ম্যানচেস্টার-সিলেট রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট আকস্মিকভাবে বন্ধের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ব্রিটেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবিতে গ্রেটার ম্যানচেস্টার ও নর্থ ওয়েস্ট অঞ্চলের আটজন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য (এমপি) সম্মিলিতভাবে বিমান কর্তৃপক্ষকে একটি কঠোর চিঠি দিয়েছেন, যা রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এই এয়ারলাইন্সের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ব্রিটিশ রাজনীতিকদের এই অভূতপূর্ব হস্তক্ষেপের ফলে লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশন ও বিমান বাংলাদেশের শীর্ষ মহলে অস্বস্তি বিরাজ করছে।
গত ৯ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে বিমান বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শফিউল আজিমকে পাঠানো এই চিঠিতে এমপিরা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ফ্লাইট বাতিলের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। চিঠির একটি অনুলিপি লন্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনারকেও পাঠানো হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও কূটনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। রচডেলের এমপি পল ওয়াহ এবং ম্যানচেস্টার রাশহোমের এমপি আফজাল খানের নেতৃত্বে এই আটজন সাংসদ প্রশ্ন তুলেছেন, ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এই ‘লাইফলাইন’ রুটটি কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই কেন স্থগিত করা হচ্ছে।
কৌশল নাকি অন্তর্ঘাত?
ফ্লাইট বন্ধের সিদ্ধান্তকে ঘিরে ‘কৌশল নাকি অন্তর্ঘাত’ — এমন প্রশ্ন এখন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্যদের মধ্যেও ঘুরপাক খাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, এই রুটটি বন্ধ হওয়া নিছক কোনো ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে। বরং, বিমান বাংলাদেশের অভ্যন্তরের একটি প্রভাবশালী মহল অন্য কোনো মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এয়ারলাইন্সকে সুবিধা দিতে কিংবা লাভজনক এই রুটটিকে কৃত্রিমভাবে অলাভজনক প্রমাণ করতে ‘অন্তর্ঘাতের’ আশ্রয় নিচ্ছে কিনা, তা নিয়ে এমপিদের মধ্যেই গভীর সন্দেহ দেখা দিয়েছে। যেখানে এই রুটে সব সময় প্রায় শতভাগ যাত্রী পূর্ণ থাকে, সেখানে কর্তৃপক্ষ কেন ফ্লাইট বন্ধ করতে চাইছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিপাকে হাজারো প্রবাসী
ফ্লাইট বাতিলের খবরে ম্যানচেস্টার ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী হাজার হাজার সিলেটি প্রবাসী চরম ক্ষোভ ও হতাশায় ভুগছেন। এমপিরা তাদের চিঠিতে উল্লেখ করেছেন যে, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বুকিং সিস্টেম থেকে ম্যানচেস্টার-সিলেট ফ্লাইট সরিয়ে নেওয়ায় প্রবাসীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। পরোক্ষ বা কানেক্টিং ফ্লাইটে যাতায়াত করা কেবল ব্যয়বহুলই নয়, বয়স্ক এবং অসুস্থ রোগীদের জন্য এটি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। অথচ বিমান কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ইতোমধ্যে সভা-সমাবেশ করছেন এবং দ্রুত এ সমস্যার সমাধানের দাবি জানাচ্ছেন।
একত্রিত আট এমপি ও তাদের দাবি
বিমানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যে আটজন এমপি একজোট হয়েছেন তারা হলেন, পল ওয়াহ (রচডেল), আফজাল খান (ম্যানচেস্টার রাশহোম), অ্যান্ড্রু গুইন (গর্টন অ্যান্ড ডেন্টন), জিম ম্যাকমাহন (ওল্ডহাম ওয়েস্ট), ডেবি আব্রাহামস (ওল্ডহাম ইস্ট), সারাহ হল (ওয়ারিংটন সাউথ), নাভেন্দু মিশ্র (স্টকপোর্ট) এবং জেফ স্মিথ (ম্যানচেস্টার উইথিংটন)। নর্থ ওয়েস্ট ইংল্যান্ডের রাজনীতিকদের এমন ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রমাণ করে যে, তারা এই রুটটিকে কেবল বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন না, বরং একটি অত্যাবশ্যকীয় সামাজিক ও মানবিক সংযোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
এই এমপিরা স্পষ্টভাবে তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন: রুটের বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করা, স্থগিতের পেছনের আসল কারণ ব্যাখ্যা করা এবং এই পরিষেবা পুনরায় সচল করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তা দ্রুত জানানো। ১ ফেব্রুয়ারির সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, ব্রিটেনের বাংলাদেশি কমিউনিটির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন ঢাকা ও লন্ডনের সিদ্ধান্তের দিকে। বিমান বাংলাদেশ কি তাদের বিশ্বস্ত যাত্রীদের গুরুত্ব দেবে, নাকি অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে ঐতিহাসিক এই রুটটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে – সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এই নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার ও বিমান কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই ম্যানচেস্টার-সিলেট রুটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
রিপোর্টারের নাম 

























