মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের সাম্প্রতিক হুমকি সামরিক জোট ন্যাটোর ভেতরে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মেরু অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোকে ঠেকাতে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ কৌশলগতভাবে জরুরি বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করলেও, এই পদক্ষেপ ন্যাটোর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে। এই ঘটনায় ইউরোপীয় ও কানাডীয় নেতারা দ্রুত ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এমন একতরফা পদক্ষেপ ন্যাটোর ইতিহাসে নজিরবিহীন সংকট তৈরি করবে।
গ্রিনল্যান্ডে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত পিটুফিক স্পেস বেস রয়েছে, যা ডেনিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। এর মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি স্পষ্ট। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি জোরপূর্বক গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা করে, তবে তা ন্যাটোর সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা নীতির মূল ভিত্তি, উত্তর আটলান্টিক চুক্তির অনুচ্ছেদ ৫ কে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী, ন্যাটোর কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা সকল সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু দুটি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত দেখা দিলে এই অনুচ্ছেদ কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ, জোট নিজের বিরুদ্ধেই সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে না এবং এর জন্য সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে ন্যাটো কার্যত অচল হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ন্যাটোর ইতিহাসে সদস্যদের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা এর আগেও একাধিকবার দেখা গেছে। ১৯৫৮ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ও আইসল্যান্ডের মধ্যে ‘কড যুদ্ধ’ নামে পরিচিত নৌ সংঘাত হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে সাইপ্রাস ইস্যুতে গ্রিস ও তুরস্ক প্রায় সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি ১৯৯৫ সালে মাছ ধরার অধিকার নিয়ে কানাডা ও স্পেনের মধ্যেও নৌ-সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এছাড়া সুয়েজ খাল সংকট, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, কসোভো অভিযান, ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ এবং ২০১১ সালের লিবিয়া হস্তক্ষেপ নিয়েও ন্যাটোর ভেতরে গভীর মতভেদ দেখা গেছে। যদিও এসব সংকট সত্ত্বেও ন্যাটো কখনও ভেঙে পড়েনি, কিন্তু গ্রিনল্যান্ড ইস্যু জোটের ঐক্য, বিশ্বাসযোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ টিকে থাকার এক বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মেরু অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ সংহতিকে এমন এক বিপজ্জনক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে, যা এর দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্বের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। যদি যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দখলের মতো কোনো একতরফা পদক্ষেপ নেয়, তবে তা শুধু ডেনমার্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কই নয়, বরং পুরো ন্যাটো জোটের কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তার অঙ্গীকারকেও প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
রিপোর্টারের নাম 

























