জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিরোধ এবং বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট ছয়টি কার্যকর পদক্ষেপ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রতি বছর প্রায় ১৬ লাখ মানুষের অমূল্য জীবন বাঁচানো সম্ভব। একই সঙ্গে এই উদ্যোগগুলো কার্যকর হলে বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো যাবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল আর্থিক সুফল যুক্ত হতে পারে। জাতিসংঘের স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নতুন এক গবেষণামূলক প্রতিবেদনে এই আশাব্যঞ্জক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
বুধবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বহুমাত্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সুনির্দিষ্ট ছয়টি নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে শুরু হতে যাওয়া বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন ‘কপ-৩১’-কে সামনে রেখেই বিশেষ এই প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। জেনেভা থেকে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়।
ডব্লিউএইচওর সুপারিশকৃত এই ছয়টি পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম হলো—তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর আগাম স্বাস্থ্য সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাব সহ্য করতে সক্ষম টেকসই সুপেয় পানীয় জল ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণ করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের মধ্যে নিয়মিত হাত পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যবিধির অভ্যাস ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা। এর পাশাপাশি পরিবার ও বাসাবাড়িতে পরিবেশবান্ধব ও দূষণমুক্ত জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ন্যায্য মূল্য নির্ধারণে কার্যকর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস বলেন, “জলবায়ু সংকট মূলত একটি স্বাস্থ্য সংকট। তবে এর কারণে মানবজাতি ও প্রকৃতির যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তার একটি বড় অংশই বর্তমানে আমাদের হাতে থাকা বিভিন্ন কার্যকর উপায় ও পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব।”
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, প্রস্তাবিত এই ছয়টি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে বিশ্ব সম্প্রদায় একসঙ্গে প্রধান তিনটি ইতিবাচক সুফল ভোগ করবে। সেগুলো হলো—প্রথমত, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়া; দ্বিতীয়ত, ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ লক্ষণীয় মাত্রায় হ্রাস পাওয়া এবং তৃতীয়ত, সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আরও বেশি গতিশীল ও শক্তিশালী করা।
সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ পরিসংখ্যান ও হিসাব অনুযায়ী, এই সমন্বিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণের মাধ্যমে প্রতি বছর বৈশ্বিকভাবে প্রায় ১৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হবে। একই সময়ে এই নীতিগুলোর বাস্তবায়ন থেকে বছরে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ রাজস্ব সুবিধা অর্জিত হতে পারে। এছাড়াও অকাল প্রাণহানি রোধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ধ্বংসযজ্ঞ ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের চিকিৎসা ব্যয় সাশ্রয়ের মাধ্যমে সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বাড়তি আর্থিক সুবিধা যুক্ত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ডব্লিউএইচও তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছে যে, এই গবেষণাটি কিছু উচ্চাভিলাষী কাল্পনিক পরিস্থিতি ও পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে বাস্তব তথ্যের কিছু ঘাটতি এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ভুলভাবে নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
তা সত্ত্বেও ডব্লিউএইচও প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস মনে করেন, এই গবেষণা প্রমাণ করেছে যে ইতোমধ্যে প্রমাণিত, পরীক্ষিত এবং তুলনামূলকভাবে বেশ সাশ্রয়ী পদক্ষেপগুলো যদি বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ রক্ষা করা পুরোপুরি সম্ভব। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলো এই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।
আগামী সপ্তাহে তুরস্কে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কপ-৩১ জলবায়ু সম্মেলনে যোগদানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিশ্বনেতারা। এই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে টেড্রোস আধানম বিশ্বনেতৃবৃন্দের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইয়ে যেকোনো কৌশল ও উদ্যোগ নির্ধারণের সময় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে যেন সবসময় মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়।
























