বর্তমান অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি মন্তব্য করেন, অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার পরও বিমান গ্রাহকদের মাঝে নিজের পেশাদার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে এই ধরনের বড় বহর সম্প্রসারণের পক্ষে বিমানের কোনো দৃঢ় ও গ্রহণযোগ্য বাণিজ্যিক ভিত্তি নেই। উপরন্তু হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গার কমপ্লেক্সের প্রধান হ্যাঙ্গার বে-তে একসঙ্গে মাত্র ৪ থেকে ৬টি উড়োজাহাজ রাখা যায়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—বিমানের এই মেগা বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ কি সত্যিই নিজস্ব পরিচালনগত প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে, নাকি পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর সাথে সম্পর্কিত কোনো ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান একের পর এক নতুন উড়োজাহাজ ক্রয়, হ্যাঙ্গার ও আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নানামুখী আর্থিক খাতে সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিসহ বিপুল সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এসেছে। এত সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও বৈশ্বিক এভিয়েশন শিল্পে সংস্থাটি কখনোই তেমন কোনো সুনাম বা আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। উল্টো নিম্নমানের যাত্রীসেবা, শিডিউল বিপর্যয় বা সময়ানুবর্তিতার অভাব এবং অতিরিক্ত ভাড়াসহ নানাবিধ স্পর্শকাতর ইস্যুতে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিনিয়ত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে।
অতীতের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিছক বিলিয়ন ডলার খরচ করে নতুন নতুন উড়োজাহাজ কিনে বিমানের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত মৌলিক সংকটের সমাধান করা অসম্ভব। এই মুহূর্তে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সুশাসনের প্রকট ঘাটতি দূর করা এবং পরিচালনগত অচলাবস্থার পাশাপাশি বিপণন কৌশল, আন্তর্জাতিক লাভজনক রুট নির্বাচন ও অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলো সমূলে কাটিয়ে ওঠা।
অর্থনীতিবিদরা তীব্র শঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দূর করে কার্যকরভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও রাজস্ব বৃদ্ধি করতে না পারলে একসঙ্গে এতগুলো নতুন উড়োজাহাজ কেনার বিপুল দায়দেনা ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এমনিতেই বর্তমানে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে জাতীয় বাজেট চরম চাপের মুখে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বার্ষিক পরিশোধের পরিমাণ একলাফে রেকর্ড ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারের উচিত বিমানের বহর সম্প্রসারণের সুনির্দিষ্ট ও বিশদ বাণিজ্যিক পরিকল্পনা অবিলম্বে শ্বেতপত্রের আকারে জনগণের সামনে প্রকাশ করা। তা না হলে এই সম্প্রসারণের পেছনে কোনো অস্পষ্ট রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক উদ্দেশ্য লুকায়িত রয়েছে বলে জনমনে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তিনি আরও সতর্ক করেন, বিমানের সামগ্রিক ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে যদি প্রকৃত রাজস্ব আয় বাড়াতে ব্যর্থ হয়, তবে নতুন উড়োজাহাজ কেনার এই বিপুল বৈদেশিক ঋণের দায়ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ট্যাক্সের অর্থে রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।
কাগজে-কলমে অবশ্য বিমান এখনো একটি ধারাবাহিক নিট মুনাফায় থাকা সরকারি সংস্থা। নিরীক্ষিত সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে বিমানের মোট সম্পদের আর্থিক মূল্যায়ন করা হয়েছে ১৬ হাজার ৮৭২ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৮২ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৩৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা নিট মুনাফা দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে বিমানের উপস্থাপিত এই হিসাব ও মুনাফার সত্যতা নিয়ে দেশের অর্থনীতিবিদ, নিরীক্ষক ও পর্যবেক্ষকদের মাঝে গভীর সংশয় রয়েছে। কারণ অন্যান্য লাভজনক সরকারি করপোরেশন বা সংস্থা তাদের অর্জিত বার্ষিক মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশ জাতীয় রাজস্ব সুরক্ষায় নিয়মিতভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। অথচ বিমান কখনোই তাদের দেখানো মুনাফা বা নগদ লভ্যাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে স্থানান্তর করে না। উপরন্তু বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষসহ (বেবিচক) সরকারের অন্যান্য সেবামূলক সংস্থার হাজার হাজার কোটি টাকার বকেয়া পাওনা পরিশোধ না করার মতো গুরুতর আর্থিক অভিযোগ রয়েছে বিমানের বিরুদ্ধে।
আর্থিক হিসাবে টানাপোড়েনহীন মুনাফার দাবি করলেও বৈশ্বিক মানে বিমানের সেবার মান তলানিতেই পড়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্কাইট্র্যাক্সের গত বছরের জরিপে বিশ্বের সেরা শীর্ষ ১০০ এয়ারলাইন্সের তালিকায় জায়গা করে নিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বিমান বাংলাদেশ। এমনকি আঞ্চলিক পর্যায়ে কেবল দক্ষিণ এশিয়ার এয়ারলাইন্সগুলোর তালিকায় সংস্থাটির অবস্থান ছিল নবম স্থানে। স্কাইট্র্যাক্সের বিশ্বমানের নিরপেক্ষ রেটিংয়ে উড়োজাহাজে যাত্রীদের জন্য আরামদায়ক আসন বিন্যাস, ফ্লাইটের ভেতরে ইনফ্লাইট বিনোদন সুবিধা, পরিবেশিত খাবার ও পানীয়ের গুণমান, অভ্যন্তরীণ কেবিন পরিচ্ছন্নতা এবং ক্রু ও কর্মীদের পেশাদার সেবাসহ যাত্রী অভিজ্ঞতার প্রতিটি সূচক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করা হয়। এসব বৈশ্বিক মূল্যায়নে বিমান টেনেটুনে মাত্র তিন তারকা (থ্রি-স্টার) রেটিং অর্জন করতে পেরেছে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, বিমানের ইতিহাসে প্রথম বড় আকারের বহর আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০০৮ সালে; সে সময় মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে সরাসরি ১০টি আধুনিক উড়োজাহাজ কেনার মেগা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এভিয়েশন বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠানে জেঁকে বসা চরম আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য ও পেশাদারিত্বের ঘাটতির কারণে ওই উদ্যোগ বিমানের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক কৌশলে কোনো মৌলিক রূপান্তর ঘটাতে পারেনি; কাটেনি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত দুর্বলতাও।
১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক এভিয়েশন খাতকে সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ বা ডিরেগুলেশনের আনুষ্ঠানিক নীতি গ্রহণের পর থেকেই আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ—উভয় যাত্রী পরিবহন বাজারে বিমানের একচ্ছত্র হিস্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। বর্তমানে বাংলাদেশকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক রুটের মোট যাত্রী পরিবহন বাজারে বিমানের দখলে রয়েছে মাত্র প্রায় ২৬ শতাংশ হিস্যা; অথচ তিন দশক আগে এই বাজারে বিমানের একচ্ছত্র হিস্যা ছিল ৭৫ শতাংশের ওপরে। এই নাটকীয় পতনের পেছনে আন্তর্জাতিক বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বিমানের অভ্যন্তরীণ দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং অদূরদর্শী ও ত্রুটিপূর্ণ বহর পরিকল্পনাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলের বাজারেও বিমানের একচেটিয়া ১০০ শতাংশ আধিপত্য একলাফে নেমে এসেছে মাত্র প্রায় ২০ শতাংশে। এই বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারটি পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে দেশের স্থানীয় বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো।
বিদ্যমান বাস্তবতায় বিমানের বাজার হিস্যা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক টিকিট বিক্রির আয় সম্প্রসারণ করাই সংস্থাটির প্রধানতম চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এ টি এম নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, উদ্যোগটি নীতিগতভাবে ইতিবাচক। ২০০৮ সালের বহর আধুনিকায়ন উদ্যোগও তৎকালীন সময়ে বিমানকে পুরোপুরি দেউলিয়া বা ধসে পড়া থেকে রক্ষা করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাকে বৈশ্বিক রুটে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে আধুনিক বহর সম্প্রসারণের গুরুত্ব রয়েছে। তবে আসল প্রশ্ন হলো—রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক অযাচিত হস্তক্ষেপ ছাড়া বিমান স্বাধীনভাবে তার বাণিজ্যিক বিপণন কৌশল, নতুন রুট নির্ধারণ এবং সামগ্রিক টেকসই আর্থিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারবে কি না।
তিনি আরও মত দেন, বহরে ভিন্ন ভিন্ন মডেলের উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত হলে পরিচালনগত জটিলতা তৈরি নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই; কারণ বোয়িংয়ের বিভিন্ন মডেল পরিচালনার জন্য বিমানে ইতোমধ্যে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষিত টেকনিক্যাল জনবল রয়েছে। বিমানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বাজারের সামগ্রিক আয়ে নিজেদের হিস্যা ব্যাপকভাবে বাড়ানো, যাতে দেশের অভ্যন্তরেই মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখা সম্ভব হয়।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানযাত্রার বিশাল বাজার থেকে ৩০টিরও বেশি বিদেশি মেগা এয়ারলাইন্স সব মিলিয়ে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব আয় করে নিয়ে যাচ্ছে। বিপরীতে বিমান এবং ইউএস-বাংলাসহ সব দেশীয় এয়ারলাইন্স যৌথভাবে আয় করতে পারছে মাত্র ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। তবে অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকারের সাম্প্রতিক কিছু সংস্কার উদ্যোগ বিমানের জন্য আশাব্যঞ্জক। পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ পদগুলোতে আমলাদের পরিবর্তে যথাযথ আন্তর্জাতিক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়া হলে এবং বৈশ্বিকভাবে সফল ক্যারিয়ারগুলোর মতো বাণিজ্যিক মডেলে চালানো গেলে সংস্থাটির আমূল রূপান্তর ঘটানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানের বর্তমান প্রশাসনে বিশেষায়িত এভিয়েশন দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। বিমানের পরিচালনা পর্ষদের অধিকাংশ সদস্যই সরকারের নিয়মিত ঊর্ধ্বতন আমলা। অন্যদিকে, নতুন রুট নির্ধারণ ও ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রায়শই বাণিজ্যিক সম্ভাবনার চেয়ে ভূরাজনৈতিক প্রভাব, দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সক্রিয় বহরে সর্বমোট ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এগুলো দিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রুট মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬৫টি শিডিউল ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে দূরপাল্লার ৪টি ওয়াইডবডি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার ইউরোপ, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটে এবং ২টি ওয়াইডবডি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার সরাসরি লন্ডন ও ম্যানচেস্টার রুটে নিয়মিত চলাচল করে। এছাড়া ৪টি সুপরিসর ওয়াইডবডি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় প্রবাসী শ্রমবাজারের রুট ছাড়াও বার্ষিক বিশেষ হজ ফ্লাইটে অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মাঝারি দূরত্বের ৪টি ন্যারোবডি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ভারতের পাশাপাশি মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড রুটে এবং ৫টি ছোট আকারের ডি হ্যাভিল্যান্ড ড্যাশ-৮ টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজ অভ্যন্তরীণ ও স্বল্প দূরত্বের আঞ্চলিক রুটে যাত্রী পরিবহন করছে।
তবে ঢাকা থেকে উচ্চ আয়ের আন্তর্জাতিক ফিফথ-ফ্রিডম এবং ইউরোপ-আমেরিকাগামী আকর্ষণীয় ট্রানজিট যাত্রী পরিবহন বাজার প্রায় পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স ও এয়ারএশিয়ার মতো আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিমানের রুট নেটওয়ার্ক লাভজনক আন্তঃএশীয় আন্তর্জাতিক হাবভিত্তিক ট্রানজিট সংযোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে পড়েছে।
অতীতের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রবাসীদের আবেগকে পুঁজি করে ঢাকা-টরন্টো এবং ঢাকা-ম্যানচেস্টারের মতো চরম ব্যয়বহুল কয়েকটি দীর্ঘ দূরত্বের রুট চালু করা হলেও সেখান থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব লাভ করা যায়নি। এসব রুটে অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিজনেস ক্লাস আসনের বাণিজ্যিক চাহিদা অপ্রতুল হওয়ায় এবং আকাশচুম্বী পরিচালন ব্যয়ের কারণে রুটগুলো সংস্থাটির জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী এ বিষয়ে বলেন, সরকারকে আবেগের বাইরে এসে শতভাগ বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিমানকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তা নিশ্চিত করা না গেলে হাজার হাজার কোটি টাকা এবং কয়েক বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক ঋণের চুক্তির মাধ্যমে বিমানের এই বহর সম্প্রসারণ শেষ পর্যন্ত গোটা রাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্যই এক বিশাল বিপদের কারণ হয়ে উঠবে।
বিমান কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় বোয়িং এবং ইউরোপীয় এয়ারবাস থেকে নতুন আধুনিক উড়োজাহাজ সংগ্রহ করে মালদ্বীপ, মিয়ানমার, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো সম্ভাবনাময় দেশগুলোতে নতুন আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনায় বিমান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সরাসরি দূরপাল্লার ফ্লাইট পুনরায় চালু, টরন্টো রুটে ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধি, দূরবর্তী অস্ট্রেলিয়ায় নিয়মিত ফ্লাইট চালু এবং ইউরোপের অন্যান্য বড় শহরে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করতে চায়। এর পাশাপাশি হজ মৌসুমে সৌদি আরবের অধিক লাভজনক রুটগুলোতে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘অর্থনীতির পুনঃকৌশল নির্ধারণবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্স’-এর প্রতিবেদনে জাতীয় এয়ারলাইন্সটি নিয়ে এক কঠোর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, বিগত অর্ধশতাব্দীতে বিমান আধুনিক বাণিজ্যিক এভিয়েশনের সামগ্রিক কর্মদক্ষতার সব বৈশ্বিক মানদণ্ড পূরণ করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। সংস্থাটি মূলত প্রবাসী বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের একটি ক্যাপটিভ মার্কেট বা বিকল্পহীন নির্দিষ্ট যাত্রীবাজারের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কোনোমতে টিকে রয়েছে; যে যাত্রীরা প্রতিনিয়ত বিমানের চরম নিম্নমানের সেবা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ওই টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে একটি সাহসী কাঠামোগত প্রস্তাব দিয়ে বলা হয়েছিল—বিমানের বিদ্যমান উড়োজাহাজ ও অবকাঠামোগত সম্পদের অর্ধেক ব্যবহার করে একটি সম্পূর্ণ নতুন আন্তর্জাতিক মানের সমান্তরাল এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যার সার্বিক পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এভিয়েশন ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের হাতে। এর ফলে একটি স্বাস্থ্যকর দ্বৈত কাঠামোর মাধ্যমে দুটি পৃথক এয়ারলাইন্সকে ভিন্ন ভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজার ও রুট টার্গেট করে পরিচালনা করা সম্ভব হবে এবং একই সাথে তাদের মধ্যে একটি সুস্থ বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত হবে।


























