ঢাকা ০৮:২৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

দেশজুড়ে মাদকাসক্তি: ৮২ লাখ ব্যবহারকারীর মধ্যে ৬০ শতাংশই কিশোর ও তরুণ, উদ্বেগজনক চিত্র

দেশে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্তির শিকার, যার মধ্যে এক বিরাট অংশই কিশোর ও তরুণ। দুঃখজনকভাবে, এদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি ১৮ বছর বয়সের আগেই প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে। এই ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণার ফলাফলে, যা দেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে।

রবিবার (২৫ জানুয়ারি) রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরণ ও সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। মানবদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণাটি দেশের মাদকাসক্তির গভীরতা এবং এর বিস্তারের চিত্র তুলে ধরেছে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বিশেষ অতিথি হিসেবে তাঁর মূল্যবান বক্তব্য রাখেন।

গবেষণাটি দেশের আটটি বিভাগের মোট ১৩টি জেলা এবং ২৬টি উপজেলা থেকে ৫ হাজার ২৮০ জন ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। এতে পরিমাণগত (কোয়ান্টিটেটিভ) এবং গুণগত (কোয়ালিটেটিভ) উভয় পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে, যা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা বাড়িয়েছে।

গবেষক দলের প্রধান, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী তাঁর বক্তব্যে জানান, দেশে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা। এর পরে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল এবং কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপের মতো মাদকদ্রব্যগুলোর ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য। তিনি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যাও বেড়েই চলেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শহরাঞ্চলে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি হলেও, গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার দ্রুত ঘটছে। সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী ঢাকা বিভাগে, যেখানে বরিশাল বিভাগে এই সংখ্যা সর্বনিম্ন। তবে, সীমান্তবর্তী জেলা এবং বড় শহরগুলোর আশেপাশে মাদক ব্যবহার ও সরবরাহের ঝুঁকি বেশি বলে গবেষণায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় উঠে আসা এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ৬০ শতাংশের বেশি মাদক ব্যবহারকারী তাদের জীবনের প্রথম মাদক গ্রহণ করেছে ১৮ বছর বয়সের আগেই। মাদক গ্রহণের প্রধান কারণ হিসেবে বন্ধুদের প্রভাব, কৌতূহল, পারিবারিক অশান্তি এবং মানসিক চাপকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

দুঃখজনকভাবে, মাদকাসক্তদের একটি বড় অংশ কখনোই কোনো ধরনের চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পায় না। যারা সেবা গ্রহণ করেন, তাদের অনেকেই প্রয়োজনীয় ও ধারাবাহিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। এর ফলে মাদকাসক্তিতে পুনরায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।

বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, মাদক সমস্যা কেবল আইন-শৃঙ্খলাজনিত বিষয় নয়, বরং এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় প্রতিরোধের পাশাপাশি কার্যকর চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক পুনঃএকীকরণের উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। একই সাথে, কিশোর ও তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে আরও শক্তিশালী ও ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

খেলার সূচি: আজ টিভিতে যেসব ক্রিকেট ও ফুটবল ম্যাচ দেখা যাবে

দেশজুড়ে মাদকাসক্তি: ৮২ লাখ ব্যবহারকারীর মধ্যে ৬০ শতাংশই কিশোর ও তরুণ, উদ্বেগজনক চিত্র

আপডেট সময় : ০১:৩০:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

দেশে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্তির শিকার, যার মধ্যে এক বিরাট অংশই কিশোর ও তরুণ। দুঃখজনকভাবে, এদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি ১৮ বছর বয়সের আগেই প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে। এই ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণার ফলাফলে, যা দেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে।

রবিবার (২৫ জানুয়ারি) রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরণ ও সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। মানবদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণাটি দেশের মাদকাসক্তির গভীরতা এবং এর বিস্তারের চিত্র তুলে ধরেছে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বিশেষ অতিথি হিসেবে তাঁর মূল্যবান বক্তব্য রাখেন।

গবেষণাটি দেশের আটটি বিভাগের মোট ১৩টি জেলা এবং ২৬টি উপজেলা থেকে ৫ হাজার ২৮০ জন ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। এতে পরিমাণগত (কোয়ান্টিটেটিভ) এবং গুণগত (কোয়ালিটেটিভ) উভয় পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে, যা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা বাড়িয়েছে।

গবেষক দলের প্রধান, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী তাঁর বক্তব্যে জানান, দেশে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা। এর পরে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল এবং কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপের মতো মাদকদ্রব্যগুলোর ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য। তিনি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যাও বেড়েই চলেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শহরাঞ্চলে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি হলেও, গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার দ্রুত ঘটছে। সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী ঢাকা বিভাগে, যেখানে বরিশাল বিভাগে এই সংখ্যা সর্বনিম্ন। তবে, সীমান্তবর্তী জেলা এবং বড় শহরগুলোর আশেপাশে মাদক ব্যবহার ও সরবরাহের ঝুঁকি বেশি বলে গবেষণায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় উঠে আসা এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ৬০ শতাংশের বেশি মাদক ব্যবহারকারী তাদের জীবনের প্রথম মাদক গ্রহণ করেছে ১৮ বছর বয়সের আগেই। মাদক গ্রহণের প্রধান কারণ হিসেবে বন্ধুদের প্রভাব, কৌতূহল, পারিবারিক অশান্তি এবং মানসিক চাপকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

দুঃখজনকভাবে, মাদকাসক্তদের একটি বড় অংশ কখনোই কোনো ধরনের চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পায় না। যারা সেবা গ্রহণ করেন, তাদের অনেকেই প্রয়োজনীয় ও ধারাবাহিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। এর ফলে মাদকাসক্তিতে পুনরায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।

বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, মাদক সমস্যা কেবল আইন-শৃঙ্খলাজনিত বিষয় নয়, বরং এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় প্রতিরোধের পাশাপাশি কার্যকর চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক পুনঃএকীকরণের উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। একই সাথে, কিশোর ও তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে আরও শক্তিশালী ও ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।