আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনৈতিক অঙ্গন সরগরম হয়ে উঠেছে। জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে বর্তমানে ৪৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যেখানে মূল দলগুলোর কৌশল ও জোট সমীকরণ এক জটিল রাজনৈতিক আবহ তৈরি করেছে। প্রধান দুটি দলের শরিকদের জন্য আসন ছাড়ের সিদ্ধান্ত এবং এর ফলে সৃষ্ট বিদ্রোহী প্রার্থীদের তৎপরতা এবারের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়। বিশেষত, বিএনপি তাদের জোটসঙ্গীদের জন্য দুটি আসন ছেড়ে দিয়ে চারটি আসনে নিজস্ব প্রার্থী দিলেও, বেশ কয়েকটি আসনে দলটির বহিষ্কৃত ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা দলের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর):
হাওরবেষ্টিত নাসিরনগর আসনে ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৯ জন। এখানে বিএনপির প্রার্থী এম এ হান্নান, জামায়াতের অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির শাহ আলম, ইসলামী আন্দোলনের হুসাইন আহম্মদ, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের শরীফ মৃধা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এ কে এম কামরুজ্জামান ও ইকবাল চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই আসনে মূল লড়াই হবে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াত জোটের প্রার্থীর। এছাড়া, বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা এ কে এম কামরুজ্জামান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে একটি চমক দেখাতে পারেন বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ):
এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৯ হাজার ২৬৬ জন। বিএনপি এখানে নিজেদের কোনো প্রার্থী না দিয়ে তাদের জোটসঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহসভাপতি জুনায়েদ আল হাবিবকে সমর্থন দিয়েছে, যিনি খেজুর গাছ প্রতীকে লড়ছেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন এনসিপির আশরাফ উদ্দিন মাহ্দী। তবে এই আসনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত ও দল থেকে বহিষ্কৃত সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। জাতীয় পার্টির জিয়াউল হক মৃধা, ইসলামী আন্দোলনের নেছার আহম্মেদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের তৈমুর রেজা মো. শাহজাদ, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মাইন উদ্দিন, আমজনতার দলের শরিফা আক্তার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এ তরুণ দে-ও এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রুমিন ফারহানার সঙ্গে বিএনপি জোটের প্রার্থী হাবিব এবং জামায়াত জোটের প্রার্থীর মধ্যেই ত্রিমুখী লড়াই হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর):
সদর ও বিজয়নগর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার ৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৮০ জন। এখানে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন প্রকৌশলী খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল। জামায়াত জোটের প্রার্থী এনসিপির মো. আতাউল্লাহ। এছাড়াও, জাতীয় পার্টির রেজাউল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের নিয়াজুল করিম, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের আবু হানিফ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের আয়েশা আক্তার এবং খেলাফত মজলিসের মো. এমদাদুল্লাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্য প্রার্থীরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল হওয়ায় বিএনপির প্রার্থী প্রকৌশলী খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া):
এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৯০৯ জন। বিএনপি থেকে প্রথমে দুজনকে প্রার্থী করা হলেও, পরবর্তীতে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ড. মুশফিকুর রহমান। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন আতাউর রহমান সরকার। জাতীয় পার্টির জহিরুল হক খান, গণঅধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের মো. জসিম, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের রাফিউদ্দিন এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টির শাহিন খানও এই আসনে লড়ছেন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াত প্রার্থীর মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর):
নবীনগর আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৮২৬ জন। এখানে বিএনপির প্রার্থী আবদুল মান্নান। জামায়াত জোট থেকে প্রার্থী হয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমজাদ হোসাইন। ইসলামী আন্দোলনের নজরুল ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলনের নাহিদা জাহান, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের আশরাফুল হক, জাতীয় পার্টির কামরুল ইসলাম, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির শাহিন খান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী নাজমুল হোসেনও এই আসনে লড়বেন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে দলটির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী নাজমুল হোসেনের মধ্যেই মূল লড়াই হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর):
এই আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৮৯ হাজার ৬৭৪ জন। বিএনপি এখানে কোনো নিজস্ব প্রার্থী না দিয়ে তাদের জোটসঙ্গী গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জুনায়েদ সাকিকে সমর্থন দিয়েছে, যিনি ‘মাথাল’ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এই আসনের বাকি প্রার্থীরা হলেন জামায়াতে ইসলামীর মো. মহসিন, ইসলামী আন্দোলনের মাইন উদ্দিন খান, গণঅধিকার পরিষদের শফিকুল ইসলাম, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের আবু নাছের, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের কে এম জাবির, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির শফিকুল ইসলাম, স্বতন্ত্র প্রার্থী ড. সায়দুজ্জামান কামাল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু কায়েস সিকদার। এই আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী, দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী এবং জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে একটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম জানান, “আমরা চারটি আসনে বিএনপির প্রার্থী দিয়েছি। বাকি দুটি আসন আমাদের জোটসঙ্গীদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের জয়ী করতে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছি।”
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আমির মোবারক হোসেন বলেন, “আমরা তিনটি আসনে জোটপ্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছি এবং তাদের জন্য আসন ছেড়ে দিয়েছি। জোট থেকে যারা মনোনীত হয়েছেন, তাদের পক্ষে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছি।”
রিপোর্টারের নাম 


















