খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব এখন আর কেবল ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা নদীভাঙনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সরাসরি ও দীর্ঘমেয়াদি আঘাত এসে পড়ছে উর্বর কৃষিজমি, মিঠাপানির মৎস্যসম্পদ এবং সাধারণ মানুষের জীবিকা ও সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তার ওপর। মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে একদিকে যেমন মাটির উৎপাদনক্ষমতা কমে ধান ও শাকসবজির ফলন আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে পানির গুণমান নষ্ট ও অতিরিক্ত লবণের কারণে উপকূলের একসময়ের অর্থনৈতিক লাইফলাইন ‘বাগদা চিংড়ি’ চাষেও দেখা দিয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা। তবে চরম এই সংকটের মাঝেও যেসব জমিতে বৃষ্টির মিঠাপানি সংরক্ষণ ও সেচ নিশ্চিত করা যাচ্ছে, সেখানে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা ও আশার আলো দেখছেন চাষিরা।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা উপকূলীয় এলাকার প্রায় ১৭ লাখ ৩ হাজার হেক্টর চাষযোগ্য জমির মধ্যে প্রায় ১১ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর—অর্থাৎ ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ জমিই বর্তমানে লবণাক্ততায় আক্রান্ত। ২০০৯ সালে এই পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ বিগত ১৫ বছরের ব্যবধানে উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন করে প্রায় ৯৯ হাজার ৮০০ হেক্টর বা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ চাষযোগ্য জমি লবণাক্ততার কবলে পড়েছে। খুলনা জেলার মোট আবাদি জমির প্রায় ৫৭ শতাংশই শুষ্ক মৌসুমে মাঝারি থেকে তীব্র লবণাক্ততায় রূপ নেয়।
মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, পাইকগাছা উপজেলার মাহমুদকাঠি ও নোয়াকাঠির মতো এলাকাগুলোতে বিঘাপ্রতি ধানের ফলন ১৮-২০ মণ থেকে কমে ১৪-১৬ মণে ঠেকেছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি প্রভাবশালী মহলের মদদে স্লুইসগেট খুলে জোরপূর্বক জমিতে নোনা পানি ঢুকিয়ে চিংড়িঘের তৈরির কারণে আশপাশের কৃষিজমিগুলোতে স্থায়ীভাবে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে। বছরের সাত থেকে আট মাস জমিতে নোনা পানি জমে থাকায় মাটি তার প্রাকৃতিক পুষ্টি ও উর্বরতা হারাচ্ছে।
চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। কৃষি ও মৎস্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, লবণাক্ততা বাড়লেই চিংড়ির উৎপাদন বাড়ে—এই ধারণা পুরোপুরি ভুল। পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং লবণের মাত্রা অতিরিক্ত ওঠানামা করায় ঘেরের বাগদা চিংড়ি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয়ের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না ঘেরমালিকরা। মাটিতে অতিরিক্ত সোডিয়াম জমায় ফসলের শিকড় পানি ও পুষ্টি শোষণ করতে পারছে না, ফলে ব্যাহত হচ্ছে বীজের অঙ্কুরোদ্গম। শুষ্ক মৌসুমে উজানের ফারাক্কা পয়েন্টে প্রবাহ কমে যাওয়া এবং নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত বৃষ্টিহীন আবহাওয়ায় নদী ও মাটির লবণাক্ততা এপ্রিল-মে মাসে সর্বোচ্চ বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছায়।
তবে এই প্রতিকূলতার মধ্যেও আশার সঞ্চার করছে ‘মিঠাপানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি’। যেসব এলাকায় পুকুর গভীর করে বা খাল পুনঃখননের মাধ্যমে বর্ষার মিষ্টি পানি ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে, সেখানে কৃষকরা একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল ফলাচ্ছেন। হেতমপুরের মতো এলাকায় মিঠাপানির সেচে ধান ও পাটের পাশাপাশি সরিষা, তরমুজ, টমেটো ও শীতকালীন সবজি চাষ করে বিঘাপ্রতি ভালো মুনাফা ঘরে তুলছেন কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার উপপরিচালক নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, লবণাক্ততা মাটির উপকারী অণুজীব ও কেঁচো ধ্বংস করে প্রাকৃতিক সজীবতা নষ্ট করে দেয়। তবে কৃষকদের ড্রিপ সেচপদ্ধতি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ব্রি উদ্ভাবিত লবণসহিষ্ণু নতুন জাতের ধান চাষে সম্পৃক্ত করা গেলে উপকূলের এই খাদ্যঝুঁকি অনেকাংশেই দূর করা সম্ভব।


























