ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য প্রফেসর ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেছেন, দেশের জাতীয় চ্যালেঞ্জগুলোকে গবেষণায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমেই টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া জাতীয় ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে যুবসমাজ ও নারীর ভূমিকা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যা গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত।
তিনি উল্লেখ করেন যে, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গবেষণা এখনো সীমিত। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা করলেও, বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। তাই, এই বিষয়ে গবেষণা ও একাডেমিক আলোচনা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রফেসর ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে সফল হলেও, সেই সুফল সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর কৌশল উদ্ভাবন করা প্রয়োজন। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য ব্যবসায়িক উদ্ভাবনে এসএমই খাতের ভূমিকা অপরিসীম, এমনটি তিনি মন্তব্য করেন।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) কুমিরাস্থ স্থায়ী ক্যাম্পাসে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)-এর ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ আয়োজিত ‘বিজনেস ইনোভেশন ফর ইনক্লুসিভ ডেভলাপমেন্ট’ শীর্ষক ২য় এবং আইআইইউসি’র ১৮তম আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ ও গবেষণা ও প্রকাশনা কেন্দ্রের যৌথ আয়োজনে দু’দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইআইইউসি’র উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী। বিশেষ অতিথি ছিলেন আইআইইউসি’র কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সম্মেলনের অর্গানাইজিং কমিটির চেয়ার এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান খান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাবি উপাচার্য আরও বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের সামাজিক ব্যবসা এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে এটি ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শেখার অনেক সুযোগ রয়েছে এবং সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান আমাদের নীতিনির্ধারণে সহায়ক হতে পারে। সরকার গঠনমূলক ও বাস্তবভিত্তিক মতামত শুনতে আগ্রহী বলেও তিনি জানান। তিনি আয়োজকদের প্রতি সম্মেলনের আলোচনার ভিত্তিতে একটি সংক্ষিপ্ত সুপারিশমালা প্রণয়ন করার আহ্বান জানান, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় প্রকাশ করা হলে তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে। এছাড়াও, তিনি গবেষক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, উপস্থাপিত গবেষণাপত্রগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভবিষ্যতে যৌথ গবেষণায় রূপ নেবে এবং এই সম্মেলনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইআইইউসি’র কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা এক বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, ডিজিটাল বিশৃঙ্খলা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আর্থ-সামাজিক বৈষম্য আমাদের প্রথাগত ব্যবসায়িক মডেলগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। তিনি বলেন, আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা, একাডেমিক দক্ষতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বিত অগ্রযাত্রা প্রয়োজন। আইআইইউসি গবেষণা সংস্কৃতি শক্তিশালী করতে এবং তরুণ গবেষকদের পাশে দাঁড়াতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
সভাপতির বক্তব্যে আইআইইউসি’র উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী বলেন, ব্যবসায় শিক্ষা ও গবেষণা নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, উদ্ভাবন এবং টেকসই উন্নয়নের আলোকে পরিচালিত হওয়া উচিত। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ব্যবসায় খাতে উদ্ভাবনী চিন্তা ও গবেষণার বিকল্প নেই। বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আইআইইউসি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে শিক্ষার্থীরা পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ হবে। তাদের লক্ষ্য হলো এমন নেতৃত্ব তৈরি করা, যারা আধুনিক জ্ঞান ও পেশাদারিত্বে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
সম্মেলনের প্রথম দিনের প্লেনারি সেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কানাডা কেপবৃটন ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক এবং ইন্দোনেশিয়ার ত্রিশক্তি ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাঙ্কট প্রফেসর ড. মাসুদুল আলম চৌধুরী, ইউনিভার্সিটি সেইন্স ইসলাম মালয়েশিয়ার অর্থনীতি ও মুআমালাত অনুষদের প্রফেসর দাতো ড. মুস্তাফা বিন মোহাম্মদ হানিফাহ এবং পাকিস্তানের ইউনিভার্সিটি অব সারগোধা’র প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মাসুদ সরওয়ার আওয়ান। দ্বিতীয় দিনে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখবেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও প্রকাশনা সেলের পরিচালক প্রফেসর ড. তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ এবং ইউনিভার্সিটি সায়েন্স ইসলাম মালয়েশিয়ার লিডারশিপ ও ম্যানেজমেন্ট অনুষদের সহকারী ডিন সহযোগী অধ্যাপক ড. নূরহায়াতি রাফিদা আবদুল রহিম।
উল্লেখ্য, ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, বাহরাইন ও ফিলিপাইনসহ ৮টি দেশের ১১টি বিশ্ববিদ্যালয় এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সহ-আয়োজক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ১৭২ জন গবেষক-প্রতিনিধি এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করছেন। সম্মেলনে মোট ১৬৫টি গবেষণা প্রবন্ধ জমা পড়েছিল, যার মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১১৪টি প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪টি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬টি, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি, নন-ফিনান্সিয়াল ইনস্টিটিউটের ১টি, ফিনান্সিয়াল ইনস্টিটিউটের ১টি এবং একটি গবেষণা কেন্দ্রের একটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপিত হবে। মোট ২৩টি একাডেমিক সেশনে এই সম্মেলনের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। রবিবার (২৫ জানুয়ারি) সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে দেশ-বিদেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও পণ্ডিতগণ প্রবন্ধ উপস্থাপন ও আলোচনা করবেন। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন বিশিষ্ট শিল্পপতি, সীকো ফাউন্ডেশনের নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং এ. কে. খান ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি সেক্রেটারি সালাহউদ্দিন কাসেম খান।
রিপোর্টারের নাম 


















