আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে প্রবাসীদের জন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যেখানে সারা বিশ্বের প্রায় সাড়ে সাত লাখেরও বেশি বাংলাদেশি সাড়া দিয়েছেন। সোয়া কোটিরও বেশি প্রবাসীর মধ্যে এই নিবন্ধনের হার প্রায় ৬.১৮ শতাংশ। যদিও ইসি এই সংখ্যাকে বৈশ্বিক রেকর্ডের তুলনায় ‘সাফল্য’ হিসেবে দেখছে, তবে এই ভোটগুলো শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের জয়-পরাজয়ে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে জনমনে এবং বিশেষজ্ঞ মহলে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যমতে, ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে দেশ ও প্রবাস মিলিয়ে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরে নির্বাচনি দায়িত্ব পালনকারী, কারাবন্দি এবং নিজ এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি চাকুরিজীবী মিলিয়ে আরও ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ জন নিবন্ধিত হয়েছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১২ লাখ ৮১ হাজার ৪৩৫ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৫২ হাজার ২৪৬ জন। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পরপরই নিবন্ধিত ভোটাররা নিজ নিজ আসনের প্রার্থীর অনুকূলে ভোট দিয়ে ডাকযোগে তা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে পারবেন।
এই বিশাল সংখ্যক পোস্টাল ব্যালট কোনো আসনের ভাগ্য বদলে দিতে পারবে কি না—এমন প্রশ্নে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম মনে করেন, আসনভিত্তিক এই ভোটার সংখ্যা জয়-পরাজয়ের বড় নিয়ামক হওয়ার সম্ভাবনা কম। তার যুক্তি অনুযায়ী, প্রতিটি আসনে পোস্টাল ব্যালটের ভোটগুলো কোনো একক প্রার্থীর দিকে না গিয়ে বিভিন্ন প্রার্থীর মধ্যে ভাগ হয়ে যেতে পারে। এছাড়া ডাকযোগে ব্যালট পাঠানো এবং তা সময়মতো রিটার্নিং কর্মকর্তার হাতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তাই কোনো আসনে ৫-১০ হাজার ভোট থাকলেও তা চূড়ান্ত ফলে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে বলে তিনি মনে করেন না।
তবে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার প্রবাসীদের এই সাড়াকে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে খুব সামান্য ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়। সেসব ক্ষেত্রে ৫-১০ হাজার বাড়তি ভোট অবশ্যই ‘ডিসাইডিং ফ্যাক্টর’ বা ভাগ্যনির্ধারক হিসেবে কাজ করবে। ইসির তথ্য অনুযায়ী, ফেনী-৩ আসনে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৯৩ জন প্রবাসী নিবন্ধন করেছেন। এছাড়া ১১টি আসনে ৭ হাজারের বেশি এবং ২১টি আসনে ৬ হাজারের বেশি প্রবাসী ভোটার রয়েছেন। এই পরিসংখ্যান নির্দেশ করে যে, অন্তত ৪৬টি আসনে ৫ হাজারের বেশি প্রবাসী ভোটার রয়েছেন, যা অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর জন্য মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এই পদ্ধতির আধুনিকায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, ডিজিটাল যুগে এসে ডাকযোগের ওপর নির্ভর করা অনেকটা ‘অপ্রচলিত’ চিন্তা। তার মতে, কোটি নাগরিকের বিপরীতে সাড়ে সাত লাখ নিবন্ধন বেশ নগণ্য। তিনি আরও সতর্ক করেছেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যালট পেপারের কপি ছড়িয়ে পড়ায় ভোটের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তার পরামর্শ হলো, ভবিষ্যতে আরও বিশ্বাসযোগ্য এবং নিরাপদ ওয়েব বা মোবাইল ইন্টারফেস নিশ্চিত করতে হবে। এবারের এই ‘পাইলটিং’ অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত ত্রুটিগুলো পরবর্তী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংশোধন করা হবে কি না, তা নিয়ে ইসি এখনই সুনির্দিষ্ট কিছু না জানালেও অভিজ্ঞতার গুরুত্ব স্বীকার করেছে।
রিপোর্টারের নাম 

























