ঢাকা ১১:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মুহুরী নদীর পানি বাড়ছে দ্রুত, বড় বন্যার আশঙ্কায় ফেনীবাসী

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:২৯:৩৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

ফেনী জেলায় গত কয়েক দিন ধরে চলমান টানা বর্ষণ এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে মুহুরী নদীর পানির উচ্চতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে দেওয়া তথ্য ও সার্বিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, উজানে বৃষ্টিপাত যদি একইভাবে অব্যাহত থাকে, তবে যেকোনো মুহূর্তেই নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে। এই পানি বৃদ্ধির ফলে নদীর তীরবর্তী ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার হাজার হাজার মানুষের মনে ফের বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী বাঁধ ভাঙনের আতঙ্ক জেঁকে বসেছে, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রাপ্ত তথ্য ও পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেল ৩টায় মুহুরী নদীর পানির স্তর পরিমাপ করা হয়েছে ১১ দশমিক ৪৫ মিটার। উল্লেখ্য যে, নদীর বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৫৫ মিটার নির্ধারণ করা হলেও বর্তমানে পানি তার থেকে মাত্র ১ দশমিক ১০ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের দুশ্চিন্তার মূল কারণ হলো পানির বৃদ্ধির অস্বাভাবিক ও তীব্র গতি। পরিসংখ্যান বলছে, সোমবার সকাল ৬টায় পানির স্তর ছিল ৯ দশমিক ৩৫ মিটার। সেই হিসেবে মাত্র ৯ ঘণ্টার ব্যবধানে দুপুর ৩টার মধ্যে পানির উচ্চতা ২ মিটার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং রাত ৮টা নাগাদ তা ১১ দশমিক ৫৮ মিটারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দ্রুত পানি বৃদ্ধির ঘটনা এলাকাটিতে বন্যার আশঙ্কাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম আসার সঙ্গে সঙ্গেই মুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙন এখানকার মানুষের জন্য একটি নিয়মিত অভিশাপে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে গত দুই বছরে ভয়াবহ বন্যার শিকার হয়ে ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার অসংখ্য মানুষ চরম আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এবারও পানি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকায় শ্রীপুর, জগতপুরসহ নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা এখন চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। ফুলগাজী উপজেলার উত্তর শ্রীপুর এলাকার বাসিন্দা মো. মোর্শেদ জানান, বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। পানি এখন পর্যন্ত বিপৎসীমার কিছুটা নিচে থাকলেও ভারতের ত্রিপুরায় ভারী বৃষ্টি হলে যেকোনো সময় ঢল নেমে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভীতি সবসময় তাদের তাড়া করে ফেরে। জগতপুর এলাকার বাসিন্দা নূর নবী যোগ করেন, বিগত কয়েক বছরের বন্যায় তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো দ্রুত মেরামত না করা হলে এবারও তাদের জানমাল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

এই সংকট নিরসনে এলাকাবাসী সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে অবিলম্বে স্থায়ী কাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন। তারা বারবার উল্লেখ করছেন, সম্প্রতি একনেকে অনুমোদিত প্রায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকার ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ যেন দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়। এই প্রকল্পের কাজ শুরু হলে তারা দীর্ঘদিনের এই প্রাণঘাতী আতঙ্কের হাত থেকে মুক্তি পেতে পারেন বলে মনে করছেন। অন্যদিকে, ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান জানান, সোমবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যদিও আগামীতে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কিছুটা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে নদী উপকূলীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে হবে।

পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, এবারের পানি বৃদ্ধির ধরনটি গতানুগতিক নয় বরং কিছুটা ব্যতিক্রম। গত কয়েক দিন পানি বাড়লেও আবার কমে যাচ্ছিল, কিন্তু সোমবার সকাল থেকেই পানি অত্যন্ত দ্রুত বাড়ছে। পানি যদি বিপৎসীমা অতিক্রম করে, তবে বাঁধের নতুন নতুন ঝুঁকিপূর্ণ স্থান তৈরি হতে পারে। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেছেন, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং জরুরি প্রয়োজনে বাঁধ রক্ষায় তাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় জরুরি সামগ্রীও মজুত রাখা হয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

তারুণ্য, স্টার্টআপ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মুহুরী নদীর পানি বাড়ছে দ্রুত, বড় বন্যার আশঙ্কায় ফেনীবাসী

আপডেট সময় : ১০:২৯:৩৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

ফেনী জেলায় গত কয়েক দিন ধরে চলমান টানা বর্ষণ এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে মুহুরী নদীর পানির উচ্চতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে দেওয়া তথ্য ও সার্বিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, উজানে বৃষ্টিপাত যদি একইভাবে অব্যাহত থাকে, তবে যেকোনো মুহূর্তেই নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে। এই পানি বৃদ্ধির ফলে নদীর তীরবর্তী ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার হাজার হাজার মানুষের মনে ফের বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী বাঁধ ভাঙনের আতঙ্ক জেঁকে বসেছে, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রাপ্ত তথ্য ও পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেল ৩টায় মুহুরী নদীর পানির স্তর পরিমাপ করা হয়েছে ১১ দশমিক ৪৫ মিটার। উল্লেখ্য যে, নদীর বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৫৫ মিটার নির্ধারণ করা হলেও বর্তমানে পানি তার থেকে মাত্র ১ দশমিক ১০ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের দুশ্চিন্তার মূল কারণ হলো পানির বৃদ্ধির অস্বাভাবিক ও তীব্র গতি। পরিসংখ্যান বলছে, সোমবার সকাল ৬টায় পানির স্তর ছিল ৯ দশমিক ৩৫ মিটার। সেই হিসেবে মাত্র ৯ ঘণ্টার ব্যবধানে দুপুর ৩টার মধ্যে পানির উচ্চতা ২ মিটার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং রাত ৮টা নাগাদ তা ১১ দশমিক ৫৮ মিটারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দ্রুত পানি বৃদ্ধির ঘটনা এলাকাটিতে বন্যার আশঙ্কাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম আসার সঙ্গে সঙ্গেই মুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙন এখানকার মানুষের জন্য একটি নিয়মিত অভিশাপে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে গত দুই বছরে ভয়াবহ বন্যার শিকার হয়ে ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার অসংখ্য মানুষ চরম আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এবারও পানি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকায় শ্রীপুর, জগতপুরসহ নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা এখন চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। ফুলগাজী উপজেলার উত্তর শ্রীপুর এলাকার বাসিন্দা মো. মোর্শেদ জানান, বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। পানি এখন পর্যন্ত বিপৎসীমার কিছুটা নিচে থাকলেও ভারতের ত্রিপুরায় ভারী বৃষ্টি হলে যেকোনো সময় ঢল নেমে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভীতি সবসময় তাদের তাড়া করে ফেরে। জগতপুর এলাকার বাসিন্দা নূর নবী যোগ করেন, বিগত কয়েক বছরের বন্যায় তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো দ্রুত মেরামত না করা হলে এবারও তাদের জানমাল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

এই সংকট নিরসনে এলাকাবাসী সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে অবিলম্বে স্থায়ী কাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন। তারা বারবার উল্লেখ করছেন, সম্প্রতি একনেকে অনুমোদিত প্রায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকার ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ যেন দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়। এই প্রকল্পের কাজ শুরু হলে তারা দীর্ঘদিনের এই প্রাণঘাতী আতঙ্কের হাত থেকে মুক্তি পেতে পারেন বলে মনে করছেন। অন্যদিকে, ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান জানান, সোমবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যদিও আগামীতে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কিছুটা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে নদী উপকূলীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে হবে।

পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, এবারের পানি বৃদ্ধির ধরনটি গতানুগতিক নয় বরং কিছুটা ব্যতিক্রম। গত কয়েক দিন পানি বাড়লেও আবার কমে যাচ্ছিল, কিন্তু সোমবার সকাল থেকেই পানি অত্যন্ত দ্রুত বাড়ছে। পানি যদি বিপৎসীমা অতিক্রম করে, তবে বাঁধের নতুন নতুন ঝুঁকিপূর্ণ স্থান তৈরি হতে পারে। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেছেন, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং জরুরি প্রয়োজনে বাঁধ রক্ষায় তাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় জরুরি সামগ্রীও মজুত রাখা হয়েছে।