মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৬:৩৩ অপরাহ্ন | ২৬শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | সোমবার, ১০ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ

  • হালনাগাদ সময় : ১০:২০:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
  • ২৫ বার পড়া হয়েছে

আজ রোববার (৩০ আগস্ট) বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ, তাদের পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং নিখোঁজ প্রিয়জনদের সন্ধানের দাবিতে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জোরপূর্বক গুম বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি মারাত্মক ও স্পর্শকাতর সংকট হিসেবে চিহ্নিত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ও রাজনৈতিক সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন করতে প্রায়শই রাষ্ট্রযন্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করে এই বর্বর পন্থা প্রয়োগ করা হয়। এর ফলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার তাদের অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকে এবং যেকোনো ধরনের আইনি আশ্রয় ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুসারে, বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার, তাদের স্মৃতি রক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের লক্ষ্যে ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট এই দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। এর পটভূমি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত গুম বন্ধ, দায়মুক্তির অবসান ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি আন্তর্জাতিক প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রটেকশন অব অল পারসন্স এগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে ৩০ আগস্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও ২০১১ সাল থেকে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশে গুমের ইতিহাস খুব দীর্ঘ না হলেও তা অত্যন্ত নৃশংস ও বহুল আলোচিত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তথাকথিত ‘আয়নাঘর’ নামক গোপন বন্দিশালায় নাগরিকদের আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতনের যে চিত্র গুম সংক্রান্ত কমিশন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত রোমহর্ষক। সেই সময়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকদের তুলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করা হতো, কিন্তু পরবর্তীতে তাদের আর কোনো আনুষ্ঠানিক হদিস মিলত না।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর এই বাস্তবতায় এক নতুন মোড় আসে। গোপন বন্দিশালা থেকে দীর্ঘ সময় পর কয়েকজন নিখোঁজ ব্যক্তি মুক্ত হয়ে ফিরে আসার পর গুমের ভয়াবহতা আন্তর্জাতিক পরিসরে তীব্রভাবে আলোচনায় আসে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের ঘটনায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং গঠিত কমিশন এসব লোমহর্ষক ঘটনার বিশদ তদন্ত পরিচালনা করছে। দীর্ঘদিনের অনীহা কাটিয়ে বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট জাতিসংঘের গুমবিরোধী সনদে স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকার বিষয়ক নয়টি প্রধান সনদের আটটিতেই বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয়।

এদিকে গুমের মতো অপরাধের স্থায়ী অবসান ঘটাতে জাতীয় সংসদে যুগান্তকারী আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও অ-আপসযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল-২০২৬’ উত্থাপন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিলটি বর্তমানে বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে রয়েছে। প্রস্তাবিত এই আইনে গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তদুপরি, গুমের শিকার ব্যক্তির মৃত্যু হলে, মরদেহ উদ্ধার হলে কিংবা পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও যদি কোনো সন্ধান না পাওয়া যায়, তবে দায়ীদের সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর তথ্যমতে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশে সাত শতাধিক মানুষ গুমের নির্মম শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে দেড় শতাধিক ব্যক্তির কোনো খোঁজ আজও পায়নি তাদের পরিবার। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং দেশে যেকোনো ধরনের গুমের সংস্কৃতির চিরতরে ইতি টানাই আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের মূল অঙ্গীকার।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

গাড়ির কাগজ ও লাইসেন্স হালনাগাদের সময়সীমা বাড়াল বিআরটিএ

26 October 2026

৪১ বছরে পা রাখলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী অসিন

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ

হালনাগাদ সময় : ১০:২০:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

আজ রোববার (৩০ আগস্ট) বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ, তাদের পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং নিখোঁজ প্রিয়জনদের সন্ধানের দাবিতে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জোরপূর্বক গুম বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি মারাত্মক ও স্পর্শকাতর সংকট হিসেবে চিহ্নিত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ও রাজনৈতিক সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন করতে প্রায়শই রাষ্ট্রযন্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করে এই বর্বর পন্থা প্রয়োগ করা হয়। এর ফলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার তাদের অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকে এবং যেকোনো ধরনের আইনি আশ্রয় ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুসারে, বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার, তাদের স্মৃতি রক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের লক্ষ্যে ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট এই দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। এর পটভূমি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত গুম বন্ধ, দায়মুক্তির অবসান ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি আন্তর্জাতিক প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রটেকশন অব অল পারসন্স এগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে ৩০ আগস্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও ২০১১ সাল থেকে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশে গুমের ইতিহাস খুব দীর্ঘ না হলেও তা অত্যন্ত নৃশংস ও বহুল আলোচিত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তথাকথিত ‘আয়নাঘর’ নামক গোপন বন্দিশালায় নাগরিকদের আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতনের যে চিত্র গুম সংক্রান্ত কমিশন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত রোমহর্ষক। সেই সময়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকদের তুলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করা হতো, কিন্তু পরবর্তীতে তাদের আর কোনো আনুষ্ঠানিক হদিস মিলত না।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর এই বাস্তবতায় এক নতুন মোড় আসে। গোপন বন্দিশালা থেকে দীর্ঘ সময় পর কয়েকজন নিখোঁজ ব্যক্তি মুক্ত হয়ে ফিরে আসার পর গুমের ভয়াবহতা আন্তর্জাতিক পরিসরে তীব্রভাবে আলোচনায় আসে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের ঘটনায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং গঠিত কমিশন এসব লোমহর্ষক ঘটনার বিশদ তদন্ত পরিচালনা করছে। দীর্ঘদিনের অনীহা কাটিয়ে বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট জাতিসংঘের গুমবিরোধী সনদে স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকার বিষয়ক নয়টি প্রধান সনদের আটটিতেই বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয়।

এদিকে গুমের মতো অপরাধের স্থায়ী অবসান ঘটাতে জাতীয় সংসদে যুগান্তকারী আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও অ-আপসযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল-২০২৬’ উত্থাপন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিলটি বর্তমানে বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে রয়েছে। প্রস্তাবিত এই আইনে গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তদুপরি, গুমের শিকার ব্যক্তির মৃত্যু হলে, মরদেহ উদ্ধার হলে কিংবা পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও যদি কোনো সন্ধান না পাওয়া যায়, তবে দায়ীদের সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর তথ্যমতে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশে সাত শতাধিক মানুষ গুমের নির্মম শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে দেড় শতাধিক ব্যক্তির কোনো খোঁজ আজও পায়নি তাদের পরিবার। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং দেশে যেকোনো ধরনের গুমের সংস্কৃতির চিরতরে ইতি টানাই আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের মূল অঙ্গীকার।

Share this news as a Photo Card