সৌদি আরবে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বিশেষ পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্ট দেওয়ার চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সরকারের গৃহীত এই প্রক্রিয়ার আওতায় এরই মধ্যে প্রায় ২৪ হাজার ৩০০ রোহিঙ্গার হাতে এসব পাসপোর্ট হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র প্রস্তুত ও যাচাই-বাছাই শেষে বাকি পাসপোর্টগুলো চলতি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই বিতরণ শেষ করার সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক সহযোগিতায় বিশেষ এই পাসপোর্ট ইস্যুর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে এই প্রকল্পের অগ্রগতি, ডাটাবেজ তৈরি এবং বিতরণ কার্যক্রমের সর্বশেষ চিত্র বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করা হয়।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন অনুবিভাগের দায়িত্বশীল সূত্র স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছে যে, এই পাসপোর্টগুলো বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের নিয়মিত পাসপোর্টের মতো নয়। মূলত সৌদি আরবে অবস্থানরত সংশ্লিষ্ট রোহিঙ্গাদের কেবল শনাক্তকরণ ও একটি সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক পরিচয় নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই এটি দেওয়া হচ্ছে। এই বিশেষ নথির আইনি সুবিধা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কখনোই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দাবি করতে পারবেন না কিংবা বাংলাদেশে প্রবেশের কোনো ধরনের স্বয়ংক্রিয় অধিকার পাবেন না। একইভাবে এই বিশেষ সনদের ওপর ভিত্তি করে সৌদি আরবের নাগরিকত্ব অর্জনেরও কোনো সুযোগ থাকছে না।
নথি ও আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অতীতে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেসব পাসপোর্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলে সেগুলোর নবায়ন নিয়ে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকাকে বারবার আনুষ্ঠানিক তাগিদ দেওয়া হয়। বিষয়টি সৌদি আরবে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর সামগ্রিক শ্রমবাজারের স্থায়িত্ব এবং দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ায় সরকার এই বিশেষ ট্রাভেল ডকুমেন্ট দেওয়ার বিকল্প কৌশল গ্রহণ করে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। এরপর প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে বিশেষ পাসপোর্ট বিতরণের কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রতারণা ও অপব্যবহার ঠেকাতে এই বিশেষ পাসপোর্টে সাধারণ পাসপোর্টের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ক্যাটাগরির পৃথক সিরিয়াল নম্বর যুক্ত করা হয়েছে। একই সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ স্ক্যানসহ পূর্ণাঙ্গ বায়োমেট্রিক তথ্য ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এর ফলে এই সনদের অপব্যবহার করে কেউ যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ভোটার তালিকা বা নিয়মিত নাগরিক সুযোগ-সুবিধার দাবি তুলতে না পারে, তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত করা হয়েছে।


























