বাংলাদেশের সঙ্গে অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য ও সুষ্ঠু বণ্টনের দাবি বারবার উত্থাপন করা সত্ত্বেও ভারত এ বিষয়ে কার্যকর কোনো সাড়া দিচ্ছে না। কূটনৈতিক চ্যানেলে একাধিকবার চিঠি ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে পানি বণ্টনের আহ্বান জানানো হলেও দিল্লি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা এড়িয়ে চলছে। এর ফলে উজানের দেশ হিসেবে ভারত অভিন্ন নদ-নদীর পানিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা। শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রত্যাহার এবং বর্ষায় হঠাৎ বাঁধ খুলে দিয়ে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত করার কারণে দেশের কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতি মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ বহুবার ভারতকে চিঠি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাপ্য পানি বুঝিয়ে দেওয়া এবং যৌথ নদী কমিশনের বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের আহ্বান জানানো হলেও দিল্লির পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো জবাব মেলেনি। সরকারের নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত, উজানের দেশ হিসেবে ভারত অভিন্ন নদ-নদীর পানিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করছে ভারত। শুষ্ক মৌসুমে উজানে অবৈধভাবে পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে, আবার বর্ষায় হঠাৎ বাঁধ খুলে দিয়ে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করা হচ্ছে। এসব বিষয় তুলে ধরে বিভিন্ন চ্যানেলে একাধিকবার ভারতকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, মাঝেমধ্যে কারিগরি পর্যায়ে দুয়েকটি বৈঠক হলেও মন্ত্রী বা সচিব পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী বৈঠক এড়িয়ে চলছে ভারত। উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বসতে দিল্লিকে কোনোভাবেই রাজি করানো যাচ্ছে না।
জেআরসি সূত্র অনুযায়ী, গত ৯ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে জেআরসির সর্বশেষ কারিগরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রকৌশলী ড. আবুল হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল ওই বৈঠকে অংশ নেয়। সেখানে পদ্মা/গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন ছাড়াও ধরলা, দুধকুমার, গোমতী, খোয়াই, মনু ও মুহুরীসহ ১৪টি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক আইন, রীতি ও নিয়ম মেনে অভিন্ন সব নদীর পানি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হলেও বৈঠকের পর থেকে দিল্লি সব ধরনের যোগাযোগ এড়িয়ে চলছে বলে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা উল্লেখ করেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরের দিকে শেষ হচ্ছে। চুক্তি বলবৎ থাকাকালীন সময়েই বাংলাদেশ ন্যায্য পানি পাচ্ছে না। মেয়াদ শেষ হলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা চিন্তিত। তিনি আরও জানান, তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে কার্যত কোনো আলোচনা নেই। উল্টো উজানে অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ করে ভারত নামমাত্র পানিপ্রবাহ রেখে প্রায় পুরোটা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। অথচ কুশিয়ারা নদী থেকে সেচের জন্য পানি উত্তোলনে বাংলাদেশ উদ্যোগ নিলে ভারত বাধা দিচ্ছে। ফেনী ও তিতাসসহ সীমান্তবর্তী অন্তত সাতটি নদীতে ভারত মারাত্মক ক্ষতিকর বর্জ্য ফেলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কর্মকর্তা পর্যায়ে নয়, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির সভাপতি মোস্তফা কামাল মজুমদার মনে করেন, উজানের দেশ হিসেবে ভারত পানিকে নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি লঙ্ঘন করে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করছে। বর্ষায় বাঁধ খুলে ফসল ধ্বংস করছে, আবার শুষ্ক মৌসুমে উজানে পানি আটকে দিয়ে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। তিনি আরও বলেন, পদ্মা ও তিস্তাসহ ছোট-বড় প্রায় সব নদীই আজ শুকিয়ে যাচ্ছে। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ভারতকে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে চাপ দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফোরামে এখনই যেতে হবে বাংলাদেশকে।
গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি অনুযায়ী ১ থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের ৬৭ হাজার ৫১৬ কিউসেক পানি পাওয়ার কথা থাকলেও নদীতে পানির প্রবাহ কম অজুহাতে এবার তা দেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ফারাক্কা ব্যারাজসহ গঙ্গা অববাহিকায় সাতটি ক্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক পানি অবৈধভাবে সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। এছাড়াও ভারত ভাগীরথী নদীর ওপর জঙ্গিপুরের কাছে ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ফিডার ক্যানেল নির্মাণ করেছে। জঙ্গিপুর ব্যারাজ নামের এই প্রকল্পের লক্ষ্যই হলো ফারাক্কা পয়েন্টের ৪০ হাজার কিউসেক পানি হুগলী ও ভাগীরথী নদীতে সরিয়ে নেওয়া। এর ফলে একদিকে হুগলী নদীর নাব্য বৃদ্ধি পেয়ে কলকাতা পোর্ট সারা বছর সচল থাকবে এবং অন্যদিকে ভাগীরথী নদীর বাড়তি পানি ব্যবহার করে বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচ সুবিধা বৃদ্ধি করা যাবে। ফারাক্কার উজানে উত্তর প্রদেশ রাজ্যের কানপুরে গঙ্গার ওপর আরও একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ভারত গঙ্গার ওপর জলাধার, ক্রসড্যাম, রেগুলেটরসহ অন্তত ৩৩টি বড় অবকাঠামো নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করছে। উত্তর প্রদেশ ও বিহার রাজ্যে শত শত পয়েন্ট দিয়ে সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পানি সরানো হচ্ছে, যার ফলে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সরকারের ন্যূনতম উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, আশা করা হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক পানি কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করে বিশ্বদরবারে ভারতের পানি আগ্রাসনের বিষয়টি তুলে ধরবে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় না হওয়ার পেছনে দুর্বল পররাষ্ট্রনীতিকে দায়ী করে তিনি বলেন, দুদেশের অভিন্ন ৫৪টি নদীর ৫১টি নদীতে আন্তর্জাতিক নদী আইন অমান্য করে ভারত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উজানে অসংখ্য বাঁধ, ব্যারাজ দিয়েছে এবং ভিন্নখাতে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করছে। ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প আন্তর্জাতিক নদী আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এর ফলে বাংলাদেশ মরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ভারতের দিকে না তাকিয়ে দ্রুত আন্তর্জাতিক ফোরামে যাওয়ার বিকল্প নেই।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, তিস্তা নদীনির্ভর উত্তরাঞ্চলের কৃষি আজ সংকটে। স্বাভাবিকভাবে যেখানে ন্যূনতম ১০ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা, সেখানে শুষ্ক মৌসুমে ২০০ কিউসেকও পাওয়া যাচ্ছে না। জেআরসি সূত্র অনুযায়ী, ১৯৮৭ সাল থেকেই ভারত একতরফাভাবে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করছে। ২০০০ সালের দিকে এ সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করে। এরপরই ভারতের সঙ্গে এ চুক্তির বিষয়টি নিয়ে জোরালো পদক্ষেপ নেয় বাংলাদেশ। তবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতারণামূলক পদক্ষেপের কারণে এ চুক্তিটি এখনো ঝুলে আছে বলে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান। তিনি বলেন, চুক্তি হলেই বাংলাদেশ পানি পাবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ তিস্তার দুদেশের সীমান্ত এলাকায় তো পানিই নেই। নদীর উজানে গজলডোবাসহ কয়েকটি এলাকায় অবৈধভাবে অসংখ্য কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত।
কুশিয়ারা নদীর প্রসঙ্গে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুকনো মৌসুমে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কুশিয়ারা নদীর বাংলাদেশ অংশে গড়ে পাঁচ হাজার ২৯৫ থেকে ১৭ হাজার ৬৫০ কিউসেক পানি প্রবাহিত হয়। এ নদী থেকে বাংলাদেশ ১৫৩ কিউসেক পানি তুলে সিলেটসহ নদীর তীরবর্তী এলাকায় কৃষিকাজে ব্যবহার করে। একপর্যায়ে ভারতের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর কুশিয়ারা পানিবণ্টন চুক্তি নামে দেশটির সঙ্গে একটি চুক্তি করে বাংলাদেশ। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরও নানা অজুহাতে বাংলাদেশকে পানি তুলতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাম্পহাউসগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
পানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের যে ক্ষতি হচ্ছে, তার আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন। তিনি মনে করেন, ফারাক্কা চুক্তি বলবৎ থাকা অবস্থায়ই আমরা পানির ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছি না। চুক্তি যখন থাকবে না, তখন ভারত এটিকে আরও খারাপভাবে ব্যবহার করতে পারে। এর প্রভাব সারা দেশের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়বে। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ক্ষতির দিকগুলো তুলে ধরে ড. আইনুন নিশাত আরও বলেন, ভারত উজানের দেশ হিসেবে পানির একতরফা প্রত্যাহারের ফলে এর চরম মূল্য আমাদের দিতে হচ্ছে। এখনই দেশের কোনো কোনো এলাকায় মরুময়তা দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমরা যত স্থাপনাই তৈরি করি না কেন, আগে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সমন্বিত প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ নিতে হবে এখন থেকেই।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, ভারত অন্যায়ভাবে অভিন্ন নদীগুলোর পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এতে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। তিনি বলেন, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের বিষয়টিকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। গঙ্গাচুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে অভিন্ন নদীগুলো রয়েছে, সেগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশকে দিতে ভারত বাধ্য। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে ভারতকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে চাপ দিতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 


















