আন্তর্জাতিক নদী আইন ও প্রতিবেশীসুলভ আচরণের তোয়াক্কা না করে অভিন্ন নদীর পানিকে বাংলাদেশের বিপক্ষে অনেকটা ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছে ভারত। কোনো ধরনের আগাম সতর্কতা ছাড়াই হঠাৎ করে উজানের বাঁধগুলো খুলে দেওয়ায় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জনপদ এখন ভয়াবহ বন্যার কবলে। তথ্য ও উপাত্ত আদান-প্রদান না করে এভাবে পানি ছেড়ে দেওয়াকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন এবং ‘পানি আগ্রাসন’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভারত তাদের ডাম্বুর ও গজলডোবাসহ বিভিন্ন বাঁধের গেট কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই উন্মুক্ত করে দেওয়ায় মুহূর্তের মধ্যে বাংলাদেশে পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও মৌলভীবাজারের মতো জেলাগুলোতে যে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, তার মূল কারণ উজানের অনিয়ন্ত্রিত পানিপ্রবাহ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, উজানের কোনো দেশ যদি বাঁধের গেট খুলে দিতে চায়, তবে ভাটির দেশকে নির্দিষ্ট সময় আগে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিকে দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে দিল্লি। শুষ্ক মৌসুমে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশকে মরুভূমিতে পরিণত করা হয়, আবার বর্ষা মৌসুমে নিজেদের বিপদ এড়াতে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশে কৃত্রিম বন্যা সৃষ্টি করা হয়। এই দ্বিমুখী নীতি কেবল পরিবেশগত বিপর্যয়ই নয়, বরং বাংলাদেশের জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপকূলীয় ও সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে লাখ লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি। ঘরবাড়ি, গবাদি পশু ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে হাজারো পরিবার। আকস্মিক এই বিপর্যয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীদের। কোনো প্রকার পূর্বাভাস না থাকায় জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ন্যূনতম সুযোগটুকুও পায়নি সাধারণ মানুষ।
এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের দাবি জোরালো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে এবং পানি নিয়ে ভারতের এই ‘রণকৌশল’ বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন। পানির মতো একটি মৌলিক ও প্রাকৃতিক সম্পদকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ না হলে দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও মানবিক সংকটের ঝুঁকি আরও বাড়বে। বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষায় অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক আইন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
রিপোর্টারের নাম 


















