চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার শহিদনগর এলাকার চারতলা মোড়ে এক মর্মান্তিক ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই, এক পথচারীর নজরে আসে ফুটপাতের পাশে পড়ে থাকা একটি কালো পলিথিন ব্যাগ। কৌতূহলী হয়ে ব্যাগটি সরাতেই বেরিয়ে আসে বীভৎস দৃশ্য – মানুষের রক্তমাখা দুটি কাটা হাত। এই চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারই উন্মোচন করে এক পরিকল্পিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ২১ জানুয়ারি দিবাগত রাত দেড়টায়। বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। উদ্ধার হওয়া বিচ্ছিন্ন হাত দুটি দেখে তদন্ত কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। হাতের চামড়ার রং, গঠন এবং আকারের নিরিখে প্রাথমিকভাবে এটি কার হাত এবং এর সাথে সম্পর্কিত কোনো লাশ বা নিখোঁজ সংক্রান্ত ঘটনা আছে কিনা, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। হাত দুটি ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পুলিশের চট্টগ্রাম উত্তর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আমিরুল ইসলাম জানান, উদ্ধার হওয়া হাতের আঙুলের ছাপ জাতীয় পরিচয়পত্র ডাটাবেসের সঙ্গে মিলিয়ে হতভাগ্য ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। নিহত ব্যক্তির নাম মো. আনিছ (৩৮), তিনি রাউজান উপজেলার চিকদাইর ইউনিয়নের বাসিন্দা। আনিছের পরিবার জানায়, তিনি গত ২০ জানুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিলেন। এই তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ আনিছের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে।
নিখোঁজ আনিছের সন্ধান করতে গিয়ে তদন্তের এক পর্যায়ে সুফিয়া আক্তার (৩৯) নামে এক নারীর নাম উঠে আসে। আনিছ ও সুফিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং সম্প্রতি তাদের মধ্যে মনোমালিন্য চলছিল বলে জানা যায়। এই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সুফিয়াকে সন্দেহের তালিকায় রাখে।
২২ জানুয়ারি ভোররাতে বায়েজিদের পাঠানপাড়া এলাকা থেকে সুফিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অস্বীকার করলেও, পরে পুলিশের জেরার মুখে ভেঙে পড়েন এবং আনিছ হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন।
সুফিয়ার ভাষ্যমতে, আনিছের সঙ্গে তার একসময় সুসম্পর্ক থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর আনিছের প্রতি সুফিয়ার তীব্র ক্ষোভ জন্মায়, যা শেষ পর্যন্ত তাকে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে প্ররোচিত করে।
গত ২০ জানুয়ারি বিকেল ৩টার দিকে সুফিয়া কৌশলে আনিছকে তার পাঠানপাড়ার বাসায় ডেকে নিয়ে আসেন। বাসায় ঢোকার পরপরই পূর্বপরিকল্পিত আক্রমণ শুরু হয়। সুফিয়া প্রথমে একটি পাথরের শীল দিয়ে আনিছের ওপর আঘাত করেন, এতে তিনি গুরুতরভাবে আহত হন। এরপর চাপাতির ধারালো কোপে আনিছের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
নিহত আনিছের দেহ সুফিয়া ও তার সহযোগীরা মিলে লোহার দা ও চাপাতি দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে। দেহের প্রতিটি অংশ আলাদা করে কালো পলিথিনে ভরে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে শহিদনগর ও শীতলকর্নার এলাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সুফিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ওই স্থানগুলো থেকে আনিছের দেহের অন্যান্য খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করে।
পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার আমিরুল ইসলাম আরও বলেন, ভোরে বিচ্ছিন্ন দুটি হাত উদ্ধারের পর থেকেই আমরা ধারণা করেছিলাম যে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং টানা অনুসন্ধানের মাধ্যমে আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মূল আসামি সুফিয়াকে গ্রেপ্তার করতে এবং ভিকটিমের খণ্ডিত দেহাংশগুলো উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। এই ঘটনায় জড়িত অন্য কেউ থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
রিপোর্টারের নাম 




















