁর আর মনে হয়নি যে তিনি কেবল ক্যামেরার সামনে একটি চরিত্রে অভিনয় করছেন; বরং মনে হচ্ছিল অ্যানি রক্তমাংসের জীবন্ত একজন মানুষ, যাকে তিনি খুব ধীরে ধীরে এবং গভীরভাবে চিনে নিচ্ছেন। তাঁর চরিত্রটির নীরবতা, পুঞ্জীভূত আবেগ, ভেতরের দুর্বলতা এবং আত্মিক শক্তির জায়গাগুলো খুঁজে বের করতে গিয়ে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এমন বহু দিন গেছে যখন অ্যানির মানসিক জগতের ভেতরে প্রবেশ করতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত সত্তার অনেক কিছুকেই অতীতে ফেলে আসতে হয়েছে; আবার কিছু দিন সেই চরিত্রের মধ্য দিয়েই নিজের ভেতরের নতুন শক্তিকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন তিনি।
তুষি আরও আবেগাপ্লুত হয়ে উল্লেখ করেন, অ্যানি চরিত্রটি তাঁকে এমনভাবে ভেতর থেকে বদলে দিয়েছে, যার গভীর প্রভাব তিনি এখনো প্রতিদিন অনুভব করছেন। একজন নিবেদিতপ্রাণ অভিনেতার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা থাকে চরিত্রের পেছনে ঢেলে দেওয়া দীর্ঘ সময়, ধৈর্য, অশ্রু ও নিজের আত্মার অংশ যেন কোনো একদিন দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। জেনেভার এই বৈশ্বিক স্বীকৃতি পুরো ক্লান্তিকর যাত্রাকে পরিপূর্ণ সার্থকতা এনে দিয়েছে। আক্ষেপ ও ভালোবাসার সুরে তিনি বলেন, ‘ইশ্, অ্যানি যদি আজ নিজে জানতে পারত, সে কতটা দীর্ঘ ও দুর্গম পথ সফলভাবে পাড়ি দিয়ে এসেছে!’
এই আন্তর্জাতিক গৌরব অর্জনে তিনি জেনেভা উৎসবের সম্মানিত জুরি সদস্যদের প্রতি বিনম্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে সিরিজের কান্ডারি ও গুণী নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদসহ নির্মাণে যুক্ত প্রতিটি কলাকুশলীর প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। আর নিজের অভিনীত চরিত্রকে গভীর মমতায় স্মরণ করে তুষি বলেন, কিছু চরিত্র একজন শিল্পীকে কখনোই পুরোপুরি ছেড়ে যায় না; অ্যানিও হয়তো তাঁর হৃদয়ে আজীবন একইভাবে বেঁচে থাকবে।
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ পরিচালিত এই সিরিজে নাজিফা তুষির পাশাপাশি আরও অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় তারকা ইয়াশ রোহান, সাইমন সাদিক, সারিকা সাবরিন এবং বর্ষীয়ান অভিনেত্রী ফারহানা মিঠুসহ একঝাঁক প্রতিভাবান শিল্পী। দেশীয় জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘আইস্ক্রিন’-এ সিরিজটি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। তবে মুক্তির আনুষ্ঠানিক তারিখ এখনো কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি।

























